রাজশাহী
সরকারি প্রাথমিকে আস্থা কমছে!
- এক যুগে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যের বই, উপবৃত্তি, বেতনমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থাসহ নানা সুবিধার পরও কমছে শিক্ষার্থী। শুধু রাজশাহী বিভাগেই গত এক যুগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কমেছে প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ওই সময়ে শিক্ষার্থী বেড়েছে কিন্ডারগার্টেন ও বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই পরিবর্তন সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশার পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারের বিনিয়োগ প্রতিবছরই বাড়ছে। চলতি অর্থবছরে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। এই অর্থ ব্যয় হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিদ্যালয় পরিচালনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যের পাঠ্যবই, উপবৃত্তি এবং বিভিন্ন শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রমে।
রাষ্ট্রের এই বিপুল বিনিয়োগের পরও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের। অবশ্য অভিভাবকদের বড় অংশের ভাষ্য, তারা এখন শুধু বিনামূল্যের শিক্ষা নয়; সন্তানের শেখার মান, নিয়মিত পাঠদান, পরীক্ষা, শিক্ষক-অভিভাবক যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত নজরদারিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে বাড়তি খরচ হলেও সন্তানকে পাঠাচ্ছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাজশাহী বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ছিল ১৩ লাখ ৯ হাজার ৭৫ জন। ২০২৬ সালে সে সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৯২ জনে।
অন্যদিকে একই সময়ে কিন্ডারগার্টেন ও অন্যান্য বেসরকারি প্রাথমিক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেড়েছে। ২০১৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯৬৬ জন। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪ হাজার ৩০ জনে।
এদিকে সর্বশেষ জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের জনসংখ্যা ২ কোটি ৩ লাখ ৫৩ হাজার ১১৬ জন। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮৪ হাজার ৮৫৮ জন। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে বিভাগে জনসংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১৮ লাখ ৬৮ হাজার।
অভিভাবকদের দাবি, নিয়মিত ক্লাস, বাড়ির কাজ, পরীক্ষা, ইংরেজি শিক্ষা, শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সন্তানের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাদের কাছে।
রাজশাহীর শাহীন স্কুলে ছেলেকে পড়ান সাজু নামের এক অভিভাবক। তিনি বললেন, ‘সন্তানকে প্রাথমিকে পড়ানোর কথা চিন্তাই করতে পারি না। সেখানে আধুনিক শিক্ষার বালাই নেই। ইংরেজিতে দক্ষ করে গড়ে তোলাসহ একজন শিক্ষার্থীকে মানসম্মত পাঠদানের জন্য ভালোমানের বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ানোর বিকল্প নেই।’
সরেজমিনে রাজশাহীর বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে। পবা উপজেলার কাটাখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলতি বছর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে মাত্র ১০ শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আশপাশে কিন্ডারগার্টেন গড়ে ওঠার পর অনেক শিক্ষার্থী সরকারি বিদ্যালয় ছেড়ে সেখানে চলে গেছে।
উপজেলার আকশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও কমেছে শিক্ষার্থী। পাঁচ বছরের ব্যবধানে বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫৫০ থেকে কমে প্রায় ৩৫০ জনে নেমে এসেছে। একই সময়ে বিদ্যালয়ের আশপাশে গড়ে উঠেছে একাধিক কিন্ডারগার্টেন।
তবে সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার কারণ নিয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি শিক্ষা কর্মকর্তারা। তাদের মতে, এর পেছনে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, অভিভাবকদের আর্থসামাজিক অবস্থা, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তারসহ একাধিক বিষয় কাজ করতে পারে। প্রকৃত কারণ জানতে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক গবেষণা।
প্রাথমিক শিক্ষার রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নূর আখতার জান্নাতুল ফেরদৌস বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীর সংখ্যা কেন কমেছে, এটি এককথায় বলা সম্ভব নয়। এটি নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে গবেষণা হলে বিস্তারিত বলা যাবে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. আকতার বানু বললেন, ‘অভিভাবকরা সন্তানের ভবিষ্যৎ বিবেচনা করেই বিদ্যালয় নির্বাচন করেন। যেখানে তারা বেশি আস্থা পান, সেখানেই সন্তানকে ভর্তি করেন। তাই সরকারি বিদ্যালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।’






