রাউজানে যুবদল নেতা খুনে বড় সাজ্জাদের ‘রায়হান বাহিনী’

ছবি : সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগৃহীত
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে খুনের ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যে পাঁচজনকে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে, পুলিশ তাদের সবার পরিচয় শনাক্ত করেছে। পুলিশের ভাষ্য, বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর ক্যাডাররা মাসুদুলকে খুন করেছে।
শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে চট্টগ্রাম উত্তরের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫) গুলি করে খুন করা হয়। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন স্থানীয় রাজনীতিতে। বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়নে।
বাজারের সিসি ক্যামেরায় সংরক্ষিত হত্যাকাণ্ডের দৃশ্য যাচাই-বাছাই করে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বলেছেন, ‘অস্ত্র হাতে পাঁচজনকে দেখা গেছে। এর বেশি থাকতে পারে। তবে যে পাঁচজনকে দেখা গেছে, তাদের সবার পরিচয় আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ সম্ভব নয়। তবে তারা প্রত্যেকে রায়হান বাহিনীর দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের মধ্যে অবশ্য রায়হানকে দেখা যায়নি।’
হত্যার ঘটনাস্থল চৌমুহনী বাজারের আধা কিলোমিটারের মধ্যেই পুলিশের রাঙ্গুনিয়া সার্কেল কার্যালয়। ভিডিও দৃশ্যে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া পাঁচজনই ছিলেন সশস্ত্র। কালো মুখোশ পরা একজনের হাতে শটগান দেখা গেছে। তিনজনের হাতে পিস্তল এবং আরও একজনের হাতে শটগান ছিল।
ফেসবুকে আজ রবিবার সকাল থেকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, গুলিবর্ষণের মুখে মাসুদুল দৌড়ে একটি দোকানের সামনে এসে গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। তিন অস্ত্রধারী পেছন থেকে এসে লুটিয়ে পড়া মাসুদুলকে আবারও গুলি করে। এর ২০ সেকেন্ড পর মুখোশ পরা অস্ত্রধারী এসে আবার মাসুদুলকে গুলি করে দ্রুত চলে যায়। মৃত্যু নিশ্চিত করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে অস্ত্রধারীরা একটি অটোরিকশায় উঠে চলে যায়।
প্রকাশ্য অস্ত্রধারীদের মধ্যে চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করলেন রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম। তারা হলেন দিদার, ধামা ইলিয়াছ, আবছার ও ইউছুফ।
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানালেন, হত্যাকারীদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের একটি ব্যাকআপ টিমও ছিল বলে তাদের সন্দেহ। তারা দূরে অবস্থান করায় ভিডিওতে ধরা পড়েনি।
মাসুদুল টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে জানালেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন, ‘নিহত ব্যক্তি বালু উত্তোলনের ব্যবসা করতেন। রাজনীতিও করতেন। আমরা প্রাথমিক তদন্তে বালু ব্যবসার বিরোধে হত্যাকাণ্ড বলে জানতে পেরেছি। তবে রাজনৈতিক কোনো বিরোধের তথ্য পাইনি। আরও তদন্ত চলছে। লোকজন খুবই আতঙ্কগ্রস্ত। কেউই মুখ খুলছে না।’
নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানালেন, মাসুদুল রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। তাদের অভিযোগ, এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় মাসুদুলকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে খুন করা হয়েছে।
মাসুদুলকে যে স্টাইলে খুন করা হয়েছে, একইভাবে রাউজানে আরও হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৫ সালের ৭ জুলাই উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ঈশান ভট্টেরহাট বাজারে খুন হন উপজেলা যুবদল নেতা মুহাম্মদ সেলিম। বোরকা পরা দুই যুবকসহ চার-পাঁচজন অটোরিকশায় এসে সেলিমকে প্রকাশ্যে লোকজনের সামনে গুলি করে খুন করেন। এরপর অটোরিকশায় করে দ্রুত চলে যান।
গত ২৬ এপ্রিল কদলপুর ইউনিয়নের শমসেরপাড়ায় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন তালুকদারকে রাতের আঁধারে গুলি করে হত্যা করা হয়। রাউজানে নাসির হত্যার জেরে গত ৭ মে নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার রৌফাবাদ এলাকায় ২৪ বছরের যুবক মোহাম্মদ হাসান রাজুকে গুলি করে একই কায়দায় খুন করা হয়।
একই স্টাইলে প্রত্যেকটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর ক্যাডারদের সম্পৃক্ততা আছে বলে পুলিশের ভাষ্য।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই অশান্ত হয়ে ওঠে রাউজান। সর্বশেষ যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীসহ ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২০টিই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। নিহতদের মধ্যে ১৭ জন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী বলে গণমাধ্যমের তথ্য।





