অবৈধ জালে ফাঁসছে রেণু-পোনা, সমুদ্রে কমছে মাছ

সংগৃহীত ছবি
বঙ্গোপসাগরে ট্রলিং নৌযানে নিষিদ্ধ জালে নির্বিচারে চলছে মাছ শিকার। ছোট ফাঁসের এসব জালে বড় মাছের সঙ্গে উঠে আসছে পোনা ও রেণুও।প্রজনন বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কমছে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে। এমন আশঙ্কা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামুদ্রিক মৎস্য আইন, ২০২০ অনুযায়ী নিবন্ধন ও প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া গভীর সমুদ্রে মাছ শিকারের সুযোগ নেই। নির্ধারিত জালের ফাঁসের আকার (একটি গিঁট থেকে আরেকটি গিঁটের দূরত্ব) মেনে চলাও বাধ্যতামূলক। তবে ট্রলিং বোটগুলোয় মানা হচ্ছে না এসব নিয়ম।
অবৈধভাবে ইঞ্জিন লাগিয়ে কাঠের ছোট ট্রলারকে রূপান্তর করা হয় ট্রলিং ট্রলারে। তাতে আধা ইঞ্চি ফাঁসের জাল যুক্ত করা হয়। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০ অনুযায়ী সাড়ে চার সেন্টিমিটার বা তার চেয়ে কম ফাঁসের জাল ব্যবহার নিষিদ্ধ। সেখানে ব্যবহার হচ্ছে মশারির মতো দেখতে বেহুন্দি জাল।
ট্রলিং বোট মূলত দুই ধরনের। একটি যান্ত্রিক ট্রলিং, অন্যটি হ্যান্ড ট্রলিং। যান্ত্রিক ট্রলিং বোট গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করে। আকারে ছোট হ্যান্ড ট্রলিং বোটগুলো উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরে।
এসব বোট মাছের বিচরণ ও প্রজনন এলাকায় ফেলে নিষিদ্ধ জাল। বড় মাছের সঙ্গে উঠে আসে রেণু ও পোনাও। এতে সাময়িকভাবে কিছু লাভ হলেও দীর্ঘমেয়াদে ওই এলাকায় মাছ কমে যায়।
পাথরঘাটার জেলেরা জানায়, নদী ও সমুদ্রে এখন মাছের সংকট প্রকট। ৮ থেকে ১০ দিন সাগরে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মাছ। জ্বালানি তেল, বরফ, খাবারসহ হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রিপের খরচ তুলতেই।
স্থানীয় জেলে মো. সোহেল বললেন, ‘আগে তিন থেকে পাঁচ দিন সমুদ্রে থাকলেই ভালো মাছ পাওয়া যেত। এখন ১০ দিন থেকেও জাল ভরে না। এভাবে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। ধারদেনা করে অনেককে চলতে হচ্ছে।’
‘আগে যেসব এলাকায় জাল ফেললে ভালো মাছ পাওয়া যেত, এখন সেখানে মাছ অনেক কম। ছোট মাছ ও মাছের পোনা বেশি ধরার কারণেই তৈরি হয়েছে এমন পরিস্থিতি। এক ট্রিপে লাখ টাকার বেশি খরচ হলেও অনেক সময় সেই টাকা ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে জেলেদের জীবন-জীবিকা কঠিন হয়ে পড়বে’- বলছিলেন আরেক জেলে রফিকুল ইসলাম।
নিষিদ্ধ জালে পোনা উঠে আসা ক্ষতিকর জেনেও তা ব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাথরঘাটার এফবি নাজমা ট্রলিং বোটের এক জেলে। তার ভাষ্য, জাল তোলার পর বড় মাছ রেখে ছোট মাছগুলো আবার সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতি জানায়, বরগুনায় ছোট-বড় মিলিয়ে ট্রলার আছে প্রায় আড়াই হাজার। নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের হিসাবে, দেশে নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার ৯৮০টি। তবে ধারণা করা হয়, ছোট-বড় মিলিয়ে এখনো ৫০ থেকে ৬০ হাজারের বেশি ট্রলার সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত নয়।
ট্রলার মালিক সমিতি আরও জানায়, সমুদ্রে চলাচলকারী ট্রলিং বোটের মধ্যে পাথরঘাটা ও বরগুনায় ৫৫ থেকে ৬০টি এবং পটুয়াখালীর আলীপুর-মহিপুরে আছে ৩০ থেকে ৩৫টি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আছে আরও কয়েকশ অনুমোদনহীন ট্রলিং বোট।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেছেন, নদীতে নিষিদ্ধ জাল যেমন ইলিশসহ বিভিন্ন মাছের পোনা ধ্বংস করছে, তেমনি ট্রলিং জাহাজও নষ্ট করছে সমুদ্রের বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা। নির্ধারিত জালের ফাঁসের আকার মানছেন না অনেকে।
পাথরঘাটা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, সমুদ্রে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে মৎস্য বিভাগ। কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশও নিয়মিত টহল দিচ্ছে। নদী ও সমুদ্রে কোনো ট্রলিং বোট বা নিষিদ্ধ জালবাহী নৌযান শনাক্ত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে প্রচলিত আইনে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, সাগরে মাছ ধরার অনুমতি ও নিবন্ধন চেয়ে ২০২৩ সালের শেষের দিকে উচ্চ আদালতে রিট করে ছয় মাসের অনুমোদন পান ১৯ জন ট্রলার মালিক। পরে তা আরও কয়েক দফায় নবায়ন হয়। এ কারণে কিছু আইন প্রয়োগে সীমাবদ্ধতা আছে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মাদ আলী আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, ছোট ফাঁসের জালের কারণে রক্ষা পাচ্ছে না মাছের পোনা। মাছের প্রজনন ব্যাহত হয়ে কমছে উৎপাদন।
তার মতে, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না। আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি ও মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিবন্ধনহীন নৌযান শনাক্ত, সমুদ্রে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সচেতনতা বাড়াতে হবে জেলেদের। তা নাহলে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও দেশের প্রাকৃতিক মৎস্যসম্পদ।





