পাহাড়ি ঢল-বানের জলে ভাসছে বাঁশখালীর ২১২ গ্রাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাতটা ছিল ভয়ের। বাড়ির নারী ও শিশুদের আগেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন বাঁশখালা গ্রামের যুবক মোহাম্মদ রিয়াদ। পুরুষরা থেকে গিয়েছিলেন বাড়ির আশপাশে, চোখে ঘুম নেই কারও। অন্ধকারে শুধু শোনা যাচ্ছিল একের পর এক মাটির ঘর ভেঙে পড়ার শব্দ। সকাল হতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভীষিকার দৃশ্য— অনেক ঘর পানিতে মিশে গেছে। ধান, চাল, আসবাবপত্র কিছুই বের করা যায়নি, সব ভাসছে পানিতে।
‘সারারাত ঘুমাতে পারিনি। শুধু মাটির ঘর ভেঙে পড়ার শব্দ শুনেছি’ বলছিলেন রিয়াদ। তার ভাষ্যে, বাঁশখালা গ্রামে পাকা দালান ছাড়া প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ বাড়িঘর এখন পানির নিচে। কোথাও গলা সমান, কোথাও কোমর সমান পানি।
শুধু বাঁশখালা গ্রাম নয়— পুরো বাঁশখালী উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের ২১২টি গ্রামের অধিকাংশই এখন পানির তলায়। সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী এই উপজেলার জনসংখ্যা ৪ লাখ ৯০ হাজার ৭৭৭ জন, যার মধ্যে নারী ২ লাখ ৪৫ হাজার এবং শিশু-কিশোর ২ লাখ ৬ হাজার ৯১ জন। মোট ঘরের সংখ্যা ১ লাখ ১ হাজার ৫৪৩টি। যার বড় একটি অংশ এখন পানিবন্দি।
পাহাড়ি ঢল আর বানের পানি হঠাৎ করেই ঢুকে পড়েছে মানুষের ঘরে। প্রস্তুতির কোনো সুযোগই পাননি কেউ। নলকূপ ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে সুপেয় পানির তীব্র সংকট। ঘরে মজুদ না থাকায় সংকট তৈরি হয়েছে শুকনো খাবারেরও। মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে একের পর এক। ভেসে গেছে ধান-চাল ও ঘরের আসবাব। বিদ্যুৎ নেই কয়েক দিন ধরে। মোবাইলে চার্জ ফুরিয়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগও। বাঁশখালী-চট্টগ্রাম মূল সড়কের একাংশ ভেঙে গেছে। পুকুর ও মাছের খামার ভেসে গেছে পানিতে। হাঁস-মুরগিও হারিয়েছেন অনেকে। অসুস্থ মানুষ আর গর্ভবতী নারীদের নিয়ে সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছেন পরিবারগুলো। এর মধ্যেই বঙ্গোপসাগরের বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে উপকূল জুড়ে।
রত্নপুর গ্রামের বাসিন্দা পারভেজ চৌধুরীর কণ্ঠে বিস্ময় আর ভয় মেশানো। বললেন, ‘আমাদের উপকূলীয় এলাকা, সাধারণত পানি দ্রুত নেমে যায়। বাড়িতে এত পানি আমাদের বয়সে দেখিনি আর। সবাই পানিবন্দি, বাড়িঘরে পানি উঠে গেছে।’
বাহারছড়া গ্রামের দিঘীরপাড়ার বাসিন্দা আব্দুল্লাহ আল মোমেন সকালে একটু আশার আলো দেখেছিলেন। বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় ভেবেছিলেন, এবার হয়তো পানি নামবে; কিন্তু সেই আশা বেশিক্ষণ টেকেনি। বললেন, ‘পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে। সড়কের ওপর এক হাঁটু পানি। সকালে বৃষ্টি বন্ধ হওয়ায় পানি কমবে মনে করেছিলাম। এখন আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।’
ইলশা গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য কামরুল আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘বাহারছড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ বাড়িঘর এখন পানির নিচে। পাকা দালানের বাসিন্দারা কিছুটা নিরাপদ থাকলেও কাঁচা, টিনশেড ও মাটির ঘরগুলো পুরোপুরি ভাসছে পানিতে। পানি কমছে না। উল্টো বাড়ছে।’
তবে সবার ভাগ্য সমান খারাপ নয়। সাধনপুর গ্রামের জুলেখা আক্তারের ভিটা কিছুটা উঁচু হওয়ায় এখনো পানি ঘরে ঢোকেনি; কিন্তু স্বস্তি নেই তার মধ্যেও— আশপাশের প্রায় সব বাড়িঘরে পানি ঢুকেছে, আর নতুন করে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় তিনিও এখন আতঙ্কে দিন গুনছেন।
ছনুয়া গ্রামের আনোয়ারুল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক মোহাম্মদ ইলিয়াস জানালেন, ‘পশ্চিম বাঁশখালীর পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম জলকদর খাল। খাল দখল হয়ে ভরাট হয়ে গেছে। স্লুইস গেটগুলোও অকার্যকর। বিভিন্ন জায়গায় মাছের ঘেরের জন্য দেওয়া বাঁধের কারণে পানি নামার পথও রুদ্ধ। এর ফলে পুরো এলাকা তলিয়ে আছে। বন্ধ হয়ে গেছে সড়কে যান চলাচল। এই দুর্ভোগের মধ্যেই সকালে এক প্রসূতি মাকে কোনোভাবে ভ্যানগাড়িতে করে হাসপাতালে নিতে হয়েছে।’
শিল্পী সমিতির নির্বাচনে হেরে প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইলেন চিত্রনায়িকা পলি
০৬ জুলাই ২০২৬
পাতিলে করে উদ্ধার আট মাসের শিশু
দুর্ভোগের এমন পরিস্থিতিতেই সামনে এসেছে এক মানবিক দৃশ্য। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাঁশখালীর চেচুরিয়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় পানিবন্দি হয়ে পড়া কয়েকজনের খবর পেয়ে ছুটে যায় বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিসের আট সদস্যের একটি দল। গলা সমান পানি ঠেলে তারা উদ্ধার করেন আটকে পড়া পাঁচ শিশু ও আট নারীকে। পরে স্থানান্তর করা হয় স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে।
এই উদ্ধার অভিযানের একটি ২১ সেকেন্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকে। যেখানে দেখা যায়— এক হাতে রশি, অন্য হাতে একটি পাতিল ধরে গলা সমান পানিতে সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের এক সদস্য। পাতিলের ভেতরেই ছিল আট মাস বয়সী এক শিশু। পাশে হাঁটতে থাকা আরেক সদস্য পাতিলের ওপর ধরে রেখেছিলেন ছাতা, যাতে বৃষ্টির পানি শিশুটির গায়ে না লাগে।
বাঁশখালী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেছেন, আটকে থাকার খবর পেয়ে সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকাজ চালান, আর সেই সময় বড় একটি পাতিলে করেই শিশুটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।







