পুলিশের সোর্স থেকে মাদক কারবারে, পিচ্চি রাজার উত্থান যেভাবে

রাজা ওরফে ‘পিচ্চি রাজা’
রাজধানীর মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পে ১৯৯৯ সালে জন্ম রাজার। বেড়ে ওঠা সেখানেই। থাকতেন ক্যাম্পের এ ব্লকের ১৭৭ নং বাসায়। সেখানে থেকে ধীরে ধীরে পরিচিতি পান ‘পিচ্চি রাজা’ নামে।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০১৪ সালে কিশোর বয়সেই ওই ক্যাম্পের শীর্ষ মাদক কারবারি ইশতিয়াকের সঙ্গে অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়েন রাজা। অপরাধপ্রবণ ওই ক্যাম্পে থাকার সুবাধে একই সময়ে কাজ শুরু করেন পুলিশের সোর্স হিসেবেও। এরপর অল্প কিছুদিন রাজধানীর একটি গ্যাস পাম্পে চাকরি করেন। একটি ঘটনায় সেই চাকরি হারিয়ে আবারও জড়িয়ে পড়েন মাদক কারবারে।
সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে জেনেভা ক্যাম্পে পুলিশের অভিযানে আটক হন রাজা। তার বিরুদ্ধে ৫১ পিস ইয়াবার মামলা দেওয়া হয়। সেটিই ছিল তার নামে প্রথম মামলা। প্রায় দুই মাস কারাগারে থাকার পর জামিনে বেরিয়ে মাদকের কারবার বড় করেন এ তরুণ।
এরইমধ্যে ২০২০ সালে কোভিডে মারা যান ইশতিয়াক। গুরুর মৃত্যর পর ক্যাম্পের একটি অংশের মাদকের নিয়ন্ত্রণ আসে রাজার হাতে। একপর্যায়ে টেকনাফ থেকে মাদকের চালান এনে ক্যাম্পে সরবরাহের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর জেনেভা ক্যাম্পে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে পিচ্চি রাজার সঙ্গে বুনিয়া সোহেলসহ কয়েকটি গ্রুপের বিরোধ তীব্র হয়। মাদকের স্পট নিয়ন্ত্রণ, এলাকার লাইনম্যান নিয়োগ ও অর্থ আদায়কে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাণ হারান অন্তত ১০ জন।
চলতি বছরের ১৯ মে নেপাল থেকে ঢাকায় ফেরার পর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই সময় পুলিশকে তিনি জানিয়েছিলেন, ৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এলাকায় নিজ নিজ ‘রাজত্ব’ কায়েম করতে চেয়েছিলেন। সেখান থেকেই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।
পিচ্চি রাজার বিরুদ্ধে মাদক কারবারের পাশাপাশি রয়েছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তার নামে ফ্ল্যাট, প্লটসহ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি থাকার তথ্য জানিয়েছে পুলিশের একটি সূত্র। এছাড়া, মোহাম্মদপুর এলাকায় সিএনজিচালিত অটো রিকশার একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধকর্ম সংগঠনে একটি বাহিনীও গড়ে তুলেছেন রাজা। মাদক সরবরাহ, অর্থ আদায়, দখল এবং প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর কাজ করে থাকেন তার বাহিনীর সদস্যরা।
২৭ বছর বয়সী রাজার বিরুদ্ধে রয়েছে মাদক, অস্ত্র, হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ ৩০টির বেশি মামলা। শুধু মোহাম্মদপুর থানায় তার মামলা ২৫টি। এর মধ্যে তিনটি হত্যা, ৭টি হত্যাচেষ্টা, চারটি বিস্ফোরক এবং ১৩টি মাদকের।
প্রিজন ভ্যান থেকে পলায়ন
গত ১৯ মে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে কারাগারেই ছিলেন রাজা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর একটি মামলায় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে ঢাকার একটি আদালতে আনা হয় তাকে। হাজিরা শেষে আদালত থেকে কারাগারে ফেরার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে পালিয়ে যান তিনি।
এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে রাজাকে আদালতে নেওয়া এসআই প্রবীর কুমার ও প্রিজনভ্যান চালক কামাল হোসেনেসহ পুলিশের ৫ সদস্যকে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারও হয়েছেন কয়েকজন পুলিশ সদস্য।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ওইদিন দিন তাঁতী বাজারের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অদূরে পিচ্চি রাজাকে বহন করার জন্য পূর্ব থেকেই একটি প্রাইভেটকার অবস্থান করতে থাকে। ওই কারে ছিলেন পিচ্চি রাজার বোন এবং বোরকা পরিহিতা আরেক নারী। সেই গাড়িতেই পিচ্চি রাজাকে নিরাপদে তুলে দেন এসআই প্রবীর কুমার।
প্রাইভেট কারটি পিচ্ছি রাজাকে নিয়ে নিরাপদে ওই স্থান ত্যাগ করার পর বিকল্প বাহনে করে গাজীপুর মহানগরীর বাইমাইল এলাকায় এসে প্রিজনভ্যানে ওঠেন এসআই প্রবীর। পুলিশ জানিয়েছে, সেদিন পিচ্ছি রাজার বোনের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে ১৩ বার কথা হয় এসআই প্রবীরের।
এদিকে, রাজার পলায়নের ঘটনায় এসআই প্রবীর কুমার, প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেন ও পিচ্ছি রাজার বোন তাসলিমাকে গ্রেপ্তারের পর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে জিজ্ঞাসাবাদ।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সৈয়দ মো. মিজানুর ইসলাম আগামীর সময়কে বলেন, ‘পিচ্চি রাজাকে পালাতে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছে কিনা, হলে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে— তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে আসামিদের। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্ত সাপেক্ষে জানা যাবে আসামির পলায়নের রহস্য।’
তবে ইতোমধ্যে তল্লাশি চালিয়ে প্রিজনভ্যান চালক কামালের বাসা থেকে ৬০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।




