অভাবকে হারিয়ে মিথিলার গোল্ডেন জিপিএ-৫
- নিরাপত্তাকর্মী বাবা ও গার্মেন্টকর্মী মায়ের মেয়ে হতে চায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, উচ্চশিক্ষার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা

ছবি: আগামীর সময়
অভাব-অনটন ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। সংসারের খরচ জোগাতেই যেখানে বাবা-মাকে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা ছিল তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। নামিদামি কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগও হয়নি। তবু দারিদ্র্যকে স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেয়নি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের মেয়ে মিথিলা আক্তার পুষ্প। নিজের অধ্যবসায়, নিয়মিত পড়াশোনা ও শিক্ষকদের সহযোগিতায় ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
মিথিলা সোনারগাঁয়ের বাহাউল হক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী। তার বাবা ইয়ায়ুল ইসলাম একজন নিরাপত্তাকর্মী এবং মা লাইলী আক্তার একটি গার্মেন্টে কাজ করেন। সোনারগাঁ পৌরসভার গোয়ালদী খান বাজার এলাকার আবদুর রহমানের বাড়িতে ভাড়া থাকেন তারা।
মিথিলার পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারে অভাব থাকলেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি বাবা-মা। তবে অনেক সময় স্কুলের মাসিক বেতন পরিশোধ করতেও বাবাকে হিমশিম খেতে হয়েছে। সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় জোগাড় করা ছিল কঠিন। ফলে কোচিং কিংবা প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ তার হয়ে ওঠেনি।
তবে এসব প্রতিবন্ধকতা মিথিলাকে দমাতে পারেনি। কোচিং ও প্রাইভেট শিক্ষকের বিকল্প হিসেবে নিজের পরিশ্রম ও অধ্যবসায়কেই ভরসা করেছে সে। দিনের পর দিন বাড়িতে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করেছে। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে শিক্ষকদের কাছে গিয়ে বিষয়টি বুঝে নিয়েছে। তার আগ্রহ ও আন্তরিকতায় শিক্ষকরাও তাকে সহযোগিতা করেছেন।
প্রতিকূল আবহাওয়াও তার পড়াশোনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কোনো কিছুতেই নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতির ব্যত্যয় ঘটেনি। ক্লাসের পড়া মনোযোগ দিয়ে লিখে নিয়ে অনেক সময় হেঁটেই বাড়ি ফিরেছে সে।
একদিকে পরিবারের আর্থিক সংকট, অন্যদিকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তুলনামূলক কঠিন পড়াশোনা। সবকিছুকে সামলে নিজের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়নি মিথিলা। শেষ পর্যন্ত তার সেই অধ্যবসায়ের ফল এসেছে পরীক্ষার ফলে।
বাহাউল হক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেছেন, ‘মিথিলা ছিল ক্লাসের অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী। পড়ালেখার প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল প্রশংসনীয়। শিষ্টাচারের কারণেও শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে সে ছিল প্রিয়।’
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ লায়লা আফরোজ বলেছেন, ‘ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং শিক্ষকদের কথা মেনে চললে ভালো ফল করা সম্ভব। মিথিলা তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। তার এই সাফল্যে আমরা আনন্দিত। আমি তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’
মিথিলার গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনে সবচেয়ে বেশি খুশি তার বাবা-মা। মেয়ের সাফল্যে তাদের চোখে-মুখে এখন আনন্দ ও তৃপ্তির ছাপ। এতদিনের অভাব-অনটন, মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে নানা কষ্ট, সবকিছুই যেন এই সাফল্যের কাছে সার্থক হয়ে উঠেছে।
মিথিলার স্বপ্ন আরও বড়। ভবিষ্যতে সে একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক দেশ ও সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখার স্বপ্নও দেখে সে।
মিথিলা বলেছেন, তার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে তাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। ভবিষ্যতে নিজের সাফল্যের মধ্য দিয়ে তাদের সেই ত্যাগের প্রতিদান দিতে চায় সে।
তবে গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জনের পরও মিথিলার সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহন করার মতো আর্থিক সামর্থ্য তার পরিবারের নেই। তাই সরকারের সহযোগিতা চায় সে।
মিথিলার ভাষ্য, ‘আমার পরিবারের পক্ষে আমার উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন। সরকার যদি আমার পড়াশোনার খরচ বহনে সহযোগিতা করে, তাহলে আমি আমার স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারব।’
গোল্ডেন জিপিএ-৫ হাতে পাওয়ার পর মিথিলার সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন পথ। পথটি হয়তো আগের চেয়ে আরও কঠিন। কিন্তু যে মেয়ে দারিদ্র্যকে পরাজিত করে নিজের অধ্যবসায়ের জোরে সাফল্যের প্রথম ধাপ পেরিয়েছে, তার চোখে এখন স্বপ্ন আরও বড়—একদিন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের জন্য কিছু করা।




