মৃণাল সেনের জন্মদিন আজ
একজন ঘিনুয়া এবং একজন সখিনা

মৃণাল সেন
ঘিনুয়া এবং সখিনা— দুই চরিত্র আমাদের দুই রকম অনুভূতির সৃষ্টি করে। একদিকে ‘ঘিনুয়া’ প্রতিবাদী চরিত্র, অন্যদিকে ‘সখিনা’ গ্রামের সহজ সরল এক নারী চরিত্র। মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ এবং ‘আমার ভুবন’ সিনেমায় এই দুই চরিত্র একেবারেই ভিন্ন ধরনের। তবে পরাবাস্তববাদী দর্শন মেলে এই দুই চরিত্রে।
প্রশ্ন জাগে, মৃণাল সেন কিভাবে এই দুই চরিত্রের মাঝে মনুষ্য জীবনের পরাবাস্তববাদী দর্শন মেলে ধরেছেন। এখানেই বোধকরি মৃণাল সেনের স্বকীয়তা। যিনি নিজেকে ভেঙেছেন প্রতিটি সিনেমায়। নিজেকে তিনি ভাঙতে ভালবাসেন। তাই তার সিনেমা এবং চরিত্রগুলো ভিন্নতার আবরণে উপস্থাপিত হয়েছে। দর্শকের মনে আজও দাগ কাটে ‘ঘিনুয়া’ ও ‘সখিনা’।
মৃগয়া সিনেমাটি ১৯৩০ সালের পটভূমিতে নির্মিত। উড়িষ্যার একটি ছোট্ট গ্রাম। যেখানে আদিবাসীদের বসবাস। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর নানান ষড়যন্ত্রে আদিবাসী ও অ-আদিবাসীদের মধ্যে নানান দ্বন্দ্ব তৈরি করা হয়। আর আদিবাসী যুবক ঘিনুয়া হয়ে উঠে প্রতিবাদী। বিশ্বজুড়ে আমরা যে প্রতিবাদী চরিত্রের মানুষকে দেখেছি, তাদের পরিণতি হয়েছে মৃত্যু। তাদের মেরে ফেলা হয়েছে। যেমন সূর্য সেনের মতো বিপ্লবী ও প্রতিবাদী চরিত্রগুলোকে ইংরেজরা হত্যা করেছে।
মৃগয়াতেও তাই ঘটেছে। মৃণাল সেনের প্রতিবাদী যে স্বত্তা, তা সিনেমাতেও তুলে ধরেছেন বিভিন্ন ভাবে। ঘিনুয়া আজও আমাদের সমাজে আছে। বিভিন্ন সময়ে আমরা তাকে দেখতে পাই। বুর্জোয়া শাসনের বিরুদ্ধে এক আদিবাসী যুবকের যে লড়াই, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার তা কিন্তু আজও বিশ্বময়।
মৃগয়া সিনেমাটি আজও দেখলে মনকে নাড়া দেয়। এই প্রসঙ্গে মৃণাল সেন নিজেই বলেছেন, ‘যেকোন সময়ে যেকোন জায়গায় ঘটতে পারে’। আর সদ্য সিনেমার জগতে আসা মিঠুনের অভিনয় দেখে কে বলবে, এটি তার প্রথম সিনেমা?
‘আমার ভুবন’ সিনেমায় মৃণাল সেনকে আবিষ্কার করা যায় আরেকভাবে। যেখানে শাশ্বত ও সুন্দর হয়ে উঠে এসেছে সখিনা চরিত্রটি। একজন সখিনার যে অনুভূতি আছে, চাওয়া-পাওয়া আছে, ভালোলাগা আছে— তা কি আমরা সচেতন ভাবে কখনো ভেবেছি?
এক মুসলমান সম্প্রদায়ের বধূ সখিনা। যার বিবাহ বিচ্ছদ হয়ে গেছে নূরের সঙ্গে। আবারও বিয়ে করেছে কৌশিককে। এখানেও সখিনার নীরব প্রতিবাদী স্বত্তা খুঁজে পাই। সাধারণত গ্রামীণ সমাজে তেমন দেখা যায় না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের একটি গ্রামে এমনটাই ঘটেছে।
আমার ভুবনে আমরা দেখতে পাই আগের স্বামী নূর বিদেশ চলে যাওয়ার পর আবারও ফিরে আসে গ্রামে। দেখা করতে যায় সখিনার সঙ্গে। দেখে সখিনার অভাব-অনটনের সংসার। হাত বাড়িয়ে দেয় সহায়তার। বিচ্ছেদের তিক্ততা ভুলে। এখানে মৃণাল সেন জীবনকে দেখিয়েছেন অন্যভাবে। সখিনা ও নূরের বিচ্ছেদ মুখ্য নয়। জীবনটাই মুখ্য। দুই স্বত্তার দুই মানুষের মেলবন্ধন। এখানে সখিনার চরিত্রে নন্দিতা দাশ অনবদ্য। নন্দিতাকে সখিনায় পরিণত করেছেন। নন্দিতার দৈহিক সৌন্দর্য, সারল্যকে সুনিপুণ ভাবে তৈরি করতে পেরেছেন। তাই নন্দিতাকে পুরো সিনেমায় শুধু সখিনাই মনে হয়েছে। আমার ভুবনে যে সখিনা হয়ে উঠে ভুবনমোহিনী।
সিনেমাটিতে জীবনের পরাবাস্তবতা নতুনভাবে তুলে ধরেছেন মৃণাল সেন। জীবন যে একেবারে ছক বেঁধে চলে না, ছক ভেঙ্গে নতুন আলোর পথে চলে- চলতে হয়। এটাই যেন আমার ভুবন সিনেমার মধ্য দিয়ে প্রতিভাত হয়েছে।
মৃণাল সেন এমনই এক মানুষ, যিনি কারোর দ্বারা প্রভাবিত নয়, নিজের স্বকীয়তায় এগিয়ে গেছেন। গল্প বাছাই, সিনেমা নির্মাণ কিংবা বাজেট— যা-ই বলি না কেন, এই বিষয়গুলো ভাবলেই যেন অন্য এক মৃণাল সেনকে খুঁজে পাই। যিনি আজও প্রতিবাদী চরিত্রের ভাস্কর্য হয়ে আছেন আমাদের মাঝে। মৃণাল সেনের জন্ম ১৯২৩ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের ফরিদপুরে। আজ তার ১০৩তম জন্ম বার্ষিকী। তার প্রতি রইলো আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।




