মাধবপুর
মাটির স্তূপের আড়ালে পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরি, আসামিরা অধরা

রাস্তার মাটির স্তূপের আড়ালে জাতীয় জ্বালানি তেল পরিবহনের পাইপলাইন ছিদ্র করে বসানো হয়েছিল বিশেষ পাইপ। সেই পাইপ দিয়ে কৌশলে বের করা হয়েছে কনডেনসেট তেল। পরে তা মজুদ করা হয়েছে বাড়ির বড় বড় ট্যাংকিতে। হবিগঞ্জের মাধবপুরে এমন অভিনব কৌশলে তেল চুরির ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্যসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
গত ৪ নভেম্বর রাতে উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রতনপুর ডাক্তারবাড়ি এলাকায় জিটিসিএল নিয়ন্ত্রিত জাতীয় গ্রিডের দক্ষিণাঞ্চলীয় তেল পাইপলাইনে এ চুরির ঘটনা ঘটে।
জিটিসিএলের হিসাব অনুযায়ী, গত দুই দিনে পাইপলাইন থেকে আনুমানিক ৪ হাজার ২৯২ লিটার কনডেনসেট তেল চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্য ইসলাম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
জিটিসিএলের নিরাপত্তাকর্মীদের সুপারভাইজার দুলাল মিয়া জানান, ঘটনার রাতে ঘটনাস্থলের আশপাশে ইসলাম উদ্দিনকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। নিরাপত্তাকর্মীরা ঘটনাস্থলের পাশে যেতে চাইলে তিনি বাধা দেন।
তার অভিযোগ, ইসলাম উদ্দিন এ তেল চুরির সঙ্গে জড়িত। পরে তার বাড়ির পুকুর থেকে তেল মজুদের বড় দুটি পানির ট্যাংকি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। বাড়িতে তেল রাখার জন্য দুটি বড় গর্তও পাওয়া যায়।
নিরাপত্তাকর্মী শামসু মিয়া জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়নকাজের সময় রতনপুর ডাক্তারবাড়ি এলাকায় রাস্তার মাটি কেটে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। মাটির স্তূপের আড়ালে পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরির কাজ করায় বিষয়টি নিরাপত্তাকর্মীদের নজরে আসেনি। ঘটনার রাতে তেলের গন্ধ পেয়ে তারা চুরির বিষয়টি শনাক্ত করেন। পাইপলাইন থেকে প্রায় ১৫০ গজ দূরে অভিযুক্ত ইসলাম উদ্দিনের বাড়ি। এর আগেও একই এলাকার জামতলায় পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরির ঘটনা ঘটেছিল।
তিনি আরও জানান, পাইপলাইনের পাশেই গ্যাসের লাইন রয়েছে। ফলে এ ঘটনায় আগুন লাগলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার পাশাপাশি তেল ও গ্যাস লাইনের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা ছিল।
মামলার বাদী জিটিসিএলের আশুগঞ্জ অঞ্চলের উপব্যবস্থাপক মো. জায়েদ হোসেন জানান, সিলেটের বিভিন্ন গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদিত কনডেনসেট পাইপলাইনের মাধ্যমে আশুগঞ্জের কনডেনসেট স্থাপনায় নেওয়া হয়। সংঘবদ্ধ চক্রটি মাটির গভীরে গর্ত করে পাইপলাইনে ছিদ্র করে নতুন পাইপ সংযোগ দিয়ে তেল চুরি করেছে। এ ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্য ইসলাম উদ্দিন ও তার লোকজন জড়িত বলে অভিযোগ করে তিনি মামলা করেছেন।
তিনি আরও জানান, গত দুই দিনে আনুমানিক ৪ হাজার ২৯২ লিটার কনডেনসেট তেল চুরি হয়েছে।
জিটিসিএলের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. শামীম হাসান বলেন, বিশেষ সরঞ্জাম স্থাপন করে পাইপলাইন থেকে কৌশলে তেল বের করা হতো। পরে চুরি করা তেল রাখা হত বড় বড় ট্যাংকিতে।
জিটিসিএলের জিএম ও নিরাপত্তা কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, উত্তর-দক্ষিণ জাতীয় তেল পাইপলাইন দেশের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সম্পদ। স্থানীয় লোকজনকে দিয়ে লাইনটির নিরাপত্তার কাজ করানো হচ্ছে। কিন্তু একটি চক্র সুযোগ পেলেই পাইপলাইন ছিদ্র করে অপরিশোধিত তেল চুরির চেষ্টা করে। গত ৪ নভেম্বর রাতে অত্যন্ত কৌশলে তেল চুরির ঘটনা ঘটানো হয়েছে। স্থানীয় লোকজন পুকুর খনন বা মাটি কাটার সময় পাইপলাইন বের হয়ে আসার খবর দিলে তা মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
মাধবপুর থানার ওসি সোহেল রানা জানান, এ ঘটনায় সাবেক ইউপি সদস্য ইসলাম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শামসু চৌধুরী জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পাহাড়, হাওর ও বিলের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত এ পাইপলাইনের নিরাপত্তায় মাত্র চারজন নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে দিন-রাত পাহারার ব্যবস্থা রয়েছে। তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। গত কয়েক বছরে মাধবপুরের রঘুনন্দন, রতনপুর জামতলা, নারায়ণপুর, সাতবর্গ, বোয়ালিয়া ও শাহপুর ফরেস্ট অফিসসহ বিভিন্ন নির্জন এলাকায় পাইপলাইন ছিদ্র করে তেল চুরির ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে চোরচক্রের তৎপরতা বাড়ে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।




