শহর বাড়ে, পৌরসভার পরিধি বাড়ে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শহর ছড়িয়ে পড়েছে পৌরসভার সীমানার বহু বাইরে। গড়ে উঠেছে নতুন আবাসিক এলাকা, হোটেল-রিসোর্ট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান; বেড়েছে জনসংখ্যা ও মানুষের আনাগোনা। অথচ ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৯০ বছরেও বাড়েনি পৌরসভার আয়তন। ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটারের ছোট সীমানায় আটকে থাকা পৌরসভা থেকে নাগরিক সেবা মিলছে না শহরের সঙ্গে কার্যত একীভূত হয়ে যাওয়া আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের। সীমানা বাড়ানোর উদ্যোগ একাধিকবার নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।
পৌরসভার বাসিন্দারা বলছেন, পর্যটন, চা শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কারণে শ্রীমঙ্গলে মানুষের আনাগোনা সারা বছর। চা বাগান, পাহাড়, বন, লেক ও পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান ও ব্যবসার প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে অনেকে স্থায়ীভাবে বসবাসও করছেন এখানে। এতে শহরের জনসংখ্যা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়লেও পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে।
পৌরসভার তথ্য বলছে, ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় পৌর এলাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার হয়েছে। ২০০২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি পৌরসভাটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। তবে আয়তন বাড়েনি। বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ২ হাজার ৬০০ হোল্ডিং রয়েছে। পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব আয় বছরে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। নাগরিক সেবা দিতে রয়েছে প্রায় ২৮ কিলোমিটার সড়ক, ৩৫ কিলোমিটার নালা, ৬৭৫টি সড়কবাতি ও ২ হাজার ৩০০টি পানির সংযোগ।
পৌরসভার আয়তন অপরিবর্তিত থাকলেও শহরের সঙ্গে কার্যত যুক্ত হয়ে গেছে আশপাশের ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা। এসব এলাকার বাসিন্দারা শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে তারা ইউনিয়ন পরিষদের অধীন থাকায় সড়ক, নালা, বর্জ্য অপসারণ, সড়কবাতিসহ বিভিন্ন সেবা নিয়ে সমস্যায় পড়ছেন।
সবুজবাগ এলাকার বাসিন্দা কপিল কুড়ির ভাষায়, তারা শহরের প্রায় সব সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেন। অথচ নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে ইউনিয়নের বাসিন্দা হিসেবে বিবেচিত হন। রাস্তা, নালা, সড়কবাতি ও বর্জ্য অপসারণের সমস্যা দীর্ঘদিনের। পৌরসভার সীমানা বাড়লে এসব সমস্যার সমাধানের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা করেন।
শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পিয়াশ দাশের দাবি, তার এলাকার সবুজবাগ এখন কার্যত শহরের অংশ। কিন্তু ইউনিয়নের আওতায় থাকায় প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত বরাদ্দ পাওয়া যায়। ফলে রাস্তাঘাট, নালা, সড়কবাতি, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের উদ্যোগ অবশ্য নতুন নয়। পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮১ সালে এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু কোনোটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৫ সালে পৌরসভার সীমানা বাড়ানোর দাবিতে দুই ব্যক্তি উচ্চ আদালতে রিট করেন। আদালতের নির্দেশনার পর সম্প্রসারণের কার্যক্রম শুরু হলেও বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ পেরিয়ে প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সর্বশেষ গত ১৯ জুলাই পৌরসভার পক্ষ থেকে নতুন করে সম্প্রসারণের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। পরে প্রস্তাবটি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবে শ্রীমঙ্গল সদর, কালিঘাট ও আশিদ্রোন ইউনিয়নের রূপসপুর, ভাড়াউড়া, সুইনগর, ফুলছড়া, ভুড়ভুড়িয়া, রামনগর, উত্তরসুরসহ কয়েকটি মৌজা ও গ্রাম পৌরসভার অন্তর্ভুক্ত করার কথা রয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে পৌরসভার আয়তন ২ দশমিক ৫৮ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৫২ বর্গকিলোমিটার হবে। জনসংখ্যা প্রায় এক লাখে উন্নীত হতে পারে এবং ওয়ার্ডের সংখ্যা বেড়ে ১২ থেকে ১৪টি হতে পারে।
শহরের বিস্তৃতি ও জনসমাগম বাড়ার সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চাপও বাড়ছে। পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০১৭ সালে জেটি রোড এলাকায় ২ দশমিক ৪৩ একর জমি ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকায় কিনে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে উচ্চ আদালতে একটি মামলার কারণে আদালতের নির্দেশে প্রকল্পের কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প ব্যবস্থা ও উপযুক্ত স্থান খোঁজা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক মো. জিয়াউর রহমানের ভাষ্য, ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৯০ বছর পেরিয়ে গেলেও পৌরসভার আয়তন একই রয়েছে। এ সময়ে জনসংখ্যা, মানুষের চলাচল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেড়েছে। তাই জনসেবা নিশ্চিত করতে পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
‘আগে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এবার স্থানীয় মানুষের মতামত ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নতুন প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে’— বললেন তিনি। যাচাই-বাছাই শেষে প্রস্তাবটি অনুমোদন হবে বলে আশা করছেন পৌর প্রশাসক।





