গান ও কথায় মাটি-মানুষের শিল্পী গফুর হালীকে স্মরণ

আব্দুল গফুর হালির ৯৮ তম জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠানে অতিথিরা। চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি থেকে তোলা। ছবি- আগামীর সময়
'সোনা বন্ধু তুই আমারে করলিরে দেওয়ানা’ কিংবা ‘মনের বাগানে ফুটিল ফুল রে' — চট্টগ্রামের মানুষের মুখে মুখে ফেরা এরকম অসংখ্য গানের স্রষ্টা আবদুল গফুর হালী। তার গানে শুধু প্রেম-বিরহ কিংবা আধ্যাত্মিকতার কথাই নেই; আছে চট্টগ্রামের মাটি, মানুষের জীবন, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও লোকজ সংস্কৃতির গল্প। চাটগাঁইয়া ভাষাকে গানের শক্তিতে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দেওয়া এই কিংবদন্তি শিল্পীকে তার ৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ করা হয় গান, আলোচনা আর স্মৃতিচারণে।
গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টারের আয়োজনে আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টারের ভাইস চেয়ারম্যান ও পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন। প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান।
আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, গফুর হালীর গুরুত্ব শুধু তার বিপুলসংখ্যক গান রচনায় নয়; চট্টগ্রামের মানুষের মুখের ভাষা ও জীবনকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়াই তার বড় অবদান। দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি আঞ্চলিক গান, মাইজভাণ্ডারী ও মরমি সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের মতো শিল্পীদের কণ্ঠে জনপ্রিয় বহু গানের পেছনেও রয়েছে তার কথা ও সুর।
উপাচার্য বলেছেন, ‘মানুষ তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকেন। গফুর হালীর সৃষ্টি সংরক্ষণে রিসার্চ সেন্টারের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে মানুষের ভালোবাসা, আকাঙ্ক্ষা ও নানা অনুভূতি তার গানে উঠে এসেছে।’ হারিয়ে যাওয়া গুণী শিল্পীদের খুঁজে বের করতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ চালুর কথাও জানান তিনি।
কবি ও কথাসাহিত্যিক, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেছেন, ‘গফুর হালীর মতো লোকজ শিল্পীরা দীর্ঘদিন তথাকথিত অভিজাত সংস্কৃতির কারণে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। গফুর হালী ছিলেন মাটির মানুষ।’
বিশেষ অতিথি লেখক ও গবেষক, ফিনল্যান্ডের হেলসিংকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো ড. সেলিম জাহাঙ্গীর বললেন, ‘গফুর হালীকে নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মূল্যবান গবেষণা হয়েছে। তার গান জার্মান ভাষায় অনূদিত হওয়া চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতির জন্য বড় অর্জন। গফুর হালীকে নিয়ে আরও গবেষণা হলে চট্টগ্রামের ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে নতুনভাবে জানা সম্ভব।’
আঞ্চলিক গানের খ্যাতিমান শিল্পী কল্যাণী ঘোষ মন্তব্য করেন, মাইজভাণ্ডারী গানের শিল্পী হিসেবে তার পরিচিতির পেছনে গফুর হালীর বড় অবদান রয়েছে। গফুর হালীর গান ও সুর অন্যদের মাধ্যমে ব্যবহৃত হওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি।
আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টারের সেক্রেটারি নাসির উদ্দিন হায়দার বলেছেন, ‘গফুর হালী চট্টগ্রামের আঞ্চলিক, মাইজভাণ্ডারী ও মরমি গানের নবযুগের অন্যতম স্রষ্টা।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলম চৌধুরী প্রমুখ।
১৯২৯ সালের ৬ আগস্ট পটিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর মারা যান। তার সৃষ্টি সংরক্ষণ ও প্রচারে পিএইচপি ফ্যামিলির সহযোগিতায় আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টার কাজ করছে।
অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন খ্যাতিমান শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, আব্দুল মান্নান কাওয়াল, শিরিন, ডা. দীপঙ্কর দে, জিয়াউদ্দিন বাদশা, গীতা আচার্য, আলাউদ্দিন কাওয়াল ও নয়ন শীল। গানে গানে স্মরণ করা হয় বাংলাদেশের লোকজগানের কিংবদন্তি এই শিল্পীকে।






