স্মরণে শ্রদ্ধায় দ্বিজেন শর্মা
আমাদের নিসর্গসাধনার অগ্রসেনানী

দ্বিজেন শর্মা (২৯ মে ১৯২৯—১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
আজ ১৫ সেপ্টেম্বর। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের কাছে হয়ে ওঠে এক গভীর স্মৃতিকাতরতার, এক নীরব শ্রদ্ধার্ঘ্যের। ২০১৭ সালের এই দিনে, রাতের নিভৃত প্রহরে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে, ৮৮ বছর বয়সে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন বাংলার প্রকৃতিপুত্র দ্বিজেন শর্মা। তার মৃত্যুতে প্রকৃতি হারিয়েছিল তার পরম সখাকে, আর আমরা হারিয়েছিলাম এমন এক অভিভাবককে— যিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন মাটিকে ভালোবাসতে, গাছকে জানতে, নদীকে বুঝতে এবং প্রকৃতির প্রতিটি অণুতে জীবনকে খুঁজে পেতে।
দ্বিজেন শর্মা ছিলেন এক আশ্চর্য দ্বৈততার অধিকারী অবিনশ্বর প্রাণ। তার চিন্তা, কর্ম ও জীবনযাপনে দুটি ধারা সদা সক্রিয় ছিল। একটি ধারায় ছিল বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ, মানুষ ও সমাজচিন্তা এবং মার্কসীয় সমাজতন্ত্র; অন্যটিতে ছিল আবেগ, নিসর্গপ্রেম ও শিশুসুলভ আত্মজিজ্ঞাসা। বিজ্ঞান, সমাজ ও রাজনীতি ব্যাখ্যায় তিনি যতটা বিজ্ঞানমনস্ক ও যুক্তি-আশ্রয়ী ছিলেন, উদ্ভিদ, উদ্যান ও প্রকৃতি প্রসঙ্গে ততটাই ছিলেন আবেগপ্রবণ—যেখানে বোধ ও অনুভূতির সূক্ষ্মতাই পেতো গুরুত্ব। তিনি বলতেন শুধু যুক্তি মানুষকে রোবটে পরিণত করে; কিন্তু মানুষ রোবট নয়, তার আছে আবেগ, আছে হৃদয়।
দ্বিজেন শর্মার জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯ মে, মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, সেকালে শিমুলিয়া গ্রাম ও তার পারিপার্শ্বিক এলাকা ছিল বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্মে সজ্জিত এক অসামান্য পরিবেশে সমৃদ্ধ। সেই পরিবেশ মানুষের তৈরি ছিল না—তা ছিল প্রকৃতির অপরূপ নির্মাণ। পাথারিয়া পাহাড়ের অনিন্দ্য নিসর্গের কোলে বেড়ে ওঠা দ্বিজেন শর্মা শৈশবেই তার গন্তব্য নির্ধারণ করে ফেলেছিলেন। পাথারিয়ার ভূপ্রকৃতি একদা তার কৈশোর-তারুণ্যের চোখে যে দুর্বার স্বপ্ন এঁকে দিয়েছিল, সেই স্বপ্নই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল জীবনের অমিত মুহূর্ত পর্যন্ত।
তিনি অনেকবারই শিমুলিয়া গ্রাম, সংলগ্ন পাথারিয়া পাহাড়, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এবং হাকালুকি হাওরের সৌন্দর্যের কথা বলেছেন। যে পরিবেশে তিনি বাল্য-কৈশোর অতিবাহিত করেছেন, লেখাপড়া ও কর্মসূত্রে অবস্থান পরিবর্তিত হলেও তার মননে সদা জাগ্রত ছিল সেই জঙ্গল, ফুল, পাখি, প্রাণিসমৃদ্ধ পাহাড়, নিসর্গে আবৃত গ্রাম ও হাওর। তিনি স্মরণ করেছেন, ‘আমাদের বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে উত্তরে তাকালে দেখা যায় নিকড়ি নদী, মৌলবি সাহেবের মাজার, ধানখেত, দূরদিগন্তে খাসিয়া পাহাড়ের নীলাভ ঢেউ। মাজারের কাছেই ছিল কয়েকটি জারুলগাছ। প্রতি গ্রীষ্মে গাছগুলো বেগুনি রঙের ফুলে আচ্ছন্ন হতো, রঙিন মিনারের মতো দাঁড়িয়ে থাকা ওই গাছগুলোর ঝরে পড়া ফুলে কবরভূমি ঢেকে যেত। জন্মভূমির এই অনুপম দৃশ্যপট আজও মনে পড়ে।’
তার কিশোর বয়সে দেখা প্রাকৃত, নিসর্গপণ্ডিত শোভাবুড়ো তাকে প্রথম জীববৈচিত্র্যের পাঠ শিখিয়েছিলেন। পাথারিয়া পাহাড়ের বিচিত্র বৃক্ষ, লতাগুল্মের পরিচিতিসহ শিকার পদ্ধতির জ্ঞান দিয়েছিলেন তিনি। শোভাবুড়োর জন্ম, বেড়ে ওঠা ও জীবনের আদ্যন্ত ছিল সেই প্রকৃতির মধ্যে। ফলে জীববৈচিত্র্য, বৃক্ষ, লতাগুল্মের ধারণা ছিল তার সরল, প্রাকৃত। দ্বিজেন শর্মা শোভাবুড়োর স্মরণে একটি বার্তা দিয়েছেন আমাদের—প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা যে জ্ঞান অর্জন করি, তা মুদ্রিত অক্ষরের বিবরণের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও টেকসই। কারণ ভালো না বাসলে তো কাউকেই জানা যায় না।প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের পাঠশালায়, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন চার মাইল দূরের পিসি হাইস্কুলে। এরপর আসামের করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে। ১৯৪৭ সালে করিমগঞ্জ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫১ সালে ত্রিপুরা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। করিমগঞ্জ স্কুলে জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময় কাটিয়েছেন—চারপাশের প্রকৃতি ছিল অসাধারণ সুন্দর, অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জুটেছিল, শিক্ষকরাও ছিলেন বন্ধুসম।১৯৫০ সালে কলকাতা সিটি কলেজে বিএসসিতে ভর্তি হন। সেখানেই এক বন্ধুর প্রভাবে মার্কসবাদে আকৃষ্ট হয়ে পাঠ্যবই ফেলে মার্কসীয় সাহিত্য নিয়ে মেতে ওঠেন। ১৯৫৪ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে জীববিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি পাশ করেন। ছাত্রজীবনেই তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদ দ্বারা গভীরভাবে প্ররোচিত ও প্রভাবিত হন। পরে তিনি ডারউইনের জন্মস্থান শ্রুব্যারি ও ডাউনগাঁ দেখে আসেন। তার ডারউইন মুগ্ধতার ফলেই রচিত হয় ‘সতীর্থ বলয়ে ডারউইন’, ‘ডারউইন ও প্রজাতির উৎপত্তি’ এবং ‘বিগল যাত্রীর ভ্রমণ কথা’।









