পাহাড়ে মানুষের আগ্রাসন, বর্ষা এলেই বাড়ছে মৃত্যু

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস— সংগৃহীত ছবি
চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টিতে ঘটছে একের পর এক পাহাড়ধসের ঘটনা। এতে প্রাণহানি হয়েছে অন্তত ৩০ জনের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কক্সবাজার, সেখানে নিহত হয়েছেন ১৯ জন। এই ট্র্যাজেডি আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসের কথা। ওই বছর চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানে প্রাণ হারিয়েছিলেন দেড় শতাধিক মানুষ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা যেমন বাড়ছে, তেমনি বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত বসতি, জুমচাষের বিস্তার এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে পাহাড়ধসের ঝুঁকি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ধস, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যায় কক্সবাজারে ১৯ জন, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে ৫ জন করে এবং রাঙামাটিতে মারা গেছেন ১ জন। কক্সবাজারে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয়। উখিয়ার ৫ নাম্বার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে একটি মাদ্রাসা চাপা পড়ে পাঁচ কিশোরীর মৃত্যু হয়। এ ছাড়া, রামু, পেকুয়া, চকরিয়া ও কক্সবাজার সদরেও পৃথক ঘটনায় প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে অন্তত ১৩ জন রোহিঙ্গা। ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কক্সবাজারে পাহাড়ধসে মৃত্যু হয় অন্তত ৫৮ জনের।
স্থানীয়রা বলছেন, এসব মৃত্যু কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে পাহাড়ের স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। তার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির প্রবণতা বাড়ায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বেড়ে গেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো জানাচ্ছে, কক্সবাজার অঞ্চলে বন উজাড় করে পাহাড়ের ঢাল ও চূড়ায় অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ বসবাস করছেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই দখলদারির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রোহিঙ্গা সংকট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল আইন প্রয়োগ। ফলে প্রতি বছর বর্ষা এলে পাহাড়গুলো পরিণত হয় মৃত্যুফাঁদে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বললেন, প্রতি বছর পাহাড়ধসে মানুষ মারা যায়। প্রশ্ন হলো, কেন একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে? কেন পাহাড়ের ঢালে নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠছে, বনভূমি কেন ধ্বংস হচ্ছে, আর প্রশাসনের চোখের সামনে লাখো মানুষ কেন মৃত্যুঝুঁকিতে বসবাস করছে?
তার ভাষ্য, কক্সবাজারের ২ লাখ ২৩ হাজার একরের বেশি সংরক্ষিত বনভূমির বড় একটি অংশ এরই মধ্যে বনশূন্য হয়ে পড়েছে। বন উজাড়ের ফলে পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে যাচ্ছে । ফলে ভারী বৃষ্টি হলে সহজেই ধসে পড়ছে।
বাংলাদেশে পাহাড়ধসে মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। ২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১২৭ জন, ২০১২ সালে আকবরশাহ এলাকায় ২৮ জন এবং ২০১৭ সালের ১৩ জুন চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে প্রায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয়।
পাহাড়চাপা এই জীবন
১০ জুলাই ২০২৬
চট্টগ্রামে পাহাড় সংরক্ষণে কাজ করা নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘পিপলস ভয়েস’-এর সভাপতি শরীফ চৌহান আগামীর সময়কে বলছিলেন, পাহাড়ধসের প্রধান কারণ হলো নির্বিচারে পাহাড় কাটা। যেসব পাহাড়ে মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ হয়নি, সেসব এলাকায় সাধারণত পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে না। কিন্তু যেখানে পাহাড় কেটে বসতি, সড়ক বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে ধসের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়েছে।
তার মতে, শুধু চট্টগ্রাম নয়; কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় প্রতি বছর পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে। এর মূল কারণ পাহাড় কাটা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব। পাহাড় কাটা বন্ধ করা না গেলে কোনোভাবে প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব হবে না।
তিনি অভিযোগ করেন, পাহাড় রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। যারা পাহাড় কেটে প্লট তৈরি করে বা বসতি গড়ে তোলে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।
জঙ্গলসলিমপুরসহ বিভিন্ন এলাকার উদাহরণ দিয়ে শরীফ চৌহান বলেছেন, বছরের পর বছর পাহাড় কেটে অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠলেও তা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। পাহাড় রক্ষায় সরকারের নীতিগত অবস্থান এবং আইন প্রয়োগে দুর্বলতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, পরিকল্পনাহীন জুমচাষ, প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে একক প্রজাতির গাছ লাগানো, পাহাড় কেটে পর্যটনকেন্দ্র ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং বনজসম্পদের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পাহাড়ের পরিবেশগত ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করে তুলছে। ফলে ভারী বৃষ্টির সময় ভূমিধসের ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদের ভাষ্য, জলবায়ু ও আবহাওয়ার ধরন বদলে যাওয়ায় এখন অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। আগে বর্ষাকালে কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হতো, কিন্তু এখন এক-দুই দিনের মধ্যে কয়েক দিনের সমপরিমাণ বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। মৌসুমি বায়ুর আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে বর্ষা দেরিতে শুরু হচ্ছে, কিন্তু যখন বৃষ্টি হচ্ছে, তখন তা তীব্র আকার ধারণ করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহ আগামীর সময়কে বলেছেন, দেশের পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ পাহাড় বালুময় এবং কোথাও কোথাও বালুমাটি ও কাদামাটির মিশ্রণে গঠিত। এ কারণে অতিবৃষ্টির সময় পাহাড়ের ভেতরে পানি দ্রুত প্রবেশ করে মাটির স্তরগুলোকে দুর্বল করে দেয়।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশে যেটিকে সাধারণভাবে ‘ল্যান্ডস্লাইড’ বলা হয়, বাস্তবে অধিকাংশ কাদামাটির ধস। শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ের মাটিতে ফাটল সৃষ্টি হয়। বর্ষাকালে সেই ফাটল দিয়ে পানি প্রবেশ করে মাটিকে ধীরে ধীরে আলগা করে। পর্যাপ্ত পানি জমে গেলে মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে নিচের দিকে ধসে পড়ে সেই মাটি।
ড. মহিবুল্লাহ বললেন, পাহাড়ধসের জন্য সাধারণত তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করে। প্রথমত, টানা বা ভারী বৃষ্টিপাত। দ্বিতীয়ত, পাহাড়ের বালুময় মাটির গঠন। তৃতীয়ত, মানুষের হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে পাহাড় কেটে বসতি, রাস্তা বা অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ। এই তিনটি কারণ একসঙ্গে উপস্থিত থাকলে পাহাড়ধস প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।
‘প্রকৃতিগতভাবে পাহাড় একটি স্থিতিশীল কাঠামো, যা নিজের স্বাভাবিক ঢাল ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিয়ে টিকে থাকে। কিন্তু পাহাড়ের পাদদেশ কেটে ফেলা, মাঝখান থেকে মাটি সংগ্রহ করা, জুমচাষ বা অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ে হস্তক্ষেপের কারণে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়। ফলে বৃষ্টির পানি মাটির গভীরে প্রবেশ করে পাহাড়কে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে’, যোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি জানালেন, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটিসহ পার্বত্যাঞ্চলে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, পর্যটনকেন্দ্র ও স্থাপনা তৈরির প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়বে। কাজেই পাহাড় না কাটার বিষয়ে কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে সরকারকে। পাহাড়ে নতুন বসতি ও স্থাপনা নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ বসতি পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের স্বাভাবিক ঢাল ও প্রাকৃতিক গঠন অক্ষুণ্ন রেখে উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।







