কোথাও কোথাও সেই উত্তাল সময়ের রেশ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে যে পরিবর্তন এসেছে, তার প্রভাব পড়েছে সিলেটেও। উত্তাল সময় পেরিয়ে শহরের জনজীবনে ফিরেছে স্বাভাবিকতা। মানুষের প্রত্যাশার তালিকাও হয়েছে দীর্ঘ। নিরাপদ পরিবেশ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, উন্নত নাগরিক সেবা এবং একটি পরিকল্পিত নগরী— এসব স্বপ্ন নিয়েই নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। কিন্তু দুই বছর পর প্রশ্ন উঠছে, সিলেট কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে?
শহরের ব্যস্ত সড়ক, সরকারি অফিস, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোথাও এসেছে স্বস্তি ও গতি, আবার কোথাও রয়ে গেছে পুরনো সমস্যার ছাপ।
এদিকে ৫ আগস্টের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এসেছে পরিবর্তন। নতুন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব গ্রহণ, প্রশাসনিক কার্যক্রমে নতুন গতি এবং নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিলেটের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, শান্ত পরিবেশ ফিরেছে, এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে সাধারণ মানুষ পরিবর্তন অনুভব করবে তখনই, যখন প্রতিদিনের ভোগান্তিগুলো কমবে। আগের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে সরকারি দপ্তরে সেবা গ্রহণের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনো ভূমি সেবা, নাগরিক সনদ প্রাপ্তি ও দাপ্তরিক কাজে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ রয়েছে।
সুজনের (সুশাসনের জন্য নাগরিক) সিলেট জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বললেন, ‘পরিবর্তন শুধু কর্মকর্তা বদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে হবে না। সাধারণ মানুষ যেন সেবার মানে পরিবর্তন অনুভব করেন, সেটিই মূল বিষয়।’ তিনি আরও বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর সিলেটে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল— প্রতিষ্ঠানগুলো আরও জনমুখী হবে। জবাবদিহি বাড়বে। কিন্তু সিলেটে পরিবর্তনের পথে এখনো রয়েছে বেশ কিছু বাধা। দীর্ঘদিনের নগর সমস্যা, অপরিকল্পিত সম্প্রসারণ, সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এবং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের রয়েছে বড় ঘাটতি।
এদিকে সিলেট নগরীতে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প। সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নগরবাসীর বড় অভিযোগ যানজট, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ নিয়ে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া একটি আধুনিক নগর গড়ে তোলা কঠিন।
এ বিষয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বললেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সিসিকের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার, নাগরিক সেবা সহজীকরণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
নগরের সুবিধবাজার এলাকার বাসিন্দা ওয়েছ চৌধুরী বললেন, ‘শহরে নতুন নতুন ভবন হচ্ছে, রাস্তা হচ্ছে, কিন্তু মানুষের চলাচল, পার্কিং, ড্রেনেজ— এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি।’
‘আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা ফিরেছে। নগরের বড় মার্কেট, বিপণিবিতান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য’— যোগ করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের মতে, স্থিতিশীল পরিবেশ ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগের ধীরগতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
নগরের হাসান মার্কেটের ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান বললেন, ‘আগের চেয়ে পরিবেশ ভালো। মানুষ নিশ্চিন্তে বের হচ্ছে। কিন্তু ব্যবসার প্রকৃত উন্নতির জন্য মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি ফিরতে হবে।’
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহমিদ হাসান বললেন, ‘আমরা এমন একটি ভবিষ্যৎ চাই, যেখানে যোগ্যতা অনুযায়ী সুযোগ পাওয়া যাবে। পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরি করা।’
সাধারণ মানুষের কাছে পরিবর্তনের অন্যতম সূচক হলো নিরাপদ চলাচল ও স্বাভাবিক জীবন। নগরীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীরা বলছেন, রাতের নগরে নিরাপত্তা, গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ এখনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।



