গেজেটহীন মৌলভীবাজার
সম্ভাবনা আছে, পরিকল্পনা নেই

ছবি: আগামীর সময়
চা-বাগান, টিলা-পাহাড়, বন, হাওর, জলপ্রপাত ও লেক প্রকৃতির নানা বৈচিত্র্য রয়েছে মৌলভীবাজারে। জেলার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে সারা বছর পর্যটকদের আনাগোনা থাকে। বড়লেখার মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, হামহাম জলপ্রপাত ও মাধবপুর লেক এবং শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিলের মতো স্থানগুলোও পর্যটকদের কাছে পরিচিত।
তবে দীর্ঘদিন ধরে পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হলেও এ খাতের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামো গড়ে ওঠেনি। ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণার কথা বলা হয়েছিল। এরপর ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও এ-সংক্রান্ত সরকারি গেজেট প্রকাশিত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিযোগ, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে পর্যটনের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
২০০৮ সালের ১ জুলাই ‘এসো বাংলাদেশ গড়ি’ রোড শো উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান শফিক আলম মেহেদী মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে ঘোষণার কথা জানান।
এর পরের বছর ১৪ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা হিসেবে উন্নীত করার লক্ষ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়।
প্রস্তাবে জেলার চা-বাগান, বনাঞ্চল, পাহাড়-টিলা, হাওর-বাওড়, ঝরনা, নদ-নদী ও জীববৈচিত্র্যকে পর্যটনের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া, মণিপুরি ও খাসিয়া পল্লি, বড়লেখার মাধবকুণ্ড এবং হাকালুকি হাওরসহ বিভিন্ন স্থানকে যুক্ত করে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছিল। পর্যটকদের আবাসন, বিনোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থার বিষয়ও প্রস্তাবে ছিল।
কিন্তু সেই উদ্যোগের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পর্যটন জেলা ঘোষণার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি।
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুজ্জামান পাবেল বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার কথা শুনছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি গেজেট তিনি পাননি।
জেলার পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন, এখানে থাকা পর্যটনকেন্দ্রগুলো বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার জন্য পর্যটকদের প্রয়োজনীয় তথ্য, নির্দেশনা ও পরিবহনসুবিধা সব জায়গায় নেই। অনেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যাপ্ত সাইনবোর্ড, তথ্যসেবা, শৌচাগার ও বিশ্রামের ব্যবস্থাও সীমিত।
পর্যটনসেবা সংস্থার সাধারন সম্পাদক ও পরিবেশবাদী এসকে দাশ সুমন বলেন, সরকারের উদাসীনতার কারণে পর্যটন খাত প্রত্যাশিতভাবে এগোচ্ছে না। তার মতে, শুধু রিসোর্ট ও কটেজ বাড়ালেই পর্যটনশিল্প টেকসই হবে না; প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
রাধানগর ট্যুরিজম এন্ট্রাপ্রেনিউর অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি তাপস দাশ বলেন, ২০০৮ সালে পর্যটন জেলা ঘোষণার কথা বলা হলেও এত বছরেও গেজেট না হওয়া প্রশাসনিক ঘাটতির বিষয়টি সামনে আনে। কোন পর্যায়ে প্রক্রিয়াটি আটকে আছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি চা-বাগান, বন, পাহাড়, হাওর ও জলপ্রপাতকে যুক্ত করে পর্যটন রুট তৈরি করতে হবে। যোগাযোগ, নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটক তথ্য ও প্রচারণাকেও একই পরিকল্পনার আওতায় আনা দরকার।
শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ীদের বর্তমান পরিস্থিতি ভালো নয়। খরচ বেড়েছে, আয় কমেছে। তার দাবি, গত দেড় বছরে জেলা প্রশাসনের পর্যটনবিষয়ক কোনো সভায় তাদের ডাকা হয়নি। ২০১৭ সালে নেওয়া উন্নয়ন পরিকল্পনাটিরও বাস্তবায়ন হয়নি বলে তিনি জানান।
তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন পরিকল্পনা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তানভীর হোসেন বলেন, নতুন করে একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বাজেট পাওয়া গেলে কাজ শুরু হবে। পাশাপাশি জেলা ও উপজেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোর মানোন্নয়নে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব কাজ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মৌলভীবাজারের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে সরকারি সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও পরিবেশবাদীদের সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে যোগাযোগ, নিরাপত্তা, আবাসন, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটনসেবা উন্নত করা গেলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়তে পারে।



