ডিএনসিসির ‘অপারেশন ক্লিন হোমস’ কি পারবে স্বস্তি ফেরাতে?
- মশার ডেরায় ডিএনসিসি
- মাসজুড়ে চলবে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান

ছবিঃ আগামীর সময়
আকাশ যখন গোধূলির রঙে রাঙায়, ঠিক তখনই রাজধানীর অলিগলি আর ড্রেন থেকে বের হয়ে আসে এক অদৃশ্য ‘বাহিনী’। ঝাঁকে ঝাঁকে মশার গুনগুন শব্দে তখন অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষের কান। কয়েল পুড়িয়ে কিংবা মশারি টানিয়েও যেখানে নিস্তার মিলছে না, সেখানে নতুন করে আশা আর শঙ্কার দোলাচলে শুরু হলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মাসব্যাপী বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ক্লিন হোমস’। আজ শনিবার সকালে রাজধানীর মানিকদিতে ‘ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড আদর্শ বিদ্যানিকেতন’ প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় মাসব্যাপী এই কর্মসূচির। যার স্লোগান ‘অপারেশন ক্লিন হোম, স্বাস্থ্যকর জীবন’।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। সাড়ম্বরে উদ্বোধন হলেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই আয়োজন কি কেবলই আনুষ্ঠানিকতা, নাকি মিলবে দীর্ঘস্থায়ী মুক্তি?
‘অপারেশন ক্লিন হোমস, স্বাস্থ্যকর জীবন’ স্লোগানকে সামনে রেখে শুরু হওয়া এই অভিযানে ডিএনসিসি মূলত নাগরিকদের দ্বারে দ্বারে পৌঁছানোর পরিকল্পনা করেছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো: শফিকুল ইসলাম খানের কণ্ঠে শোনা গেল নাগরিক দায়বদ্ধতার সুর। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, সিটি করপোরেশন ড্রেন পরিষ্কার করবে ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তিগত আঙিনা বা ভবনের বেসমেন্টের দায়িত্ব নিতে হবে মালিককেই।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডিএনসিসি প্রশাসক মশক নিধনে কেবল সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদের নিজ নিজ আঙিনা পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। অভিযান প্রসঙ্গে বলেন, ‘আপনার বাসার পরিচ্ছন্নতা আপনাকেই করতে হবে। সিটি করপোরেশনের কর্মীরা তাদের কাজ করবে, কিন্তু আপনার বাসার ড্রেন বা সামনে ময়লা জমিয়ে রাখলে সেখানে মশার লার্ভা তৈরি হবেই।’
অনেক সময় আবহাওয়া বা যানবাহনের সীমাবদ্ধতার কারণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটতে পারে জানিয়ে শফিকুল ইসলাম খানের দাবি, তবে সেসব দ্রুত সমাধানে সিটি করপোরেশন সচেষ্ট রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রশাসক জানালেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি শনিবার যার যার এলাকা পরিষ্কার রাখার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা সফল করতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাও জরুরি।
তবে নগরবাসীর অভিযোগ ভিন্ন। রাজধানীর ধানমণ্ডি, মিরপুর, উত্তরা বা তেজগাঁওয়ের বাসিন্দাদের মতে, মশা কেবল বাসার ভেতরে নয়, বরং রাস্তার ধারের খোলা ড্রেন আর অপরিচ্ছন্ন ডাস্টবিন থেকেই বংশবিস্তার করছে বেশি।প্রতি বছর মশক নিধনের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও বাস্তবে রাজধানীর মশক পরিস্থিতি যেন ‘যেই লাউ সেই কদু’।ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী তুলে ধরলেন ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কর্মীদের প্রবেশের সীমাবদ্ধতার চিত্র। কিন্তু তথ্য বলছে, বেসমেন্ট আর ছাদবাগান ছাড়াও রাস্তার ধারের জমে থাকা নির্মাণ বর্জ্য বা আবর্জনার ভাগাড় মশার অভয়ারণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।সন্ধ্যা হতেই রাজধানীর দোকানপাট বা বাসা-বাড়িতে কয়েলের ধোঁয়ায় নিশ্বাস নেয়া দায় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে অভিভাবকরা পড়েছেন মহাবিপদে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় প্রতিটি জ্বর এখন আতঙ্কের নাম।ডিএনসিসি এবার ব্র্যাকের স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে ২১ দিনের এক নিবিড় কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। যেখানে ডেঙ্গুপ্রবণ ওয়ার্ডগুলোকে লাল তালিকাভুক্ত করে চালানো হবে লার্ভিসাইডিং ও ফগিং। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—সপ্তাহের এক শনিবার সচেতন হয়ে কি পুরো সপ্তাহের অবহেলা ঢাকা সম্ভব?বক্তারা নাগরিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিলেও, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে এখনো বড় ধরনের গাফিলতি রয়েছে, তা খোদ করপোরেশনের কর্তাদের কথাতেই স্পষ্ট। যানবাহনের অভাব বা আবহাওয়ার অজুহাতে যে বর্জ্য জমে থাকে, তা-ই শেষ পর্যন্ত মশার জন্মস্থানে পরিণত হয়।অভিযানটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করছে প্রচারের চেয়েও বেশি মাঠপর্যায়ের কাজের ওপর। কেবল নির্মাণাধীন ভবন বা ছাদ বাগানে জরিমানা করে মশার উপদ্রুপ কমানো সম্ভব নয়; বরং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং আধুনিক লার্ভিসাইডিং প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ।‘সুস্থ ঢাকা গড়তে ঘরে ঘরে ডিএনসিসি’—স্লোগানটি শুনতে যতটা শ্রুতিমধুর, রাজধানীর ড্রেনগুলোর উৎকট গন্ধ আর মশার গুনগুন গান তার চেয়েও অনেক বেশি বাস্তব। ডিএনসিসি প্রশাসক বেশ জোর দিয়েই বললেন, ‘আপনার বাসার পরিচ্ছন্নতা আপনাকেই করতে হবে।’ কথাটি মিথ্যে নয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—নাগরিক যদি নিজের ঘর ঝাড়ু দেয়, ড্রেন পরিষ্কার করে আর মশা তাড়ায়, তবে সিটি করপোরেশনের হাজার কোটি টাকার মশক নিধন বাজেট কি কেবল ফগিং মেশিনের তেল আর ফটো সেশনের পেছনেই ব্যয় হবে?প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বললেন, তারা মানুষের ড্রয়িংরুমে ঢুকতে পারেন না বলে মশা মরছে না। অথচ রাস্তার ধারের যে ড্রেনগুলো মশার ‘হেডকোয়ার্টার’ হয়ে আছে, সেগুলোর সংস্কার বা নিয়মিত পরিষ্কারের বালাই নেই। অভিযানে লার্ভিসাইডিং আর ফগিংয়ের কথা বলা হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নগরবাসীর অভিজ্ঞতা বলে—ফগিং মেশিনের ধোঁয়া মশা তাড়ানোর চেয়ে বেশি কাজে লাগে সিনেমার শ্যুটিংয়ের কুয়াশা তৈরিতে!উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা সম্মিলিত সচেতনতার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তবে নগরবাসীর দাবি—ফটো সেশন আর মাসব্যাপী ‘মিশন’-এর মঞ্চায়ন না করে ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করলেই মশার উপদ্রুপ কমবে অনেকটাই। আপাতত নতুন এই অভিযানের সাফল্য কেবল সংবাদপত্রের শিরোনামে সীমাবদ্ধ থাকে কি না, তা দেখার জন্য পরবর্তী ডেঙ্গু সিজন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।‘ক্লিন হোমস’ মিশন শেষে মশার গুঞ্জন কমে কি না, নাকি এটিও বিগত বছরগুলোর মতো কেবল একটি ‘উদ্বোধনী অনুষ্ঠান’ হয়েই রয়ে যায়, তা সময়ই বলে দেবে।
















