কথা ছিল হবে বিয়ের উৎসব, হলো জানাজা

ছবি: আগামীর সময়
জীবিকার তাগিদে পাঁচ ভাইয়ের চারজনই গিয়েছিলেন ওমানে। বিয়ে করতে দুই ভাই ফেরার কথা ছিল দেশে। কিন্তু ফেরার দুদিন আগে একই গাড়িতে মৃত্যু হয় চার ভাইয়ের। ধুমধাম করে বিয়ের উৎসবের যে আনন্দ আয়োজন হওয়ার কথা ছিল, সেটা পরিণত হয় বিষাদে।
জীবিত আর ফেরা হল না তাদের, ফিরল তাদের মরদেহ। বিয়ের উৎসবের বদলে হল জানাজা। চার ভাইয়ের জানাজার ইমামতি করলেন দেশে থাকা জীবিত একমাত্র ভাই। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাদের বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলাসহ আশপাশের এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
মৃত্যুর সাতদিন পর গতকাল মঙ্গলবার (১৯ মে) রাতে ওমান থেকে দেশে ফিরে চারজনের মরদেহ। ঢাকায় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে রাত ৯টার দিকে রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা হুমাম কাদের চৌধুরী তাদের কফিনবন্দি মরদেহ গ্রহণ করেন। এরপর কফিনবন্দি মরদেহগুলো চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেয়। আজ বুধবার ভোরে চারটি ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে করে চারটি মরদেহ বাড়িতে পৌঁছায়।
মারা যাওয়া চার ভাই হলেন— শাহিদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও রাশেদুল ইসলাম। তাদের বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তারা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বন্দারাজারপাড়ার প্রয়াত আব্দুল মজিদের ছেলে। তাদের আরেক ভাই মোহাম্মদ এনাম শুধু জীবিত আছেন।
প্রতিবেশী মোহাম্মদ আরফাত আগামীর সময়কে জানালেন, শাহিদুল ও সিরাজুল বিবাহিত। তাদের মধ্যে সিরাজুলের বিয়ে হয় মাত্র সাত মাস আগে। তৃতীয় ভাই এনাম রাঙ্গুনিয়ার একটি মাদ্রাসায় এখনো পড়ালেখা করছেন। তিনি বিয়েতে সম্মত না হওয়ায় শহিদুল ও রাশেদুলের বিয়ে ঠিক করে তাদের পরিবার। বিয়ের জন্য ১৫ মে তাদের দেশে ফেরার কথা ছিল।
এর আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক এ ঘটনা। চট্টগ্রাম সমিতি ওমানের সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরীর ভাষ্য, দেশটির সময় ১৯ মে রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ শহরে একটি চালু থাকা মাইক্রোবাসের ভেতর থেকে আটকে পড়া অবস্থায় চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত্যুর আগে এক ভাই তাদের গ্রামের প্রবাসী চাচাতো ভাই পারভেজের কাছে প্রাণ রক্ষার আর্তি জানিয়ে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছিলেন, ‘আমরা খুবই অসুস্থ। গাড়ি থেকে বের হতে পারছি না।’ কিন্তু সেই মেসেজের জবাবে ১০ মিনিট পর তাদের ফোন করে আর সাড়া পাননি পারভেজ।
চার ভাইয়ের মধ্যে বড় দুই ভাই ওমানের বারাকা শহরে থাকতেন। কাজের সূত্রে আর দুই ভাই ভিন্ন ভিন্ন শহরে থাকতেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বারকায় চার ভাই একত্র হয়েছিলেন বিয়ের বাজার করতে। পরে তারা মুলাদ্দাহা শহরে যান। ওমান পুলিশের ধারণা, গাড়ি চালু থাকা অবস্থায় এসির এগজোস্ট থেকে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
আজ বুধবার ভোরে চার ভাইয়ের মরদেহ বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স তাদের বাড়ির উঠানে পৌঁছায়। ঘরের ভেতরে তখন কান্নার রোল। সত্তরোর্ধ মায়ের কাছে এক সপ্তাহ ধরে গোপন করে রাখা হয়েছিল চার ছেলের মৃত্যুর সংবাদ। শেষ পর্যন্ত তিনি জানতে পেরেছেন কি না, সেটা পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেননি। পরিবারের লোকজন সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
আজ ভোরের আলো ফুটতেই পাড়া-প্রতিবেশীসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ পৌঁছান বাড়ির দিকে। সকাল গড়াতেই জড়ো হন হাজারো মানুষ। শোকাহত সবাই। চার ভাইয়ের মুখ একনজর দেখার জন্য সবার মধ্যেই আকুতি।
বেলা ১১টায় নিজ গ্রাম রাঙ্গুনিয়ার লালানগর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজারো মানুষের সমাগম ঘটে। উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসন, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। ভাই এনামের ইমামতিতে জানাজা শেষে বন্দারাজারপাড়া জামে মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে পাশাপাশি চারজনকে দাফন করা হয়।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান বলেছেন, ‘চার ভাইয়ের একই সঙ্গে মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক। ওমানের বাংলাদেশ দূতাবাসের তৎপরতা এবং আমাদের এমপি মহোদয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টার কারণে লাশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে এসেছে। এখন মৃত্যু পরবর্তী সময়ে সরকারিভাবে প্রবাসীদের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা তাদের পরিবার প্রাপ্য, সেটা দ্রুত দেওয়ার ব্যবস্থা আমরা করেছি। এরপরও উনাদের পরিবারের পাশে সরকারিভাবে আমরা থাকব। তাদের লোকাল প্রশাসন থেকে সহযোগিতা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।’
জীবিত একমাত্র ভাই এনাম মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন জানিয়ে ইউএনও বলেছেন, ‘এনামকে যদি মেন্টাল হেলথের কোনো কনসালট্যান্টের মাধ্যমে চিকিৎসা দিতে হয়, সেই ব্যবস্থা আমরা করব। তার জীবিকার জন্য যা করা দরকার, লোকাল প্রশাসন থেকে আমরা তার পাশে থাকব।’






