Agamir Somoy E-Paper
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আগামীর সময়
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • বিচিত্রা
  • চাকরি
  • ছবি
  • সাহিত্য
  • বিবিধ
  • ধর্ম
  • প্রবাস
  • ফ্যাক্টচেক
  • সোশ্যাল মিডিয়া
  • ধন্যবাদ
  • বিশেষ সংখ্যা
  • সর্বজনের গল্প
  • বিশেষ লেখা
EN
  • সর্বশেষ
  • জাতীয়
  • রাজনীতি
  • অর্থনীতি
  • চট্টগ্রাম
  • সারা দেশ
  • বিদেশ
  • খেলা
  • বিনোদন
  • লাইফস্টাইল
  • মতামত
  • ফিচার
  • ভিডিও
  • শিক্ষা
  • ক্লাব
  • ইপেপার
  • EN
লোড হচ্ছে…

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক : আবদুস সাত্তার মিয়াজী

সম্পাদক : মোস্তফা মামুন

আগামীর সময়
আমাদের সম্পর্কেযোগাযোগশর্তাবলিগোপনীয়তাআমরা

ইডিবি ট্রেড সেন্টার (লেভেল-৬ ও ৭), ৯৩ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কারওয়ানবাজার, ঢাকা-১২১৫

যোগাযোগ: ০৯৬৬৬ ৭৭১০১০

বিজ্ঞাপন: ০১৭৫৫ ৬৫১১৬৪

[email protected]

স্বত্ব © ২০২৬ | দৈনিক আগামীর সময়

আগামীর সময় প্রকৃতি পরিচয়

স্মরণে শ্রদ্ধায় দ্বিজেন শর্মা

আমাদের নিসর্গসাধনার অগ্রসেনানী

শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
শিমুল সালাহ্‌উদ্দিন
agamir somoy
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:০২
আমাদের নিসর্গসাধনার অগ্রসেনানী

দ্বিজেন শর্মা (২৯ মে ১৯২৯—১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের কাছে হয়ে ওঠে এক গভীর স্মৃতিকাতরতার, এক নীরব শ্রদ্ধার্ঘ্যের। ২০১৭ সালের এই দিনে, রাতের নিভৃত প্রহরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে, ৮৮ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলার প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা। তার মৃত্যুতে প্রকৃতি হারিয়েছিল তার পরম সখাকে, আর আমরা হারিয়েছিলাম এমন এক অভিভাবককে— যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন মাটিকে ভালোবাসতে, গাছকে জানতে, নদীকে বুঝতে এবং প্রকৃতির প্রতিটি অণুতে জীবনকে খুঁজে পেতে।

দ্বিজেন শর্মা ছিলেন এক আশ্চর্য দ্বৈততার অধিকারী অবিনশ্বর প্রাণ। তার চিন্তা, কর্ম ও জীবনযাপনে দুটি ধারা সদা সক্রিয় ছিল। একটি ধারায় ছিল বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ, মানুষ ও সমাজচিন্তা এবং মার্কসীয় সমাজতন্ত্র; অন্যটিতে ছিল আবেগ, নিসর্গপ্রেম ও শিশুসুলভ আত্মজিজ্ঞাসা। বিজ্ঞান, সমাজ ও রাজনীতি ব্যাখ্যায় তিনি যতটা বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তি-আশ্রয়ী ছিলেন, উদ্ভিদ, উদ্যান ও প্রকৃতি প্রসঙ্গে ততটাই ছিলেন আবেগপ্রবণ—যেখানে বোধ ও অনুভূতির সূক্ষ্মতাই পেতো গুরুত্ব। তিনি বলতেন শুধু যুক্তি মানুষকে রোবটে পরিণত করে; কিন্তু মানুষ রোবট নয়, তার আছে আবেগ, আছে হৃদয়।

দ্বিজেন শর্মার জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মে, মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, সেকালে শিমুলিয়া গ্রাম ও তার পারিপার্শ্বিক এলাকা ছিল বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্মে সজ্জিত এক অসামান্য পরিবেশে সমৃদ্ধ। সেই পরিবেশ মানুষের তৈরি ছিল না—তা ছিল প্রকৃতির অপরূপ নির্মাণ। পাথারিয়া পাহাড়ের অনিন্দ্য নিসর্গের কোলে বেড়ে ওঠা দ্বিজেন শর্মা শৈশবেই তার গন্তব্য নির্ধারণ করে ফেলেছিলেন। পাথারিয়ার ভূপ্রকৃতি একদা তার কৈশোর-তারুণ্যের চোখে যে দুর্বার স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিল, সেই স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল জীবনের অমিত মুহূর্ত পর্যন্ত।

দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে শিমুল সালাহ্উদ্দিন

তিনি অনেকবারই শিমুলিয়া গ্রাম, সংলগ্ন পাথারিয়া পাহাড়, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এবং হাকালুকি হাওরের সৌন্দর্যের কথা বলেছেন। যে পরিবেশে তিনি বাল্য-কৈশোর অতিবাহিত করেছেন, লেখাপড়া ও কর্মসূত্রে অবস্থান পরিবর্তিত হলেও তার মননে সদা জাগ্রত ছিল সেই জঙ্গল, ফুল, পাখি, প্রাণিসমৃদ্ধ পাহাড়, নিসর্গে আবৃত গ্রাম ও হাওর। তিনি স্মরণ করেছেন, ‘আমাদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে উত্তরে তাকালে দেখা যায় নিকড়ি নদী, মৌলবি সাহেবের মাজার, ধানখেত, দূরদিগন্তে খাসিয়া পাহাড়ের নীলাভ ঢেউ। মাজারের কাছেই ছিল কয়েকটি জারুলগাছ। প্রতি গ্রীষ্মে গাছগুলো বেগুনি রঙের ফুলে আচ্ছন্ন হতো, রঙিন মিনারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওই গাছগুলোর ঝরে পড়া ফুলে কবরভূমি ঢেকে যেত। জন্মভূমির এই অনুপম দৃশ্যপট আজও মনে পড়ে।’

তার কিশোর বয়সে দেখা প্রাকৃত, নিসর্গপণ্ডিত শোভাবুড়ো তাকে প্রথম জীববৈচিত্র্যের পাঠ শিখিয়েছিলেন। পাথারিয়া পাহাড়ের বিচিত্র বৃক্ষ, লতাগুল্মের পরিচিতিসহ শিকার পদ্ধতির জ্ঞান দিয়েছিলেন তিনি। শোভাবুড়োর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও জীবনের আদ্যন্ত ছিল সেই প্রকৃতির মধ্যে। ফলে জীববৈচিত্র্য, বৃক্ষ, লতাগুল্মের ধারণা ছিল তার সরল, প্রাকৃত। দ্বিজেন শর্মা শোভাবুড়োর স্মরণে একটি বার্তা দিয়েছেন আমাদের—প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা যে জ্ঞান অর্জন করি, তা মুদ্রিত অক্ষরের বিবরণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও টেকসই। কারণ ভালো না বাসলে তো কাউকেই জানা যায় না।
প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের পাঠশালায়, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন চার মাইল দূরের পিসি হাইস্কুলে। এরপর আসামের করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে। ১৯৪৭ সালে করিমগঞ্জ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫১ সালে ত্রিপুরা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। করিমগঞ্জ স্কুলে জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময় কাটিয়েছেন—চারপাশের প্রকৃতি ছিল অসাধারণ সুন্দর, অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জুটেছিল, শিক্ষকরাও ছিলেন বন্ধুসম।

১৯৫০ সালে কলকাতা সিটি কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হন। সেখানেই এক বন্ধুর প্রভাবে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়ে পাঠ্যবই ফেলে মার্কসীয় সাহিত্য নিয়ে মেতে ওঠেন। ১৯৫৪ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি পাশ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ দ্বারা গভীরভাবে প্ররোচিত ও প্রভাবিত হন। পরে তিনি ডারউইনের জন্মস্থান শ্রুব্যারি ও ডাউনগাঁ দেখে আসেন। তার ডারউইন মুগ্ধতার ফলেই রচিত হয় ‘সতীর্থ বলয়ে ডারউইন’, ‘ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’ এবং ‘বিগল যাত্রীর ভ্রমণ কথা’।

ব্র্যাক ব্যাংক এখন দ্বিজেন শর্মা পরিবেশ পদক প্রদান করে

দ্বিজেন শর্মা নিজেকে শিক্ষক ভাবতেই বেশি পছন্দ করতেন। যখনই তাকে বিভিন্ন বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়েছে, তিনি সেসব অগ্রাহ্য করে শুধু ‘অধ্যাপক’ শব্দটি লিখে দিতেন। ১৯৫৪ সালে তিনি বরিশালের বিএম কলেজে যোগ দেন। কীভাবে তিনি সিলেট থেকে বরিশাল গেলেন—এ গল্প তার মুখে অনেকবার শুনেছেন তার শিষ্যেরা। একদিন হঠাৎ পত্রিকার একটি বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হন, বরিশাল বিএম কলেজে শিক্ষক পদে লোক নিয়োগ করা হবে। মানচিত্র খুলে দেখেন সেটা সাগরপাড়ের একটি জেলা। তার ইচ্ছা, সেখান থেকে খুব সহজেই সাগর দেখা যাবে। কোনো কিছু চিন্তা না করেই চলে যান সেখানে। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু কিছুদিন পর ভুল ভাঙে, তার স্বপ্নের বঙ্গোপসাগর বরিশাল থেকে অনেক দূরে। ততদিনে কলেজ আর শিক্ষার্থীদের প্রতি মায়া জন্মেছে। ফেলে আসা যায় কি! থাকলেন অনেক দিন। সেখানেও গড়ে তুললেন বিচিত্র গাছপালার পরিকল্পিত এক উদ্যান।

১৯৬২ সালে ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষক থাকাকালে তৎকালীন জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য গ্রেফতার হন এবং তিন মাসের জন্য কারাবাসে থাকেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকার নটর ডেম কলেজে যোগ দেন এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। ওই সময় নটর ডেম কলেজ প্রাঙ্গণে তিনি ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন করে বেশকিছু গাছ লাগান, যার কিছু এখনো রয়েছে।

১৯৭৪ সালে দ্বিজেন শর্মা সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদক হিসেবে যোগ দিতে মস্কোয় যান। রাশিয়ায় থাকাকালে (১৯৭৪-১৯৯২) তিনি বিজ্ঞান, অর্থশাস্ত্র, সমাজবিদ্যা এবং অন্যান্য বিষয়ে ইংরেজিতে লেখা প্রায় ৪০টি বই বাংলায় অনুবাদ করেন। তার অনুবাদের সুবাদে রাশিয়ার সমৃদ্ধ শিশুসাহিত্য বাংলা ভাষাভাষীদের নাগালে চলে আসে। মস্কো থেকে তিনি বিলাতে বেড়াতে গিয়ে ডারউইনের জন্মস্থান মাউন্ট হাউস, শ্রুব্যারি, কিউ গার্ডেন, বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলো পর্যবেক্ষণ করেন। অবশ্য অনেক বছর পরে তিনি লন্ডনের হাইগেট সেমিটারিতে গিয়ে কার্ল মার্কসের সমাধিও দর্শন করেন।

২০১৬ সালে, চারুকলার প্রাণ প্রকৃতির উৎসবে, তিনি বরিশালের বিআইডব্লিউটিএ বাংলোয় এসেছিলেন শিশুদের গাছ চেনাতে।দ্বিজেন শর্মা ছাত্রাবস্থায়ই বাম সমাজব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নে যাওয়ার ব্যাপারে তার আগ্রহ ছিল অনেকটা তীর্থে যাওয়ার মতোই। মস্কোতে বসবাসের দীর্ঘ সময় তার কাছে শুধু নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের বিষয় ছিল না; এ সময়টা অনুবাদকর্মের পাশাপাশি তিনি প্রয়োজনীয় পড়াশোনার মাধ্যমে নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিকে সংগঠিত, সংযত ও শানিত করেছেন। একই সঙ্গে মস্কোতে শর্মা-দম্পতির আবাস হয়ে ওঠে বাংলাদেশ থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদের জন্য পরম নির্ভরতার স্থান। রাজনৈতিক নেতাকর্মী, শিল্পী, লেখক, পর্যটক— যারাই মস্কোতে গিয়েছেন, তারা সবাই দ্বিজেন শর্মাকে পেয়েছেন বন্ধু-অভিভাবক হিসেবে।

সমাজতন্ত্রের দেশে তিনি গিয়েছিলেন মার্কসবাদ-লেনিনবাদের তাড়নায়। সোভিয়েত সমাজের অভ্যন্তরীণ সংকটগুলো তিনি অবলোকন করেন। ক্রমশ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার পতনের সাক্ষী হয়ে দ্বিজেন শর্মা আহত হয়েছেন, কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস তিনি হারাননি। একই সময় বিশ্বব্যাপী পরিবেশের বিপর্যয় তাকে পীড়িত করেছে, কিন্তু তিনি হতাশাগ্রস্ত হননি। তার বোধ ও চিন্তাধারা ক্রমশ সব সংকীর্ণতা পরিহার করে হয়ে ওঠে আরও গভীর, সংবেদনশীল ও উদার। ১৯৯৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেন। রাশিয়ায় অবস্থানকালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষক হিসেবে দ্বিজেন শর্মা তার দীর্ঘ দুই দশকের সোভিয়েত-বাসের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেন ‘সমাজতন্ত্রে বসবাস’ নামে এক অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ গ্রন্থে।

দ্বিজেন শর্মার ইকোলজি বা ইকোক্রিটিসিজম ভাবনা যে বৈশ্বিক, তা মূল্যায়নের জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরের তত্ত্ব না নিলেও চলে। যেমন ‘প্রকৃতিসমগ্র ১’-এ তিনি বলেছেন, ‘প্রকৃতি আমাদের স্রষ্টা ও বিনষ্টাও। আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসি, আবার একইসঙ্গে তার সঙ্গে লড়াইও করি। স্মর্তব্য প্রকৃতি তার সৃষ্টি ও ধ্বংসের স্বভাবধর্ম মানবসত্তায় সঞ্চারিত করেছে যা সামাল দিতে সে অক্ষম, কেননা মানুষ প্রকৃতির মতো অমিত শক্তিধর নয়। ফলত প্রকৃতির উপর তার জয়লাভের উচ্চাশা আজ হতাশায় পর্যবসিত এবং সে নিজেও বিপন্ন। এ থেকে উদ্ধারের প্রধান সম্বল তার প্রজ্ঞার পুঁজি, কিন্তু এখানে প্রধান প্রতিবন্ধ হয়ে আছে প্রলোভন। এটাও আরেকটি দ্বন্দ্ব।’

তার এই ভাবনা অন্য সকল আন্তর্জাতিক ভাবনার মতো অগ্রবর্তী। প্রসঙ্গত র্যাচেল কারসন রচিত ‘Silent Spring’ (১৯৬২)-এ বিবৃত ইকোলজির নতুন চিন্তা ব্যতীত দ্বিজেন শর্মার আগে কেউ এমন ভেবেছেন বলে আমাদের জানা নেই। সম্প্রতি ইকোলজি-ভাবনা যে অগ্রসর ও বিস্তৃত হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। তবে দ্বিজেন শর্মারও এ ধরনের প্রাসঙ্গিক চিন্তা ছিল, তা আমাদের খেয়াল রাখতে হয়।

এ কথার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, ইকোক্রিটিসিজম প্রকৃতি ও সাহিত্যের মধ্যে শুধু সীমাবদ্ধ নয়। বিজ্ঞান তো অবশ্যই। এ ছাড়াও আলোচনা প্রসারিত হয়ে আছে সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, নৃতত্ত্ব, সংস্কৃতি, শিল্প-কারখানা, উৎপাদন, স্থাপত্যসহ সকল জ্ঞানবিদ্যা এবং ভৌত জীবনাচরণে। অতএব পশ্চিমের কাঠামোবদ্ধ আলোচনার আগেই প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে দ্বিজেন শর্মা প্রমুখ জীবন, শিল্প এবং পরিবেশের বোঝাপড়া আত্মস্থ করেছেন। প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এ ছাড়াও প্রাচ্য মিথ-পুরাণ-দর্শনে প্রকৃতি চেতনার সমূহ উদাহরণ লক্ষণীয়। কারণ প্রাচ্যে প্রকৃতি ও জীবন পরস্পর, একাকার।

দ্বিজেন শর্মা শুধু প্রকৃতি, নিসর্গ নিয়ে কথা বলেননি, বলেছেন ইকোলজি প্রসঙ্গে। কারণ ‘পরিবেশ ব্যতিরেকে কোনো জীব বাঁচতে পারে না। প্রতিটি জীবের সঙ্গে পরিবেশের অন্যান্য জীব এবং জড় উপাদানের অবিরাম মিথষ্ক্রিয়া ঘটে। জীবগোষ্ঠীর পারস্পরিক এবং পরিপার্শ্বের সঙ্গে জীবগোষ্ঠীর সম্পর্ক অধ্যয়নই হলো বাস্তুসংস্থান বা Ecology’। সুতরাং এককভাবে বিচার ও সমাধান কল্পনা করা হলেও পরিবেশের সুরক্ষা সম্ভব নয়। এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন আজীবন দ্বিজেন শর্মা। ফলে তিনি নিসর্গ ও পরিবেশ চর্চায় নিজেকে একাডেমিক পরিসরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

সভ্যতা, উন্নয়ন ও দখলের আগ্রাসনে প্রকৃতির বিনাশ অনেক আগে থেকেই শুরু। একইসঙ্গে মানুষের আদর্শ, বিশ্বাস, আচার পালনের প্রতিক্রিয়ায় এ নিসর্গ বিপন্নপ্রায়। এসব বিষয়ে এমনও পক্ষ আছে, যারা বলার চেষ্টা করে যে, প্রকৃতির ওপর মানুষের আধিপত্য ছাড়া কোনও সম্পর্ক নেই। মানবসমাজ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশে, লোভ-লালসা, আধিপত্যের বাসনায় প্রকৃতি ধ্বংসের কাজ চালাচ্ছে আদি কাল থেকে। ন্যূনতম প্রয়োজনেও শুধু সংহার আর সংহার। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, নিসর্গের সৌন্দর্যও শত্রুসম উপাদান হিসেবে কেউ কেউ গণ্য করে। যেখানে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, বিশ্বাস, চর্চাও ক্রিয়াশীল। এই সৌন্দর্যচর্চার বিরোধিতার প্রসঙ্গ আমরা সাধারণত আমলে নিতে চাই না। অতএব মানুষ বনাম প্রকৃতি-পরিবেশ প্রায় বিপরীত অবস্থানে মুখোমুখি। এ সংকটাবস্থায় পরিবেশ সংরক্ষণে অনেকেই এগিয়ে এসেছেন; তবে কোনও উপায় বের হচ্ছে না।

দ্বিজেন শর্মা স্পষ্ট করেই বলেছেন, জীবনের জন্য তিনটি সুখের কথা—রৌদ্র, ব্যাপ্তিস্থান ও শ্যামলিমা। কিন্তু এ তিনটির মধ্যে আর অবশেষ কতটুকু রয়েছে। এর বিপরীতে তার দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে বিশ্বায়নের চাপ। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ আজ প্রকৃতির একটি বিকল্প শক্তি হয়ে উঠেছে। আপন নিরাপত্তা ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য মানুষ প্রকৃতির রাজ্যকে ঢেলে সাজাতে চাইছে, তাতে ভেঙে পড়ছে গোটা গ্রহের বাস্তুসংস্থান এবং তারই ফল হলো বিশ্ব উষ্ণায়ন, বায়ু ও পানিদূষণ, চির তুষারগলন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ওজোনস্তর ক্ষয়, বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য হ্রাস ইত্যাকার নানা বিপর্যয়ী আলামত। বনায়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু এককভাবে তাতে কোনো সমাধান নিহিত নেই।’

তিনি এ বিষয়ে এঙ্গেলসের একটি কথা উল্লেখ করেছেন ‘প্রকৃতির ওপর মানুষের বিজয়লাভ নিয়ে অত্যাশা বাঞ্ছনীয় নয়। এই ধরনের প্রতিটি বিজয়ের পর প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয়। এসব বিজয় শুরুতে ইপ্সিত ফল ফলালেও শেষে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাতে প্রায়শই প্রথমটি ঢাকা পড়ে যায়।’

তার পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত পরিষ্কার। মানুষ সজ্ঞানে, অজ্ঞানে প্রকৃতির শৃঙ্খল ভেঙে ফেলেছে। ফলে এ জীববৈচিত্র্য থেকে অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণি হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। মূলত কোন্ প্রজাতি কখন মানবজাতির উপকারে আসতে পারে, তা কেউ জানে না। এ জন্য বিশ্বের অনেক দেশে বীজব্যাংক তৈরি হয়েছে। দ্বিজেন শর্মার কথা, আলোচনা থেকে জেনেছি, তিনি দেশের নানা স্থানে উদ্যান ও বাগান তৈরি করতে চেয়েছেন, তবে পারেননি। এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানে পরিসর যত ছোটোই হোক, তা বাস্তবায়নে তৎপর থেকেছেন। এর প্রমাণ রয়েছে শিমুলিয়া, বিএম কলেজ, বরিশাল ও ঢাকায়। তিনি অরণ্য, গ্রাম, রাজপথ, শহর, মহানগর, নগরপথসহ বিভিন্ন স্থানকে বিন্যস্ত করতে চেয়েছেন বৃক্ষ ও লতাগুল্মে। এরূপ বিন্যাসে কিছু কাজও করেছেন। তার কথা—‘উদ্যানশিল্প যে স্থাপত্যের অনুষঙ্গ এবং তদনুরূপ গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল এই বোধ এখনো আমাদের দেশে স্বীকৃতি পায়নি, নইলে আমাদের পার্কগুলোতে এমন নৈরাজ্য বা অবহেলা প্রশ্রয় পেত না।’

দ্বিজেন শর্মা- ছবি: নাসির আলী মামুন

পেশাগত জীবনের শুরুতেই ঢাকা শহরের পথতরুর পরিচিত চিহ্নিতকরণ, বিবরণ লেখা ইত্যাদি কাজ করেছেন সেই ১৯৬৪ সালে। এ-পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত ও বাংলা একাডেমিতে জমা দেন ১৯৬৫ সালে। তবে ‘শ্যামলী নিসর্গ’ শিরোনামের বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৮০ সালে। এমন একটি অসামান্য গ্রন্থের পর ঢাকা মহানগরের বৃক্ষ পরিচিতি নিয়ে আর কোনও বই আমাদের চোখে পড়েনি। শ্যামলী নিসর্গের রচনাকাল ১৯৬২-৬৫। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানাবিধ কারণে গ্রন্থটি দীর্ঘ সময় প্রকাশিত হতে পারেনি। দ্বিতীয় মুদ্রণ প্রকাশিত হয় ১৯৯৭ সালে। গ্রন্থটি ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বৃক্ষানুরাগীসহ অসংখ্য নিবিষ্ট পাঠকের কাছে। গ্রন্থে সংযুক্ত ২৫ পৃষ্ঠার দীর্ঘ ভূমিকা আমাদের উদ্ভিদ-ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান দলিল।

বলতে দ্বিধা নেই, শ্যামলী নিসর্গ অদ্যাবধি বৃক্ষানুরাগীদের প্রকৃতি সমীক্ষা ও লেখালেখিতে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতিটি বৃক্ষের আলোচনায় তিনি তুলে ধরেছেন প্রাসঙ্গিক কবিতার উদ্ধৃতি, গাছপালার আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিগত অনুভূতি ও উপযোগিতা। বৃক্ষ পরিচিতিমূলক গ্রন্থের ক্ষেত্রে এটি একটি নতুন ধারা যার প্রবর্তক স্বয়ং দ্বিজেন শর্মা।

‘নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’ তার সুদীর্ঘ সময়ের উদ্ভিদ ও পরিবেশ চর্চার অনবদ্য দলিল। অনুসন্ধানী পাঠক কিংবা নবীন নিসর্গীদের জন্য আকরগ্রন্থসম। আলোচ্য গ্রন্থে তিনি আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে সম্পূর্ণ কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। বন উজাড় ও পরিবেশ ধ্বংসের মতো অপকর্মের প্রতিবাদ আছে অনেক লেখায়। তুলে এনেছেন আদিবাসী অসহায় মানুষের মুখ, নীড়হারা পাখি কিংবা গৃহহারা প্রাণিদের গল্পগাথা। পরিশিষ্টাংশে আছে শ্যামলী রমনার ইতিহাস যা দীর্ঘদিন ধরেই আমাদের অজানা ছিল।

দ্বিজেন শর্মা শুধু ডারউইনবাদে বিশ্বাসীই নন, ডারউইনের ভাবশিষ্যও। এই অনুরক্তি থেকেই বিবর্তনবাদ ও অন্যান্য আবিষ্কারে তার আগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রশংসনীয়। ডারউইনকে আমাদের কাছে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি তিনটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যার অন্যতম ‘চার্লস ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’। এটি মূলত ডারউইনের বিখ্যাত ‘Origin of Species’ গ্রন্থের সংক্ষিপ্তসার। বিশাল কলেবরের মূলগ্রন্থ থেকে চমৎকারভাবে প্রকৃত বিষয় ছেঁকে আনা জটিল ও দুঃসাধ্য। ‘ডারউইন: বিগল-যাত্রীর ভ্রমণকথা’ গ্রন্থত্রয়ীর মধ্যে অতি প্রয়োজনীয় একটি বই। এখানেও অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি। ৪৮৯ পৃষ্ঠার বৃহৎ কলেবরের ‘Voyage of the Beagle’ গ্রন্থের সারসংক্ষেপ তুলে এনেছেন মাত্র ৮৮ পৃষ্ঠায়।

তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—শ্যামলী নিসর্গ (১৯৮০), সপুষ্পক উদ্ভিদের শ্রেণীবিন্যাস (১৯৮০), ফুলগুলি যেন কথা (১৯৮৮), ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি (১৯৯৭), সমাজতন্ত্রে বসবাস (১৯৯৯), নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা (২০০০), জীবনের শেষ নেই (১৯৮০), সতীর্থ বলয়ে ডারউইন (১৯৭৪), বাংলার বৃক্ষ (২০০১), বিজ্ঞান ও শিক্ষা: দায়বদ্ধতার নিরিখ (২০০৩), কিশোর সমগ্র (২০০৮), আমার একাত্তর ও অন্যান্য (২০০৮), গহন কোন বনের ধারে (১৯৯৪) ইত্যাদি। এছাড়াও বাংলাদেশের সমাজ, শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবেশ ও উদ্ভিদ নিয়ে তিনি প্রায় ৩০টি বই লিখেছেন।

দ্বিজেন শর্মা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের উদ্ভিদ-চেতনা দ্বারা প্রভাবিত এবং বেঙ্গল রেনেসাঁস দ্বারা অনুপ্রাণিত। সম্ভবত এ-কারণেই তার চরিত্রে ও কর্মকাণ্ডে বহুমাত্রিকতা লক্ষ করা যায়। তিনি একাধারে ছিলেন উদ্ভিদ সংগ্রাহক, উদ্যান নির্মাতা, প্রকৃতি সংরক্ষক, পরিবেশ সংগ্রামী, প্রকৃতিবিদ, শিক্ষক, লেখক, পর্যটক ও অনুবাদক।

রমনা উদ্যানে দ্বিজেন শর্মা

‘উদ্ভিদ উদ্যান ঐতিহ্য’ শীর্ষক প্রবন্ধে দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন—‘তরুনির্ভরতা নিয়তিকল্প বলেই হয়তো প্রকৃতির এই মৌলবস্তুটি আমাদের কাছে এতটা মুগ্ধকর। সভ্যতার অগ্রগতি মানুষের স্বাধীনতা বহুদূর প্রসারিত করলেও প্রকৃতির আওতা থেকে পূর্ণ মুক্তির দিন আজো অস্পষ্ট। আমাদের খাদ্যবস্তুর এক ও অনন্য জোগানদার এই তরুরাজ্য। অধুনাতম বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এ-পথে বিকল্পের সন্ধান দিতে পারেনি। এই নির্ভরতার শেষ কবে কেউ জানে না।... রৌদ্রের তাপ, বাত্যার প্রহার, ক্ষুধার দাহ থেকে অব্যাহতির জন্য সভ্যতার এ প্রোজ্জ্বল মধ্যাহ্নেও আমরা তরুমুখাপেক্ষী। লাখ লাখ বছরের এই সংযোগ কখনো সখ্যে, কখনো শত্রুতায় আমাদের জৈবিক উত্তরাধিকারের গভীরে যে মূল বিস্তার করেছে, অবচেতন থেকে চেতনে, এষণা থেকে ঐতিহ্যে তা প্রোথিত।’

ওই প্রবন্ধেই অন্যত্র লিখেছেন—‘প্রকৃতি ও মানুষ এদেশবাসীর ধারণায় একই প্রাণলীলার আধার এবং সেজন্য এক ও অবিচ্ছিন্ন। জগতের সীমাহীন বৈচিত্র্যে তাঁরা অনুসন্ধান করেছেন চৈতন্যের ঐক্যসূত্র। প্রতিটি অস্তিত্ব এখানে চেতনার বিপুল ত্বরণে স্পন্দিত। সুন্দর তাই শুধু ইন্দ্রিয়ধৃত বাস্তব নয়, আত্মধৃত পরম সত্যও। জল-স্থল-নিখিলের এক সার্বিক ঐক্যবোধই এদেশীয় দর্শনচিন্তার ভিত্তি। বৃক্ষ-লতা-তৃণ এখানে তরুমাত্র নয়, “ধরণীর ধ্যানমন্ত্রের ধ্বনি, প্রাণের আনন্দরূপ তাদের শাখায় শাখায়, প্রথম প্রীতির বন্ধনবিহীন প্রকাশ এর ফুলে ফুলে”।’

আমাদের দেশে তিনিই প্রথম রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষবিষয়ক পঙ্ক্তিগুলো ব্যাপক আঙ্গিকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে সমর্থ হন। কাজটি নিঃসন্দেহে শ্রম ও সময়সাধ্য। একাগ্রতা ও নিষ্ঠা ছাড়া এমন কাজ অসম্ভব।

বাগান করার শখ ছিল তার। কিন্তু এর মধ্যে এক ধরনের এক্সপেরিমেন্টও ছিল। ছিল এক ধরনের হাহাকার। শৈশবে দেখা পাথারিয়া পাহাড়ের নান্দনিক বিন্যাস অনুক্ষণ তার সঙ্গী ছিল। পৃথিবীর কোথাও তিনি এমন সাদৃশ্য খুঁজে পাননি। উদ্যান রচনায় এমন হাহাকার খোদ মোঘল সম্রাটদেরই ছিল। ‘নিসর্গ নির্মাণ ও নান্দনিক ভাবনা’ গ্রন্থে দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন, ‘এজন্যই হিন্দুস্থানের অঢেল সোনারুপায় সম্রাট বাবর তৃপ্ত হননি, অনুক্ষণ মনে পড়ত কাবুলে তার বাগান কখন বসন্তে লাল-হলুদ অর্গানে ঢেকে গেছে, ডালিম দুলছে ডালে ডালে। তিনি এর তুলনা খুঁজে পাননি পৃথিবীর আর কোন দেশে।’

কিন্তু এক্ষেত্রে নিজের অতৃপ্তিও কম নয়। দেবী শর্মার লেখায় তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-‘... সুতরাং আমাদের বাড়ি এলো হাজার রকমের গাছপালা; কিন্তু সমস্যা দেখা দিল অন্যত্র। গাছগুলো থিতু হওয়ার সুযোগ পেত না—আজ এখানে তো কাল ওখানে। তুঘলকি কাণ্ড।... আসলে দ্বিজেন শর্মা বড় হয়েছেন পাহাড়ি এলাকায়, ওখানকার নিসর্গ তার অস্থিমজ্জায়, তেমন একটি শোভা সৃষ্টি করতে চাইতেন আমাদের সমতল বাংলায়, সেটা হয়ে উঠতো না, যে জন্য এই উচাটন।’

তিনি প্রথম বাগান করেছেন বাড়িতে। অগ্রজের সবজি আর ফুলের বাগান করার শখ ছিল। তবে সত্যিকারে প্রথম বাগান ১৯৫৮ সালে বরিশাল বিএম কলেজে। বর্তমানে অল্প কয়েকটি বড় গাছ ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই। তার ইনফরমাল বাগান তৈরির হাতেখড়ি নটর ডেম কলেজে ফাদার ভেনাসের কাছে। এখনো বাগানটি বেশ ভালোই আছে। সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজেও বাগান করেছেন। কিন্তু তা এখন লুপ্তপ্রায়। এসব ছাড়াও মহানগর পাঠাগার, রমনা পার্ক, শিশু একাডেমি, চারুকলা অনুষদ ও বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিপন্ন ও দুর্লভ প্রজাতির অসংখ্য গাছ লাগিয়েছেন। জীবনের সর্বশেষ গাছগুলো লাগিয়েছেন বাংলা একাডেমিতে।

দ্বিজেন শর্মা। ছবি: নাসির আলী মামুন

তিনি ‘তরুপল্লব’ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের সভাপতি ও আয়োজক হিসেবে তিনি তরুণ গবেষক ও স্বেচ্ছাসেবীদের প্রায়ই রমনা পার্ক, বলধা গার্ডেন ও বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়ে যেতেন। গাছপালা ও বৃক্ষরাজির সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতেন। শেখাতেন দেশি ফুলের জাতপাত ও রকমফের। শেখাতেন প্রকৃতিকে ভালোবাসতে ও শ্রদ্ধা জানাতে।

নির্মোহ, নিরহংকার জীবনযাপন করতেন তিনি। জাগতিক কোনো জটিলতা তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। অল্পতেই তুষ্ট থাকা এই মানুষটি আমাদের দেখিয়েছেন এভাবেও মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা যায়। চাওয়া-পাওয়ার কোনো হিসাব কখনো করতে দেখিনি। ছিল না কোনো হাহাকার। উদার এবং মানবিক হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। ছোট-বড় সবার সঙ্গেই সমভাবে মিশতে পারতেন। সম্ভাবনাময় তরুণদের লেখা পড়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতেন। তাদের উৎসাহ দিতেন। তার মতো এতো উদারতা নিয়ে অনুজপ্রতিমদের শেখাতে কাউকে দেখিনি। তরুণদের ভেতর আলোর কণা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। জীবনে অসংখ্য অনুসারী তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন নিজেই একেকটি প্রতিষ্ঠান। এক্ষেত্রে ড. আইনুন নিশাত এবং ড. রেজা খান, মোকাররম হোসেন, সৌরভ মাহমুদের নাম করা যায়। এনএসএসবির প্রতিষ্ঠাতা নটরডেম কলেজের শিক্ষক মিজানুর রহমান অসংখ্য তরুণের চোখে প্রকৃতিপ্রেমের আলো জ্বালাতে সমর্থ হয়েছেন। ছাত্রদের মধ্যে মুকিত মজুমদার বাবু প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের কাছে প্রকৃতি প্রেমের বারতা পৌঁছে দিতে সমর্থ হয়েছেন।

মননশীল লেখালেখির জন্য তিনি ১৯৮৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও ২০০২ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী শিশু সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৫ সালে তাকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দ্বিজেন শর্মার কাছে আনন্দের বিষয় ছিল বৃক্ষ, ফুল, বৃষ্টি, ভোরের আলো, তার প্রিয় কুকুর টম ও নাতি-নাতনি। তিনি ছিলেন ভোগবাদ ও বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী। লোভ ও লালসার ঊর্ধ্বে সহজ-সরল, আনন্দময় অথচ কর্মঠ ও বুদ্ধিদীপ্ত জীবনই ছিল তার আরাধ্য।

একটা জীবন দিয়ে দ্বিজেন শর্মা আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন, আমরা প্রকৃতিকে ভালোবাসব, জানব, রক্ষা করব; কারণ ভালো না বাসলে তো কাউকেই জানা যায় না, আর সেই জানাটুকুই আমাদের জীবনের অবলম্বন হয়ে থাকবে, সংসারের নড়বড়ে ভিতে আমাদের দিব্যি দাঁড় করিয়ে রাখবে এবং এ কথা বলার সাহস যোগাবে যে ‘এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি।’

দ্বিজেন শর্মা
    আগামীর সময় ইপেপার
    শেয়ার করুন:
    ডিজেল ৬ ডলার ছাড়িয়ে বিপাকে মার্কিন পরিবার

    ডিজেল ৬ ডলার ছাড়িয়ে বিপাকে মার্কিন পরিবার

    ডাকসুর ৩ কাণ্ড তদন্তে ঢাবির ৩ কমিটি

    ডাকসুর ৩ কাণ্ড তদন্তে ঢাবির ৩ কমিটি

    ইউক্রেন-রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প

    ইউক্রেন-রাশিয়া একে অপরের জ্বালানি স্থাপনায় আর হামলা চালাবে না: ট্রাম্প

    চাঁদের পিঠে আলোকপিণ্ড

    চাঁদের পিঠে আলোকপিণ্ড

    দুই বছর পর সচিব সভায় বসছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা, আসতে পারে যে নির্দেশ

    দুই বছর পর সচিব সভায় বসছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা, আসতে পারে যে নির্দেশ

    পল্লবীতে বস্তাবন্দির ভিডিও, চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার নজরুল

    পল্লবীতে বস্তাবন্দির ভিডিও, চট্টগ্রাম থেকে উদ্ধার নজরুল

    তিন মাসে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৫ হাজার

    তিন মাসে কোটিপতি অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ৫ হাজার

    রিজভীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বৈঠক

    রিজভীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের বৈঠক

    ঢাবি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান মবের শিকার তাহসিনের

    ঢাবি ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রত্যাখ্যান মবের শিকার তাহসিনের

    প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি

    প্রাণের ডাকে ছোটেন রবি

    ইরানে এক সপ্তাহে ২ সুন্নি নেতাকে হত্যা

    ইরানে এক সপ্তাহে ২ সুন্নি নেতাকে হত্যা

    বিজয়ীদের হাতে বিশ্বকাপ মেগা কুইজের পুরস্কার

    বিজয়ীদের হাতে বিশ্বকাপ মেগা কুইজের পুরস্কার

    রাষ্ট্রপতিকে বরণে সেজেছে সিলেট, কড়া নিরাপত্তা

    রাষ্ট্রপতিকে বরণে সেজেছে সিলেট, কড়া নিরাপত্তা

    নতুন মেট্রোরেলের প্রকল্প উঠছে একনেকে, প্রশ্ন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে

    নতুন মেট্রোরেলের প্রকল্প উঠছে একনেকে, প্রশ্ন পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে

    চোখের ভিশন টেস্ট কেন  ও কখন করাবেন

    চোখের ভিশন টেস্ট কেন ও কখন করাবেন