হাজারো বই, আধুনিক ভবন, তবু পাঠকশূন্য জামালপুরের তিন গণগ্রন্থাগার

জামালপুর জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার। ছবি: আগামীর সময়
হাজারো বই, দৃষ্টিনন্দন ভবন ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও পাঠকশূন্য হয়ে পড়েছে জামালপুরের তিন সরকারি গণগ্রন্থাগার। এসব গ্রন্থাগারে গল্প, উপন্যাস, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের বই রয়েছে। তবে নিয়মিত পাঠকের উপস্থিতি খুবই কম। মাঝেমধ্যে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণ-তরুণীদের দেখা মিললেও সাধারণ পাঠকের আনাগোনা নেই বললেই চলে।
সম্প্রতি সময়ে একাধিকবার সরেজমিন জামালপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারে গিয়ে দেখা গেছে এই চিত্র।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইন্টারনেট ও মোবাইল ফোন নির্ভর নতুন প্রজন্মকে গ্রন্থাগারমুখী করতে হলে এসব প্রতিষ্ঠানকে সময়োপযোগী ও ডিজিটালাইজড করতে হবে। পাশাপাশি পাঠক আকৃষ্ট করতে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মসূচি, প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করা প্রয়োজন। তা না হলে একসময় এসব গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
জামালপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে শহীদ হারুন সড়ক এলাকায় অবস্থিত জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি। গ্রন্থাগারের দোতলা ভবনটি দৃষ্টিনন্দন। কাঠের আসবাব দিয়ে সাজানো পাঠকক্ষে রয়েছে চকচকে চেয়ার-টেবিল, সাদা টাইলসের মেঝে, পর্যাপ্ত আলো ও পাখার ব্যবস্থা। পরিবেশও বেশ মনোরম। তবে এত আয়োজনের পরও সেখানে পাঠকের উপস্থিতি নগণ্য। একসঙ্গে ১০ জন পাঠককেও দেখা যায়নি।
জেলা গণগ্রন্থাগারে নিয়মিত পড়তে আসেন চাকরিপ্রত্যাশী হৃদয় হাসান। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ জন পড়তে আসেন। এখানে যারা আসেন, তাদের বেশিরভাগই চাকরি প্রত্যাশী। তবে চাকরি প্রত্যাশীদের জন্য গ্রন্থাগারে মানসম্মত বই নেই। বাসা থেকেই বই নিয়ে এসে এখানে পড়তে হয়।’
তবে গ্রন্থাগারের দৈনিক পাঠক উপস্থিতির খাতায় ৩৫ থেকে ৪০ জনের সই রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, একজন পাঠক বই পড়তে এসে সই করার পর একটি পত্রিকা পড়লেও আবার স্বাক্ষর করেন। ফলে খাতায় স্বাক্ষরের সংখ্যা প্রকৃত পাঠকসংখ্যার তুলনায় বেশি দেখা যায়।
বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত সরকারি গণগ্রন্থাগারটির অবস্থাও প্রায় একই। ভবনটির পাঠাগার কক্ষ বেশ পরিপাটি। সরেজমিন গিয়ে সেখানে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দেখা যায়। তাদের কেউ বই পড়ছিলেন, আবার কয়েকজন গল্প করছিলেন। তবে নিয়মিত পাঠকের সংখ্যা খুবই কম।
দেওয়ানগঞ্জ সরকারি গণগ্রন্থাগারটি আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল কলেজ ক্যাম্পাসের পূর্ব পাশে অবস্থিত। কলেজের প্রধান ফটক পেরোলেই চোখে পড়ে ভবনটি। ভবনের নিচতলায় প্রায় ২০০ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন একটি বড় মিলনায়তন এবং দোতলায় মূল পাঠাগার। কিন্তু সরেজমিন গিয়ে পাঠাগারে কোনো পাঠক পাওয়া যায়নি। এমনকি কথা বলার মতো সংশ্লিষ্ট লোকজনও সেখানে পাওয়া যায়নি।
কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা মাঝেমধ্যে গ্রন্থাগারে যান। সেখানে বিভিন্ন ধরনের বই রয়েছে এবং গ্রন্থাগারটিও সুন্দর করে তৈরি করা হয়েছে। তবে বই পড়তে তেমন কেউ সেখানে যান না। এখন বেশিরভাগ মানুষ মোবাইল ফোনেই সময় কাটান বলে জানিয়েছেন তারা।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটি ১৯৮৩ সালে শহরের কাচারিপাড়ায় প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম দিকে বিভিন্ন বয়সী পাঠক নিয়মিত সেখানে বই পড়তে আসতেন। পাঠকদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত থাকত গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণ। পরে ২০১২ সালে শহরের প্রাণকেন্দ্র শহীদ হারুন সড়ক এলাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসংবলিত নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়।
বর্তমানে এই গ্রন্থাগারে প্রায় ৪৮ হাজার বই রয়েছে। এর মধ্যে ইংরেজি ভাষায় ৩ হাজার ৯টি বই এবং বাংলা ভাষায় প্রায় ৪৫ হাজার বই রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিদিন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র পড়ার সুযোগ রয়েছে। শিশুদের জন্য রয়েছে আলাদা হলরুম। সেখানে বই পড়ার পাশাপাশি খেলাধুলারও ব্যবস্থা রয়েছে।
অন্যদিকে দেওয়ানগঞ্জের আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল কলেজ ক্যাম্পাস এবং বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে গণপূর্ত অধিদপ্তর ২০১৩ সালে দুটি গণগ্রন্থাগারের নির্মাণকাজ শেষ করে। নির্মাণকাজ শেষে ২০১৫ সালে গ্রন্থাগার দুটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ দুটি গ্রন্থাগারে প্রায় ২০ হাজার বই রয়েছে। প্রতিদিন জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্রও রাখা হয়।
জাতীয় কবিতা পরিষদ জেলা শাখার উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর সেলিম বললেন, ‘মানুষকে পাঠাগারে ফেরাতে সামাজিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। অফিস ছুটির পর গ্রন্থাগার বন্ধ থাকে। ফলে সান্ধ্য অবসরে পাঠকরা সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান না। বিনোদনের নানা কিছু এসে পাঠাভ্যাসকে বদলে দিয়েছে। পাঠক আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের আয়োজন করা দরকার।’
বকশীগঞ্জ উপজেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের সহকারী গ্রন্থাগারিক মো. মোখলেছুর রহমান বর্তমানে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা গণগ্রন্থাগারের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করছেন। পাঠক না থাকার বিষয়ে তিনি জানিয়েছেন, বকশীগঞ্জে শিক্ষার্থীসহ কিছু পাঠক আছেন। তবে দেওয়ানগঞ্জেরটা কলেজ ক্যাম্পাসের মধ্যে হওয়ায় অনেকেই মনে করেন, সেটা কলেজের গ্রন্থাগার। আর এটা শহরের এক প্রান্তে হওয়ায় সেখানে পাঠক একদমই কম। পাঠকদের ফেরাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচার চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জেলা গণগ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান দেলোয়ার হোসেন বললেন, ‘আগের তুলনায় বর্তমানে পাঠকসংখ্যা কমেছে। আশেক মাহমুদ কলেজে আলাদা লাইব্রেরি চালু হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী সেখানে পড়াশোনা করেন। পাঠকসংখ্যা বাড়াতে প্রতি বছর নতুন নতুন বই সংগ্রহ করা হচ্ছে।’







