প্রকৃতি প্রত্যয়
স্পাইডার লিলি

বাড়িতে ঢোকার মুখেই ডানদিকের একচিলতে ফাঁকা জায়গায় পুরো বর্ষায় ফুটেছিল। মাঝেমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি তুলে পাঠাই রোজা আসকারীকে। কাজিনের এই মেয়েটি নীলফামারী মেডিকেল কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছে। মেডিকেল সায়েন্সে প্রচণ্ড ইচ্ছের কারণে পড়লেও গাছপালা-তরুরাজির প্রতি ওর আগ্রহ আশান্বিত করে।
মামা, দেরি করো না তো, কী নাম তাড়াতাড়ি বলে ফেলো!
আরে তোর মায়ের নাম জড়িয়ে আছে।
কী বললে?
হ্যাঁ, সত্যি বলছি, দোলন থেকে দোলনচাঁপা। এই বাড়ির ডুপ্লেক্সের সিঁড়ির একদম নিচ বরাবর ফুলটির সঙ্গে জানিস তোর নানির নামটা জড়িয়ে আছে। বিস্ময় কাটে না আমাদের ডাক্তার রোজার। বাড়ির বাগানের একটু অচেনা ফুলগুলোর একটিও এতদিনে চিনতে পারেনি। অবশ্য খেয়াল করেনি। নানির নামের ফুলটির নাম স্পাইডার লিলি। মা-নানির ডাকনাম ফুলের নামে হলেও রোজার ডাকনামটি রাখাই যেত কোনো সাদা রঙের ফুল যূথী কিংবা কেয়া নামে। তাহলে তিনটি প্রজন্মের ডাকনাম রাখাটা সার্থক হতো। অবশ্য আদর করে ওর সহোদর অর্ক ‘অনুভা’ বলে ডাকে, যার অর্থ বিদ্যুৎ, দীপ্তি বা বজ্র। ওদের বাড়িতেই দেখা পেয়েছিলাম দোলনচাঁপার সঙ্গে সঙ্গে স্পাইডার লিলি ফুলটিরও।
‘ভুল ক’রে যদি ভালোবেসে থাকি ক্ষমিও সে অপরাধ’— কাজী নজরুল ইসলামের গানটির কাছেই ফিরে যেতে মন চায়। ভুল করে কত কিছুই না চিনে থাকি। ভুলটা কখনো ভাঙে আবার ভাঙেও না। যেমন— ভুল করে গো-রসুন (গরুর রসুন) ফুলকে অন্য কিছু নামেও অনেকে ডেকে থাকেন।
ইংরেজিতে White Spider Lily, Beach Spider Lily. উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Hymenocallis littoralis. পরিবার Amarylliaceae.
পোশাকি নাম স্পাইডার লিলি, কারণ ফুলের গড়ন মাকড়সার জালের মতো। জন্মস্থান দক্ষিণ আমেরিকা হলেও প্রকৃতিতে বুনো পরিবেশেই বেশ ভালোভাবেই জন্মে। আনারস পাতার সঙ্গে কিছুটা মিল থাকলেও শক্ত ও ধারালো খাঁজকাটা নয়। বর্ষায় লম্বা ডাঁটার শীর্ষের ছত্রাকার মঞ্জরিতে সাদা ও সুগন্ধি ফুলগুলো ফোটে। দলনল, ফিতার মতো পাপড়ি, গোড়ায় কাগুজে বাটি বা মুকুটে জড়ানো। বর্ষার ভেজা বাতাসে ফুলের তীব্র মধুর গন্ধ ভেসে বেড়ায়। ফুল ফোটা শেষ হলে শরতে গোড়ার কন্দ দিয়ে আবার চাষ করা যায়।
পানিও বেশ পছন্দ। রোদ ও আংশিক ছায়ায় ভালো থাকে। তবে খেয়াল রাখতে হবে গাছের গোড়ায় যেন পানি না জমে। স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির জন্য পথের ধার অথবা জলার ধার ভালো। গ্রীষ্মের শেষদিক থেকে পুরো বর্ষায় ফোটে। এ সময়ে ফোটা ফুলের সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আজকাল গাছটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসলেও ঠাঁই করে নিয়েছে নাগরিক উদ্যান এমনকি বাসাবাড়ির বারান্দা কিংবা ছাদবাগানসহ টবেও চাষ করছেন শৌখিন বাগানিরা। লিভারের চিকিৎসায় গ্রামবাংলার কবিরাজরা গোড়ার কন্দ ব্যবহার করে থাকেন।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক





