জাবিতে হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার বড় গ্রন্থাগার
- একসঙ্গে পড়ালেখার সুযোগ পাবেন ৫-৭ হাজার শিক্ষার্থী
- প্রায় ৩ লাখ ভলিউম বইয়ের সংগ্রহ রাখার পরিকল্পনা
- নকশা তৈরি করা হয়েছে রোমান কলোসিয়ামের আদলে
- থাকছে ভিআর, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং স্টুডিও

জাবির জাবি) লাল ইট আর সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক লাইব্রেরি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) লাল ইট আর সবুজে ঘেরা ক্যাম্পাসে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক জ্ঞানচর্চার নতুন এক ঠিকানা। দীর্ঘদিনের আসন সংকট ও সীমিত পরিসরের পুরনো গ্রন্থাগারের গণ্ডি পেরিয়ে নির্মাণাধীন নতুন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে একসঙ্গে পড়তে পারবেন পাঁচ-সাত হাজার শিক্ষার্থী। বইয়ের বিশাল সংগ্রহের পাশাপাশি থাকবে ডিজিটাল লাইব্রেরি, গবেষণার আধুনিক প্রযুক্তি ও বহুমাত্রিক সুবিধা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের অধ্যাপক আবু সাইদ মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, ধারণক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার দিক থেকে এটি হতে যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ এবং এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর লাইব্রেরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে গ্রন্থাগারটি। নির্মাণকাজ শেষ করে ২০২৭ সালে এটি উদ্বোধনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ভবনের কাজ এখন শেষপর্যায়ে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, ১৯৮৫ সালে চালু হওয়া কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারটিতে আসন ৪৪৭টি। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ হাজারের বেশি। ফলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়ার জায়গার সংকটে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষাজীবনেও। অনেককে হলের রিডিংরুমের ভিড়ে জায়গা খুঁজতে হয় আবার কেউ কেউ গ্রন্থাগারে আসন না পেয়ে ফিরে যান। দীর্ঘদিন ধরে নতুন ও বড় পরিসরের একটি গ্রন্থাগারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। সেই চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২২ সালের আগস্টের দিকে উদ্যোগ নেওয়া হয় নতুন গ্রন্থাগার নির্মাণের।
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলামের ভাষ্য, ‘বিদ্যমান লাইব্রেরির অব্যবস্থাপনা ও পড়ার পরিবেশের অভাবে আমাদের শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত ছিল।’ তিনি আশা করছেন, নতুন গ্রন্থাগার দীর্ঘদিনের ভোগান্তি থেকে মুক্তি দেবে।
একই প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন শিক্ষার্থী মালিহা আক্তার। তিনি বললেন, ‘পুরনো লাইব্রেরিটি অনেক আগের। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগ ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’ নতুন গ্রন্থাগার উদ্বোধনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে দেখে তিনি আনন্দিত।
তবে নতুন গ্রন্থাগারের বিশেষত্ব শুধু এর বিশাল ধারণক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর নকশা ও স্থাপত্যও ভবনটিকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দেবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, রোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ‘কলোসিয়াম’-এর বৃত্তাকার নকশা ও স্তম্ভের ছন্দ থেকে নকশা তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল অফিস সূত্র বলছে, প্রায় আড়াই লাখ বর্গফুট আয়তনের ছয়তলা এই ভবনে একসঙ্গে পঁাচ-সাত হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চাহিদার পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্তত ২৫ হাজার শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখেই গ্রন্থাগারটির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণে যৌথভাবে কাজ করছে মেসার্স বেসিন পাওয়ার লিমিটেড ও অ্যাডভান্স টেকনোলজি কনসোর্টিয়াম লিমিটেড। তবে ভবনটি শুধু পাঠকদের বসার জায়গা বাড়াবে না; এর ভেতরের সংগ্রহ ও প্রযুক্তিনির্ভর সুবিধাও গড়ে তুলবে একটি আধুনিক জ্ঞানকেন্দ্র।
গ্রন্থাগারটিতে দেশি-বিদেশি পাঠ্যবই, রেফারেন্স বই, গবেষণা জার্নাল, ক্যারিয়ার উন্নয়নবিষয়ক বই এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ ভলিউম বইয়ের সংগ্রহ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও গবেষকরাও বিস্তৃত তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
বইয়ের প্রচলিত সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল জ্ঞানভাণ্ডারও। ই-লাইব্রেরি ও বৈশ্বিক সংযোগের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক গ্রন্থাগার নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশকের ডেটাবেজে প্রবেশাধিকার এবং দুষ্প্রাপ্য বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ পড়ার সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। গবেষকরা এন্ডনোট ও জোটেরোর মতো রেফারেন্স ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি থাকছে ইলেকট্রনিক ওয়ার্কস্টেশন, অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং স্টুডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল কিওস্ক এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর) স্টুডিও।
গ্রন্থাগারটির প্রতিটি তলাও সাজানো হচ্ছে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে। নিচতলায় থাকবে কেন্দ্রীয় সার্ভিস বিভাগ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। দোতলায় থাকবে পাঠ্যবই, ম্যাগাজিন, পত্রিকা ও রেফারেন্স সেকশন। এ ছাড়া শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও শিশুদের জন্য বিশেষ বইয়ের কর্নার এবং স্বতন্ত্র বিভাগ থাকবে। পাঠের ফাঁকে হালকা খাবারের সুযোগসহ একটি ওপেন রিডিং স্পেসও রাখা হচ্ছে।
গবেষণাকেন্দ্রিক কার্যক্রমের জন্য বিশেষভাবে সাজানো হচ্ছে তৃতীয় তলা। সেখানে থাকবে গবেষণা পরামর্শকক্ষ, বিশেষায়িত পাঠকক্ষ, সাহিত্য বিভাগ, ভিডিও রেফারেন্স সেকশন এবং ভূ-স্থানিক বা জিআইএস লাইব্রেরি। চতুর্থ তলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ইতিহাস ও তথ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে। এখানে বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের ইতিহাস, গবেষণাপত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক দলিলের আর্কাইভ ও অফিস রেকর্ড সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।
প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ভবনের কাজ শেষপর্যায়ে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে এটি শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা চলছে।
দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দিয়েছেন প্রকল্প তদারক কমিটির প্রধান ও উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. শামছুল আলমও। তার আশা, গ্রন্থাগারটি চালু হলে আধুনিক শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয় আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে।







