ভারী বর্ষণ
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মানবিক সংকট, তিন দিনে থামল ১০ জনের প্রাণ

কোমর সমান পানি ক্যাম্পের ভেতরে - আগামীর সময়
টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ঝড়ো হাওয়ায় গত তিন দিনে অন্তত ১৬০টি দুর্যোগজনিত ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৫ হাজার ৮১৩ জন রোহিঙ্গা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন ১০ জন। আহত হয়েছেন আরও ১০ জন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ইন্টার সেক্টর ফ্ল্যাশ সিচুয়েশন আপডেট-২-এ এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪ জুলাই রাত ৮টা থেকে ৭ জুলাই সকাল ১০টা পর্যন্ত রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৮৩টি ঝড় ও দমকা হাওয়ার ঘটনা, ৫২টি পাহাড়ধস, ১৪টি আকস্মিক বন্যা, তিনটি পানিতে ডুবে যাওয়া এবং দুটি অবকাঠামোগত ঝুঁকির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে আটজন পাহাড়ধসে এবং দুজন পানিতে ডুবে মারা গেছেন।
নিরাপত্তার স্বার্থে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে ৩ হাজার ১৮২ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬১৪টি আশ্রয়কেন্দ্র। সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে আরও ১০টি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ১২৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। টানা বর্ষণে পাহাড়ি এলাকার মাটি সম্পূর্ণ স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়ায় নতুন করে পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টায়ও চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে।
ফ্ল্যাশ আপডেটে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্যাম্প-১০। সেখানে ১ হাজার ৮৯১ জন রোহিঙ্গা দুর্যোগে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ছাড়া ক্যাম্প-৬-এ ১ হাজার ৩৭৫ জন, ক্যাম্প-১২-এ ১ হাজার ২৫৫ জন, ক্যাম্প-৫-এ ১ হাজার ১৪৯ জন, ক্যাম্প-১ ওয়েস্টে ১ হাজার ৩ জন, ক্যাম্প-১১-এ ৯৮৮ জন, ক্যাম্প-৭-এ ৭৩৩ জন, ক্যাম্প-১৬-এ ৬৮৩ জন, ক্যাম্প-১৮-এ ৬৭৪ জন এবং ক্যাম্প-১৪-এ ৬২৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
আশ্রয়কেন্দ্রের ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্যাম্প-১১। সেখানে ২১৩টি আশ্রয়কেন্দ্র আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ক্যাম্প-১২-এ ১৯১টি, ক্যাম্প-৯-এ ১১৯টি, ক্যাম্প-১৬-এ ৮৮টি, ক্যাম্প-১০-এ ৮৭টি এবং ক্যাম্প-১৮-এ ৮৪টি আশ্রয়কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৯১টি বিভিন্ন স্থাপনা, ১০৮টি ল্যাট্রিন, ২৪টি পানির উৎস, ২০টি শিক্ষা কেন্দ্র, দুটি মসজিদ, ৪৬৫টি রিটেইনিং ওয়াল, ১০৪টি চলাচলের পথ, ৭৪টি সিঁড়ি, আটটি সড়ক এবং সাতটি সেতু। এতে নিরাপদ চলাচল, বিশুদ্ধ পানি সংগ্রহ ও জরুরি সেবা গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে।
ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) খাতেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬০৯টি ল্যাট্রিন, ১৮৮টি গোসলখানা, ৪২টি নলকূপ, ১১টি ট্যাপ স্ট্যান্ড, নয়টি ফিকাল স্লাজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, দুটি পানি সংরক্ষণ বাঁধ এবং ১১টি বর্জ্য পুনরুদ্ধার কেন্দ্র। এতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
টানা বর্ষণে শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৬৭৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৬৬০টি লার্নিং সেন্টার এবং ১৮টি কমিউনিটি-বেইজড লার্নিং ফ্যাসিলিটি রয়েছে। এ ছাড়া ৪৫টি লার্নিং সেন্টার বর্তমানে ঘরহারা পরিবারের অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকেছে, কোথাও ছাদ উড়ে গেছে, কোথাও দেয়াল ধসে পড়েছে। নষ্ট হয়েছে বই, খাতা, ব্ল্যাকবোর্ডসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ।
দুর্যোগের পর ৪৬৭টি পরিবারের ২ হাজার ৩৭৬ জন সদস্যকে জরুরি খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে কাদা, পাহাড়ধস ও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের কারণে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে সমস্যা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে সব স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু থাকলেও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৭টি মোবাইল মেডিকেল টিম, ১৩টি মেডিকেল হাব এবং ৩৩টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যাতায়াতের পথ ভেঙে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা ও উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও নিজেদের ঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চাইছে না। ঘরের জিনিসপত্র চুরি হওয়ার আশঙ্কা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতাকে তারা এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এতে শিশু, নারী, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনেক এলাকায় সৌরবাতি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় রাতের বেলায় ল্যাট্রিন ও গোসলখানায় যাতায়াতও অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।
মানবিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, চলমান দুর্যোগ মোকাবিলায় অর্থসংকট এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ প্রবেশাধিকার কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় অর্থের মাত্র ৪০ শতাংশ পাওয়া গেছে। ৩ কোটি ৮৮ লাখ মার্কিন ডলারের চাহিদার বিপরীতে এখনো ২ কোটি ৩২ লাখ ডলারের ঘাটতি রয়েছে।
অন্যদিকে শেল্টার ও ক্যাম্প সমন্বয় (সিসিসিএম) খাতে প্রয়োজনীয় অর্থের ৪২ শতাংশ পাওয়া গেছে। এ খাতে এখনো ৭ কোটি ৩৯ লাখ মার্কিন ডলারের অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।
মানবিক সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, দ্রুত অতিরিক্ত অর্থায়ন নিশ্চিত না হলে পাহাড়ধস প্রতিরোধ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢাল স্থিতিশীল করা এবং জরুরি মানবিক সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আগামী কয়েক দিন ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস থাকায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।




