সাগর থেকে ফেরার পথে দস্যুদের কবলে জেলেরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বৈরী আবহাওয়ায় দুই মাস সাগরে ঠিকমতো মাছ ধরতে পারেননি কক্সবাজারের জেলেরা। সম্প্রতি সাগর কিছুটা শান্ত হলে লোকসান পুষিয়ে নিতে আবারও মাছ ধরতে যান তারা। মৌসুমের শেষ দিকে মাছের দেখা মিললেও নিরাপদে কূলে ফিরতে পারছেন না অনেকে। ফেরার পথে মাছ ধরার ট্রলারগুলোয় একের পর এক হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে।
গত এক সপ্তাহে কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপকূলসংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১৫টি মাছ ধরা ট্রলারে হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলে ও ট্রলার মালিকরা। তাদের ভাষ্য, হামলাকারীরা জেলেদের জিম্মি করে মারধর এবং ট্রলারে থাকা মাছ, জাল, জ্বালানি তেল, খাবার ও অন্যান্য রসদ লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। লুট হচ্ছে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও ইঞ্জিনের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশও। এসব ঘটনায় অন্তত ২০ মাঝিমাল্লা আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে গুরুতর আহত আটজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া তিনটি ট্রলারসহ ২৪ মাঝিমাল্লার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না বলে দাবি করেছেন জেলেরা।
জেলেরা বলছেন, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগে দ্রুত কূলে ফিরছিলেন অধিকাংশ জেলে। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে দস্যুরা। কখনো ছোট বোটে, কখনো বড় ট্রলারে করে এসে ঘিরে ফেলছে তাদের। এরপর অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চালানো হচ্ছে লুটপাট।
মহেশখালীর কালারমারছড়া জেলে কল্যাণ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমির হোসাইনের ভাষ্য, গত ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ শাহঘোনা ঘাট থেকে ১০-১২টি ট্রলার গভীর সাগরে যায়। চার-পাঁচ দিন মাছ ধরার পর ফেরার পথে ছয়টি ট্রলারে হামলা হয়। এতে অন্তত ৯ জেলে ও ১ ট্রলার মালিক আহত হন। তাদের মধ্যে তিনজনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আমির হোসাইনের দাবি, সোনাদিয়া চ্যানেলের পশ্চিমে ১২ বাম এলাকায় গত শুক্রবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০-১২ জনের একটি সশস্ত্র দল মাছ ধরার ট্রলারে হামলা চালায়। প্রতিটি ট্রলার থেকে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার মাছ, জাল, টাকা ও ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ লুট করা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ বন্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞার সময় সমুদ্রে নৌযান চলাচল কমে আসবে। এ কারণে নজরদারি আরও বাড়ানোর কথা জানিয়েছে কোস্ট গার্ড। কক্সবাজার, সোনাদিয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে বাহিনীটি। সাগরে টহলের পাশাপাশি জেলেদের কাছ থেকে দস্যুদের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কক্সবাজার কোস্ট গার্ড স্টেশনের কমান্ডার লে. কমান্ডার আরাফাত হোসেনের ভাষ্য, ডাকাত ও জলদস্যু দমনে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। আধুনিক জাহাজ ও স্পিডবোটের পাশাপাশি রাডার, জিপিএস ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করে সন্দেহজনক নৌযান ও গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
কক্সবাজার ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, জীবিকার প্রয়োজনে ছোট-বড় মিলিয়ে ৮ হাজারের বেশি নৌযান নিয়মিত গভীর সাগরে যায়। তাই সাময়িক টহল দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। জলদস্যুদের নেটওয়ার্ক, অস্ত্রের উৎস ও সম্ভাব্য আস্তানা চিহ্নিত করে স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে মাছ ধরার মৌসুমে সাগরে নামা জেলেদের জীবন যেমন ঝুঁকিতে থাকবে।
সোনাদিয়া এলাকায় জলদস্যুতার খবর শুনেছেন মহেশখালী থানার ওসি মোহাম্মদ আব্দুস সুলতান। তবে ট্রলারসহ ২৪ জেলে নিখোঁজ থাকার বিষয়ে থানায় কেউ অভিযোগ করেননি। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছে পুলিশ— জানালেন তিনি।



