সুপারিশ বাস্তবায়ন নেই, পাহাড়ধসে মৃত্যু প্রতিবছর

প্রতি বর্ষা মৌসুমে বৃহত্তর চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দেয়। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১২৭ জন মারা যাওয়ার পর ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা এড়াতে বসতি উচ্ছেদ, পুনর্বাসনসহ ৩৬ দফা সুপারিশ দিয়েছিল বিশেষজ্ঞ কমিটি। এ ছাড়া ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ১৭০ মৃত্যুর পর ৩৫ দফা সুপারিশ ছিল। এগুলোর বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়নি।
ফলে প্রতিবছর পাহাড়ে বেড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির সংখ্যা। আর বাড়ছে দুর্ঘটনাও। চলমান ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে চট্টগ্রামে ৪ জন, কক্সবাজারে ১৮ জন ও বান্দরবানে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি পাহাড়ে অবৈধ ঝুঁকিপূর্ণ বসতি নিরুৎসাহিত করা যেত, তাহলে এই মৃত্যু এড়ানো সম্ভব ছিল।
পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতির হালনাগাদ তথ্য নেই চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন কিংবা পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে। ছয় বছর আগে ২০২০ সালে চট্টগ্রামে ৬ হাজার ৫৫৮ পরিবারের তালিকা করা হয়েছিল। এরপর আর অবৈধ বসতির তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি। তবে গত বছর বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ে অতিরিক্ত আরও ৯১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ বসতির তালিকা পাঠানো হয়।
মূল সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে প্রতিবছর বর্ষা এলে ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মনোযোগী হয় প্রশাসন। এ জন্য মাইকিং করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। তবে প্রশাসনের এসব নির্দেশনা বাসিন্দারা কানে তোলেন না। ফলে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছেই।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বুধবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত সভায় বিষয়টি স্বীকার করেছেন। ডিসি বললেন, ‘আমরা বারবার সরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছি। আশ্রয়কেন্দ্রও খুলেছি। কিন্তু তাদের কেউ কেউ ঘর ছেড়ে যায়নি। দুর্ঘটনায় চারজন মারা গেছে।’
সুপারিশ বাস্তবায়ন না করা, স্থায়ী উচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত না নেওয়া এবং গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনার কারণে ২৬টি পাহাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বেড়ে চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এমনকি বিদ্যুৎ পানি, গ্যাস, রাস্তাঘাট ও শৌচাগার নির্মাণসহ নানা সুযোগ-সুবিধার আওতায় এনে পাহাড়ে বসতি বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হয়। তাই দিন দিন এই সংখ্যা বাড়ছে। প্রতিবছর পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত হয়।
লোক-দেখানো দু-একটি অভিযান করার পর তা বন্ধ থাকে। ফলে নতুন করে আবার সেবা সংযোগ ও বসতি দুই বাড়তে থাকে। সরকারি হিসাবে সাড়ে সাত হাজারের মতো পরিবার ঝুঁকিতে বসবাস করে বলা হচ্ছে, বাস্তবে তা আরও বেশি। অথচ ২০১৪ সালে ১১টি পাহাড়ে মাত্র ৬৬৬টি পরিবার বসবাস করত। এখন তা কয়েকগুণ বেড়েছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের অধ্যাপক অলক পাল বলেছেন, ‘কমিটি যেসব সুপারিশ করেছিল তা বাস্তবায়ন করা দরকার। এ ছাড়া পাহাড় কাটা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। পাহাড় কেটে বিভিন্ন এলাকায় স্থাপনা গড়ে তোলার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ও পর্যবেক্ষণ জরুরি।’
পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আকবরশাহ থানা এলাকার ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিলসংলগ্ন পাহাড়ে সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৪ হাজার পরিবার বসবাস করে। ২০২২ সালের ১ নম্বর ঝিলে পাহাড়ধসে মারা গিয়েছিলেন একই পরিবারের দুজন। একই সময়ে বিজয়নগর এলাকায় আরও দুজন নিহত হয়। এ ছাড়া ২০১২ সালে আকবরশাহ মাজার এলাকায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। ২০১১ সালে বাটালি পাহাড় ও দেয়ালধসে মারা যায় ১৭ জন।





