নবাবগঞ্জে সেতু হলেও কাটেনি দুর্ভোগ
২৮ বছরেও মেলেনি নবাবগঞ্জের সেতুর সংযোগ, কোটি টাকা খরচ আসছে না কাজে
- সেতু হলেও খোলেনি চলাচলের পথ
- ১০ বছরেও সংস্কার হয়নি সংযোগ সড়ক
- বৃষ্টি এলেই দুর্ভোগ বাড়ে পথচারীদের

ঢাকার নবাবগঞ্জের জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের রাজাপুর-ঘোষাইল খালের ওপর নির্মিত সেতুটি। ছবি : আগামীর সময়
কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু। দুই পাশে খাল। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে কাঠামো; কিন্তু নেই চলাচলের পথ। নির্মাণের ২৮ বছর পরও অচল পড়ে রয়েছে ঢাকার নবাবগঞ্জের জয়কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের রাজাপুর-ঘোষাইল খালের ওপর নির্মিত সেতুটি। সংযোগ সড়ক ও অ্যাপ্রোচের মাটি ভরাট না হওয়ায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুটি উদ্বোধন হয়নি আজও। ফলে প্রতিদিন স্কুল-কলেজ, বাজার ও চিকিৎসাসেবায় যেতে প্রায় ১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে দুই গ্রামের মানুষকে। বৃষ্টি হলে সে দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, যে সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ-দুর্ভোগ কমার কথা ছিল, সেটিই এখন তাদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘোষাইল ও রাজাপুর এলাকার বাসিন্দাদের বাজার, স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও হাসপাতালে যেতে হচ্ছে ঘুরপথে।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য বলছে, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতুর অ্যাপ্রোসের মাটি ভরাটের বরাদ্দ না থাকার কারণে কাজ শেষ করা যায়নি। এ কারণে সেতুটি উদ্বোধন করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেতুটি নির্মাণের আগে রাজাপুর ও ঘোষাইল এলাকার মানুষের যোগাযোগ অনেকটাই নির্ভর করত খালের ওপর থাকা পুরনো পথে। বর্ষায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ত। সেতু নির্মাণের খবর তাই তাদের মধ্যে আশার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও সেতুর দুই পাশে প্রয়োজনীয় মাটি ফেলে সংযোগ সড়ক তৈরি করা হয়নি। ফলে সেতুর ওপর দিয়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি।
তাদের অভিযোগ, নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, দাপ্তরিক জটিলতা কিংবা পরিকল্পনার ঘাটতি— যে কারণেই হোক, কাজটি আর এগোয়নি। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হলেও ঘুরপথে যেতে হয়। রাতে কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। সড়কের অবস্থাও ভালো না থাকায় যানবাহন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘোষাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল সামাদ মোল্লার ভাষায়, ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ২৮ বছরেও অ্যাপ্রোচের মাটি ভরাট হয়নি। ফলে সেতুটি এলাকাবাসীর কোনো কাজে আসছে না। সেতুর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা সড়কটির অবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে খারাপ। ১০ বছর ধরে সড়কটিতে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি।
আব্দুল সামাদ মোল্লার দাবি, দ্রুত সেতুর দুই পাশে অ্যাপ্রোচে মাটি ভরাটের পাশাপাশি সংযোগ সড়কটিও সংস্কার করা প্রয়োজন। এতে শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের চলাচল সহজ হবে।
শুষ্ক মৌসুমে কোনোভাবে বিকল্প পথে চলাচল করা গেলেও বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। একটু বৃষ্টি হলেই সংযোগ সড়কের কাদা ও গর্তের কারণে হাঁটা কঠিন হয়ে পড়ে। যানবাহন চলাচলেও সমস্যা দেখা দেয়।
রাজাপুর জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ ওয়াহেদুজ্জামান বললেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে সেতুর অ্যাপ্রোচের মাটি না থাকায় অন্য সড়ক দিয়ে চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে রাতে কোনো রোগীকে নিয়ে বের হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয়। তার মতে, মানুষের দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে সেতুটির অ্যাপ্রোচ দ্রুত ভরাট করা দরকার। শুধু সেতু নির্মাণ করলেই হবে না, সেটি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করাও জরুরি।
একটি সেতুর স্বাভাবিক আয়ুষ্কালের বড় একটি অংশ পেরিয়ে গেছে। অথচ যে উদ্দেশ্যে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সে উদ্দেশ্যই এখনো পূরণ হয়নি। সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে; কিন্তু মানুষের চলাচলের পথ তৈরি হয়নি। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, এবার বিষয়টি শুধু প্রকল্পে প্রস্তাব পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দ্রুত প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করে অ্যাপ্রোচে মাটি ভরাট এবং সংযোগ সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করা হবে।
সেতুর অ্যাপ্রোচে মাটি ভরাটের বিষয়ে জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ এলজিইডির প্রকৌশলী মো. নাজমুল করিম বলেলেন, ‘মাটি ভরাটের জন্য বরাদ্দ না থাকায় সেতুর কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে এলাকাবাসীর চলাচলের জন্য উদ্বোধনও করা সম্ভব হয়নি। তবে মাটি ভরাটের বিষয়ে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সরকারও গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নে জোর দিয়েছে। জনগণের ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে কীভাবে সেতুটি চলাচলের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে চেষ্টা অব্যাহত আছে।’



