চাঁদাবাজির জন্য বেতনভুক্ত কর্মচারী!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
চট্টগ্রামের আমানবাজার এলাকার ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ পারভেজ। তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল একটি সন্ত্রাসী চক্র। সাড়া না দেওয়ায় চাঁদার পরিমাণ বাড়িয়ে ২০ লাখ করা হয়। সময় বেঁধে দিয়ে হুমকি দেওয়া হয়, চাঁদা না দিলে ১০০ পুলিশ পাহারা দিয়েও তার প্রাণ রক্ষা করতে পারবে না।
হুমকি দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা জানায়, সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের বেতনভুক্ত কর্মচারী তারা। তাদের মাসিক বেতন ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানালেন, সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও রায়হানের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করতেন তারা। হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের মাধ্যমে শনাক্ত করে সন্ত্রাসী চক্রের ৭ সদস্যকে পুলিশ হাটহাজারী উপজেলা ও নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ, দেশে পলাতক রায়হান, আবার কখনো কারাবন্দি ডেভিড ইমনের নামে চাঁদাবাজি করলেও এর বেশিরভাগই তাদের অজ্ঞাতসারে করছিল ওই সন্ত্রাসী চক্রটি। যদিও পুরো চক্রটি ডেভিড ইমনের বেতনভুক্ত চাঁদাবাজ।
তারা সাতজন হলেন, কামরুল হাসান সাগর (২৫), মোহাম্মদ রিকু (২৫), তরিকুল ইসলাম রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ মাসুম (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মোহাম্মদ মানিক (৪০) এবং নুরুল আলম (৪০)। তাদের বাড়ি হাটহাজারী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।
প্রত্যেকেই ডাকাতি-চাঁদাবাজি ও অস্ত্র আইনের একাধিক মামলার আসামি।
গত ২৬ জুলাই হাটহাজারীর বড়দিঘীর পাড়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদার জন্য ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে গুলির ঘটনা ঘটে।
গত ১০ আগস্ট ৫০ লাখ টাকা চাঁদার জন্য নগরীর পাঁচলাইশ থানার হামজারবাগ এলাকায় এক প্রবাসীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ করা হয়।
৩ সেপ্টেম্বর নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার মোজাফফর নগরের বাসিন্দা গাড়ি ব্যবসায়ী মাকসুদ রহমানের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। না দিলে তার ছেলেকে তুলে নিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার সন্ত্রাসী চক্রটির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে জানালেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ।
তিনি বললেন, ‘জসিম উদ্দিনের বাড়িতে গুলিবর্ষণ ডেভিড ইমনের নির্দেশে হয়েছিল। এরপর ইমন গ্রেপ্তার হয়। তিন-চার দিন আগে ইমনের নামে জসিমের কাছে আবারও আগের দাবি করা চাঁদা চাওয়া হয়। জসিম, ডাক্তার পারভেজ, মাকসুদ রহমানের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে একই বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে। গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে সেই মেসেজগুলোসহ মোবাইল সেট আমরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।’
‘ডেভিড ইমন রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এদের নাম বলেছিল। তাদের মাসে কাউকে ১০ হাজার, কাউকে ১৫ হাজার টাকা করে বেতন দিত ইমন। কিন্তু ইমন জেলে যাওয়ার পর তার অজ্ঞাতে তারা একটি স্বতন্ত্র চাঁদাবাজ চক্র তৈরি করে। সাজ্জাদ এবং রায়হানও এ চক্রের কথা জানত না বলে তারা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে। যদিও আমরা তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি।’
এসপি মাসুদ আলম আরও বললেন, গ্রেপ্তার ৭ জনের মোবাইল ফোন ও বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরগুলোর মেসেজ যাচাই করে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। এ চাঁদাবাজ চক্রের চট্টগ্রাম জুড়ে অনেক ইনফরমার আছেন। তারা বিত্তবান বা ধনাঢ্য ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন। এমনকি তাদের ছেলেমেয়েরা কখন স্কুলে যায় এবং কখন ফিরে আসে— সেই তথ্যও তাদের কাছে থাকে। এসব তথ্য ব্যবহার করে তারা ভুক্তভোগীদের মনে প্রচণ্ড ভীতির সৃষ্টি করে। অনেকে নিজেদের ও পরিবারের জীবনের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে নীরবে চাঁদা দিতে বাধ্য হন।
‘এখানে শাকিল ও সাগর তথ্য সংগ্রহ, চাঁদা দাবি ও সরাসরি অ্যাকশন অর্থাৎ গুলি করার কাজ করত। অন্যদের বিভিন্ন দায়িত্ব ভাগ করা ছিল। তাদের রিমান্ডে নিয়ে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ করলে আরও তথ্য পাওয়া যাবে’— যোগ করেন এসপি মাসুদ।





