চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড
১০ লাখ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীন পরীক্ষার্থীদের রোল, রেজিস্ট্রেশন নাম্বারসহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য থাকার কথা অনুমোদিত তিনটি সরকারি ওয়েবসাইটের অনলাইন সার্ভারে। কিন্তু চট্টগ্রামে গত চার বছরে ১০ লাখের বেশি এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীর রোল, রেজিস্ট্রেশন নাম্বার, জিপিএ এবং জন্মতারিখসহ স্পর্শকাতর সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন ধরনের বেসরকারি ওয়েবসাইটে, যা সাইবার জগতে বিপুল শিক্ষার্থীকে ফেলেছে নিরাপত্তাঝুঁকিতে, একই সঙ্গে এর মাধ্যমে লঙ্ঘন হচ্ছে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষার আইনেরও। কেননা, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। ফলে অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া তথ্যগুলো জনসমক্ষে উন্মুক্ত হয়ে পড়ায় তাদের মারাত্মক সাইবার ঝুঁকিতে ও সামাজিক প্রতারণার মুখে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। যদিও নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
অনুসন্ধানে এমন অন্তত তিনটি ওয়েবসাইট ঠিকানার সন্ধান পেয়েছে আগামীর সময়। এর মধ্যে দুটির ডোমেইন ভারসেল ডট অ্যাপ এবং আরেকটি ডোমেইন গিটহাব ডট আইও। ওয়েবসাইটগুলোর মধ্যে একটিতে পরীক্ষার্থীদের রোল, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম, পরীক্ষার বছর, ধরন, বিভাগ, মেরিট র্যাংক, মোট প্রাপ্ত নম্বর, জিপিএ, মা-বাবার নাম, জন্মতারিখ এবং বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বরসহ ১৪ ধরনের তথ্য সরাসরি দেখা যাচ্ছে। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সব তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
আরেকটিতে শিক্ষার্থীর নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম, রোল, জিপিএসহ সাত ধরনের তথ্য যে কেউ দেখতে পাচ্ছেন। এখানে ২০২২ সালের এসএসসি, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এসএসসি ও এইচএসসি এবং ২০২৬ সালের এসএসসির ফলাফলভিত্তিক আটটি তথ্য উন্মুক্ত। একইভাবে অন্তত আট ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত তৃতীয় ওয়েবসাইটটিতেও। এখানে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের এইচএসসি এবং ২০২৫ ও ২০২৬ সালের এসএসসির ফলের সব তথ্য মিলছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা বোর্ডের তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেজ হ্যাকিং না হলে এসব সংবেদনশীল তথ্য বাইরে আসার সুযোগ নেই।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ৭ লাখ ২২ হাজার ৩৯৯ জন। আর ২০২৩-২৫ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন ৩ লাখ ১০ হাজার ১৩৬ জন। সব মিলিয়ে দুই পাবলিক পরীক্ষায় ১০ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৫ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য এভাবে ফাঁস হয়েছে।
দৈবচয়ন ভিত্তিতে অন্তত ১০০ শিক্ষার্থীর রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর শিক্ষা বোর্ডের অফিসিয়াল ফলাফলের ওয়েবসাইটে দিয়ে যাচাই করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, সরকারি পোর্টালে সার্চ দিলে ফল, গ্রেডসহ ১১টি তথ্য মেলে। অথচ অননুমোদিত ওয়েবসাইটগুলোয় রোল-রেজিস্ট্রেশনের বিপরীতে জন্মতারিখসহ বাড়তি আরও তিনটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন-২০২৬ ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ডেটা প্রাইভেসি নীতিমালা অনুযায়ী, নাম, জন্মতারিখ, মা-বাবার নাম এবং প্রাতিষ্ঠানিক রোল ও রেজিস্ট্রেশন ‘ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তযোগ্য তথ্য’ (পিআইআই) হিসেবে বিবেচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অনুমতি ছাড়া এসব তথ্য প্রকাশ বা প্রদর্শন করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৮ বছরের নিচে, তাই আইনের বিধান অনুযায়ী তাদের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের আগে অভিভাবকের স্পষ্ট সম্মতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এসব ওয়েবসাইটে কোনো ধরনের সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা বা সম্মতির প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি।
আগামীর সময় কয়েকজন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকের সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের কোনো অভ্যন্তরীণ ডেটাবেজ বা এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস) থেকে হয়তো এসব তথ্য হ্যাক করা হয়েছে। এভাবে নাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মা-বাবার নাম প্রকাশ্যে থাকলে তা দিয়ে হ্যাকার বা প্রতারক চক্র খুব সহজেই ভুয়া পরিচয় তৈরি (আইডেন্টিটি থ্যাফট) করতে পারে। একই সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক নম্বর ও ফলের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা কোচিং সেন্টার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত নম্বরে যোগাযোগ করে বিরক্ত করার সুযোগ পায়, যা সাইবার বুলিংয়ের ঝুঁকিও বাড়ায়।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মু. সাক্বী কাওসার বললেন, যেসব তথ্য শিক্ষা বোর্ড প্রকাশ করেনি, সেগুলো থার্ডপার্টি ওয়েবসাইটে পাওয়ার অর্থ হলো, তাদের ডেটাবেজ হ্যাক হয়েছে। কারণ কেউ স্ক্র্যাপ করলে তারা যা প্রকাশ করেছে, তা-ই শুধু পাওয়া যেত। বাড়তি তথ্য পাওয়া যেত না। এটি ভয়াবহ ঘটনা। ব্যক্তিগত তথ্য পাবলিক ডোমেইনে প্রকাশ হওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হওয়াসহ নানা নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার দায়িত্ব শিক্ষা বোর্ডের। এর দায় শিক্ষা বোর্ডকে নিতে হবে।
শিক্ষা বোর্ড ও সরকারের সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিভাগগুলোর দ্রুত এসব অননুমোদিত ওয়েবসাইট বন্ধ করা এবং শিক্ষা বোর্ডের তথ্যভাণ্ডারের নিরাপত্তাব্যবস্থা পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
ডিজিটাল অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ডিজিটালি রাইট’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরীও বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। তিনি বলছিলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুতর এবং এটি বোর্ডের পুরো ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আইন লঙ্ঘনের পাশাপাশি এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকরা শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের নানামুখী হয়রানি ও আর্থিক প্রতারণার মুখে ফেলতে পারেন। এজন্য শিক্ষা বোর্ডকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’
তবে তথ্য ফাঁসের বিষয়টি অস্বীকার করলেন চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী। তার দাবি, ‘বোর্ড থেকে কোনো ব্যক্তিগত তথ্য উন্মুক্ত করা হয়নি বা কাউকে দায়িত্বও দেওয়া হয়নি। আমাদের মূল ডেটাবেজ হ্যাক হওয়ার সুযোগ নেই। ফলাফল প্রক্রিয়ার জন্য আমরা বুয়েট, চিটাগং ডকইয়ার্ড লিমিটেড ও টেলিটককে তথ্য দিয়ে থাকি, সেখান থেকে কিছু হয়ে থাকতে পারে।’ তবে এতে বড় কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হবে না বলেও তিনি মনে করেন।




