বন্যায় নষ্ট ১৪০ কোটি টাকার সবজি, উত্তরবঙ্গের ভরসায় চট্টগ্রাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বন্যায় পুরোপুরি নষ্ট সবজি ক্ষেত। মাঠে নেই কোনো সবজি। একসপ্তাহ ধরে এই অঞ্চলের সবজি চাহিদা মেটাচ্ছে উত্তরবঙ্গ। তাই চড়াদামে কিনতে হচ্ছে ক্রেতাকে। কৃষকরা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অনুকুল থাকলে নতুন সবজি বাজারে আসতে লাগবে কমপক্ষে দুই মাস। ততদিন উত্তরবঙ্গের সবজির ওপর নির্ভর করেই চলতে হবে চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষদের।
কৃষি বিভাগের হিসাব, বন্যায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ৯ হাজার ২০৮ হেক্টর জমির শাক-সবজি নষ্ট হয়ে মোট ৫৬ হাজার ৭৩০ টন সবজির উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টাকার অংকে যা প্রায় ১৪০ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এই খাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৭৩ হাজার ৮৭৫ কৃষক পরিবার। অর্থাৎ সাড়ে ৫৬ হাজার টন সবজি মাঠেই নষ্ট হয়ে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ সবজি দিয়ে চট্টগ্রাম অন্তত দুই মাস চলত।
চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ জানিয়েছেন, ‘কৃষি ক্ষতির হিসাব করে ক্ষতিপূরণের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অপেক্ষায় আছি অনুমোদনের।’
ক্ষেত বিলীন হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের আড়ত থেকে খুচরা বাজারে সবজির দাম অনেক বেড়েছে। বন্দরনগরী রিয়াজউদ্দিন বাজারের আড়তে সবচেয়ে কমদামি সবজি হচ্ছে পেঁপে। কেজি ২২ টাকা। আর দামি সবজি ঝিঙা ১০০ টাকা।
এছাড়া বেগুন ৮০ টাকা, পটল ৫০, লাউ ৪০, চিচিঙ্গা ৩৫-৪০, কচুর ফুল ৩৫, বরবটি ৯০, ঢেড়স ৭০, করলা ৮০, কাকরোল ৯০, ঝিঙা ১০০ টাকা, কচুর ছড়া ৫০ টাকায় আড়তগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। ভারত থেকে আমদানি করা টমেটো কেজি ১০০ টাকা। মরিচ ২০০ টাকা। কেজি ২০০ টাকার লেটুস পাতা এখন ১৬০০ টাকা। ১৫০ টাকা পেঁয়াজ পাতা ৪০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। আড়ত থেকে অন্তত দেড় থেকে দ্বিগুণ দামে সবজি বিক্রি হচ্ছে খুচরা বাজারে।
রিয়াজউদ্দিন বাজার একতা বাণিজ্যালয়ের মালিক নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ‘একসপ্তাহ ধরে সবজির সরবরাহ অর্ধেকে নেমেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার থেকে কোনো সবজি আসছে না। উত্তরবঙ্গের সবজিই এখন চট্টগ্রামের চাহিদা মেটাচ্ছে। তাই দাম চড়ে গেছে। এভাবে কতদিন চলবে জানি না।’
রিয়াজউদ্দিন বাজার আড়তে দুই ধরনের সবজি আসে। চট্টগ্রাম, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের চকরিয়া-পেকুয়া থেকে। এগুলো টাটকা, দাম কিছুটা বেশি, স্বাদও বেশি। বাকিটা উত্তরবঙ্গ থেকে। ‘লাইনের সবজি’ হিসেবে পরিচিত এই সবজির দাম কিছুটা কম। আড়তে আগে প্রতিদিন শুধু উত্তরবঙ্গ থেকে ৬০ ট্রাক সবজি আসত। এখন সেটি অর্ধেকে নেমে ৩০ ট্রাকে নেমেছে। ৩০ ট্রাক মানে ৪৫০ টন সবজি। এর বাইরে দক্ষিণ চট্টগ্রাম, চট্টগ্রামের আশপাশের উপজেলা ও চকরিয়া-পেকুয়া থেকে আসত ১-৩ টনের ট্রাকে। এই সবজির পরিমাণও দিনে ২৫০ টন। এই ২৫০ টন পুরোটাই বাজারে সরবরাহ বন্ধ। এতেই মূলত দাম চড়ে গেছে।
চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ সবজিক্ষেত এখন বন্যায় বিলীন। শুধু সবজির মাচা দেখা মিলছে। কৃষক আবু তাহের জানিয়েছেন, ‘আজকে সবজি রোপণ করলে ফলন আসতে সময় লাগবে ৫০ দিন। তাও যদি নতুন করে বন্যা না হয়। আবহাওয়া অনুকুলে থাকে। কিন্তু আজকে রোপণের জন্য তো চারা তৈরি নেই। ফলে চারা রোপণ করে সবজি বাজারে আসতে সময় লাগবে দুই মাস।’
আগে চকরিয়া ও পেকুয়া থেকে উৎপাদিত সবজি কক্সবাজারেও সরবরাহ দেওয়া হত। এখন উত্তরবঙ্গের সবজি সেখানকার চাহিদা মেটাচ্ছে।
পেকুয়া শহীদ জিয়াউর রহমান উপকূলীয় কলেজের অধ্যাপক মোস্তফা জামান খারেচ জানালেন, ‘বন্যায় চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ৭৩ হাজার ৮৭৫টি কৃষক পরিবারকে উঠে দাঁড়াতে বীজ, চারা, কৃষি উপকরণসহ আর্থিক প্রণোদনা নিশ্চিত করতে না পারলে এই ধকল কাটানো কঠিন হবে।’





