প্রতিবাদী প্রদর্শনী ১৯ এপ্রিল
‘স্বত্ব চুরির’ কবলে নীতিশ রায়ের অমর কাজ তৃষ্ণা

৪৩ বছর আগে আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী সেই কালজয়ী ছবিটির নাম ‘তৃষ্ণা’
পিঠে বাঁধা শিশু কন্যা, তৃষ্ণার্ত মা ছড়ার জল পান করছেন দুই হাত দিয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে শিশুটিও নিজের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে মায়ের বুকের দুধ পান করে। আশির দশকের শুরুতে শেরপুরের সীমান্তঘেঁষা গারো পাহাড়ের এই বিরল মুহূর্তটি ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন কিংবদন্তি আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক নীতিশ রায়। ৪৩ বছর আগে আন্তর্জাতিক পুরস্কারজয়ী সেই কালজয়ী ছবিটির নাম ‘তৃষ্ণা’।
তবে নীতিশ রায়ের মৃত্যুর পর এই ঐতিহাসিক ছবির মালিকানা নিয়ে শুরু হয়েছে টানাহেঁচড়া। দেশি-বিদেশি একাধিক ব্যক্তি অপচেষ্টা চালাচ্ছেন ছবিটিকে নিজের বলে। এই ‘স্বত্ব চুরির’ প্রতিবাদে এবং নীতিশ রায়ের অধিকার রক্ষায় আগামী ১৯ এপ্রিল শেরপুর চকবাজারস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত হচ্ছে ‘তৃষ্ণা’ ছবির এক প্রতিবাদী প্রদর্শনী।
আশির দশকের শুরুর দিকে শেরপুরের ঝিনাইগাতীর পাহাড়ি ছড়ার পাশে ঘুরছিলেন নীতিশ রায়। হঠাৎ তার চোখে পড়ে কোচ সম্প্রদায়ের এক নারীর জলপানের এই অকৃত্রিম দৃশ্য। অলক্ষ্যেই শাটার টিপে তিনি দৃশ্যটি বন্দী করেন। সেই নারী ছিলেন উত্তর গান্ধীগাঁও গ্রামের কুমুদিনী কোচ এবং তার পিঠের শিশুটি ছিল কন্যা রিতা কোচ।
১৯৮২ সালে ইউনেস্কোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে জাপানে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ছবিটি জয় করে আন্তর্জাতিক ‘ইয়াকুল্ট’ পুরস্কার। একই বছরের ৬ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় ছবিটি প্রকাশিত হলে আলোড়ন তৈরি হয় বিশ্বজুড়ে।
নীতিশ রায় ছিলেন একাধারে সাংবাদিক ও আজীবন আলোকচিত্রী। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার ফটোগ্রাফার। নিঃসন্তান এই আলোকচিত্রী মারা যান ২০১৭ সালে। পরবর্তীতে মৃত্যু হয় তার স্ত্রী কবি সন্ধ্যা রায়েরও।
তাদের মৃত্যুর সুযোগ নিয়ে সম্প্রতি ছবিটিকে নিজেদের বলে দাবি শুরু করেন সাখাওয়াত তমাল নামের এক ব্যক্তি এবং একজন ভারতীয় নাগরিক। এর প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে শেরপুরের সচেতন সমাজ।
নীতিশ রায়ের সহকর্মী ও ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুগনিউর রহমান মনি জানান, ছবিটি নিঃসন্দেহে নীতিশ রায়ের। যারা এখন দাবি করছেন, তারা স্রেফ জালিয়াত।
জনউদ্যোগ ও শেরপুরের সচেতন সমাজের উদ্যোগে ১৯ এপ্রিলের এই প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকবেন ছবির সেই মা কুমুদিনী কোচ (বর্তমানে ৬৬ বছর) এবং কন্যা রিতা কোচ (৪৫ বছর)।
আয়োজক কমিটির সভাপতি রাজিয়া সামাদ ডালিয়া বলেছেন, নীতিশ রায় ও তার স্ত্রী ছিলেন আমাদের খুব ঘনিষ্ঠজন। অসুস্থ অবস্থায় তিনি ছবির মূল কপি, সনদ ও ক্যামেরা সংরক্ষণের জন্য দিয়ে যান আমার কাছে। যা এখন জাদুঘরে সংরক্ষিত। সুতরাং অন্য কারও দাবির নেই কোনো ভিত্তি।‘নীতিশ রায়ের মতো একজন আন্তর্জাতিক মানের আলোকচিত্রীকে স্মরণ করা এবং তার কাজের স্বত্ব রক্ষা করাই এই প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য। অনুষ্ঠানে ছবির সেই মা ও মেয়েকে বিশেষভাবে করা হবে সম্মানিত’, প্রতিবাদী কর্মসূচি নিয়ে জানান জনউদ্যোগের আহ্বায়ক শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ।আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেলেও কুমুদিনী ও রিতা কোচের জীবনে কাটেনি দারিদ্র্য। আজও ১৭ শতক ভিটেবাড়িতে তারা জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কুমুদিনী কোচ স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, বাপের বাড়ি যাওয়ার পথে জল খাওয়ার সময় কে ছবি তুলছে জানতাম না। পরে বাড়িতে এসে ছবিটি দিয়ে গিয়েছিলেন নীতিশ রায়।
















