টাকা নাই তাই আইসিইউতে রাখা গেল না, পথেই অন্তঃসত্ত্বার মৃত্যু
- আইসিইউতে বিল হয়েছিল ১ লাখ ২১ হাজার টাকা
- অন্তঃসত্ত্বার ছেলেও হাসপাতালে
- জানে না সিভিল সার্জন অফিস

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের পাহাড়তলির বাসিন্দা মণি আকতার। ছিলেন ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আর কয়েক দিন পরেই তার কোল আলো করে আসার কথা ছিল নতুন অতিথির। কিন্তু তার আগেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন মণি, সঙ্গে নিয়ে গেছেন অনাগত সন্তানকেও।
ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন মণি। গত শুক্রবার সকালে প্রথমে তাকে আগ্রাবাদের মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন পরিবারের সদস্যরা। বিকালেই চিকিৎসক জানিয়েছেন মণিকে এইচডিইউ বা উচ্চ নির্ভরশীলতা কেন্দ্রে নিতে হবে। কিন্তু সেখানে সিট খালি না থাকায় রাতে নেওয়া হয় বেসরকারি সাজিনাস হসপিটালে। প্রথমে আইসিইউতে এবং পরে শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেয় সাজিনাস। কিন্তু চিকিৎসা ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় স্বজনরা মুচলেকা দিয়ে মণিকে রিলিজ করে নেন। অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে শরীরের কিডনি, লিভার, ফুসফুসসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয় মণির। সেখানেই মারা যান তিনি। তবে তার মৃত্যুর তথ্য সিভিল সার্জন কার্যালয় কিংবা দৈনিক ডেঙ্গু রিপোর্টে যুক্ত করা হয়নি। যেমনটি হয়নি গত ১১ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া অর্পিতা দাশের তথ্যও। ৩৫ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা এই নারীও ছিলেন পাহাড়তলি এলাকার বাসিন্দা।
সাজিনাস হসপিটালও মণি আকতারের মৃত্যু সম্পর্কে সিভিল সার্জন অফিসে কিছুই জানায়নি। মণির স্বামী আল আমীন আগামীর সময়ের কাছে নিশ্চিত করেছেন স্ত্রীর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বিষয়টি। তিনি বললেন, ‘মা ও শিশু হাসপাতাল থেকে যখন সাজিনাসে নেওয়া হয়, তখনই তার অবস্থা খারাপ ছিল। জরুরিভিত্তিতে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। পরে তাকে লাইফ সাপোর্টে দেওয়া হয়। তারা চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাঁচানো যায়নি। আমাদের অনাগত সন্তানসহ মণি মারা গেল।’
পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় মণিকে লাইফ সাপোর্ট থেকে মুচলেকা দিয়ে বাসায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জানিয়ে আল আমীন বললেন, ‘এরই মধ্যে বিল আসে ১ লাখ ২১ হাজার টাকা।’
এর আগে ১৬ সেপ্টেম্বর মণি আকতারের জ্বর হয়। প্রথম দিন জ্বরের সাধারণ ওষুধ খাওয়ানো হয়। পরদিন চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে দেখা যায় তার রক্তচাপ কম। দ্রুত শরীর খারাপ হতে শুরু করে। শুক্রবার প্রথমে মা ও শিশু হাসপাতালে এবং সেখানে অবস্থার অবনতি হলে নেওয়া হয় সাজিনাসে।
গত রবিবার বায়েজিদ লিংক রোডে অবস্থিত সাজিনাস হসপিটালের সঙ্গে যোগাযোগ করে আগামীর সময়। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আরেফিন বললেন, ‘শনিবার ডেঙ্গুতে তাদের ওখানে কোনো রোগী মারা যায়নি। মণি আকতার নামে কোনো রোগী ছিল না।’
গতকাল সোমবার মণি আকতারের স্বামীর সঙ্গে কথা বলে ফের যোগাযোগ করা হয় সাজিনাসে। ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ আরেফিন একই কথা বললেন। তখন তাকে আল আমীনের কাছে পাওয়া কাগজপত্রের প্রমাণ দিতে চাইলে তিনি বললেন, ‘আমি একটু আইসিইউতে খোঁজ নিয়ে আপনাকে জানাব।’
প্রতিদিনের ডেঙ্গু রিপোর্ট তত্ত্বাবধানে জড়িত জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহকারী জাহিদুল ইসলামের কাছেও বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। তিনি বললেন, ‘সাজিনাস হসপিটাল ডেঙ্গু তথ্য নিয়মিত পাঠায়। তবে দু-এক দিনের মধ্যে কোনো রোগীর মৃত্যুর তথ্য দেয়নি।’
ছেলেও হাসপাতালে
আল আমীন ও মণি আকতারের একমাত্র ছেলে আবু জাহেদও জ্বরে ভুগছে। আট বছর বয়সী জাহেদকে গতকাল সকালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার জ্বরের পাশাপাশি বমি হচ্ছিল। মা মণি আকতারকে দাফন করার পর তার অবস্থা আরও খারাপ হয়।
স্ত্রীর মৃত্যুর পর ছেলেকে নিয়ে উদ্বিগ্ন আল আমীন। বললেন, ‘এক ডেঙ্গু আমার জীবনটা তছনছ করে দিয়েছে। এখন আমার ছেলেটা বমি করছে। তাকে নিয়ে ভয়ে আছি।’
এক দিনে রেকর্ড ডেঙ্গু রোগী: চট্টগ্রামে এই মৌসুমে এক দিনে সর্বোচ্চ ১২৬ জন ডেঙ্গু রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এরমধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩১ জন, বিআইটিআইডি হাসপাতালে ২৪ ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ৪৩ জন রোগী এক দিনে ভর্তি হয়েছে। স্বাস্থ্য সহকারী জাহিদুল ইসলাম বলছিলেন, একসঙ্গে এত রোগী এক দিনে এই প্রথম ভর্তি হলো।



