প্রকৃতি প্রত্যয়
কেঁউ ফুলের মোহময় সৌন্দর্য

কিছু ফুল আছে, যাদের সৌন্দর্য প্রথম দেখাতেই মন কেড়ে নেয়। কেঁউ তেমনই এক ফুল। এর রূপে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই প্রথম দেখায় দোলনচাঁপার সঙ্গে তুলনা করেন। সত্যিই, কেঁউ ফুলের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের স্নিগ্ধ, মোহময় সৌন্দর্য। তবে ফুল বললেও একে ঠিক সাধারণ ফুল বলা যায় না। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি পুষ্পমঞ্জরি, যা গুচ্ছাকারে ফোটে। এর রঙ লাল। প্রতিটি মঞ্জরিতে থাকে ত্রিকোনাকার, পাতলা পাপড়ির মতো গঠন। আর সেই ত্রিকোণের ভেতর থেকে উঁকি দেয় মাইক আকৃতির ছোট ছোট সাদা ফুল। রূপে এত আকর্ষণীয় হলেও ফুলে তেমন কোনো গন্ধ নেই। নিসর্গী ও খ্যাতিমান আলোকচিত্রী নওয়াজেশ আহমেদ তার ‘বাংলার বনফুল’ বইয়ে কেঁউয়ের পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমার নাম কেও বা কেওমূল। আমার সন্ধান পাওয়া মোটেও কঠিন নয়। ভালুকা ছাড়িয়ে ময়মনসিংহের পথে রাস্তার ডানপাশে নালার মধ্যে আমার গুচ্ছ গুচ্ছ লম্বা গাছ সহজেই চোখে পড়বে।’
কেঁউয়ের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় অবশ্য বইয়ের পাতায় নয়, মাঠের পথে। ২০০৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহে ঔষধি উদ্ভিদ নিয়ে গবেষণার কাজ করছিলাম। আরডিআরএস বাংলাদেশের ফেলোশিপ এবং জিটিজেডের (জার্মান টেকনিক্যাল কো-অপারেশন) অর্থায়নে পরিচালিত সেই গবেষণার প্রয়োজনে ঘুরে বেড়াতে হতো মাঠে-ঘাটে, গ্রাম থেকে গ্রামে। এমনই এক সময়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী রেলওয়ে স্টেশন থেকে বেরিয়ে পুরনো একটি কবরের ভেতর চোখে পড়ে গাছটি। নির্জন সেই পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা অচেনা মেঠোফুলটির রূপ মুহূর্তেই দৃষ্টি কেড়েছিল। প্রকৃতির নিভৃত কোণে এমন অপূর্ব সৌন্দর্য যে লুকিয়ে থাকতে পারে, তা যেন নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
কেঁউয়ের নামও বেশ বিচিত্র। অঞ্চলভেদে এটি কেঁউ, কেও, কেওমূল, কুষ্মা কিংবা কেমূক নামে পরিচিত। মারমা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এর নাম ‘ক্রাইতং মুই’। চট্টগ্রাম অঞ্চলে আবার একে ডাকা হয় ‘টিয়াটই’ নামে। উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম Costus speciosus। এটি আদা পরিবারের (Zingiberaceae) একটি উদ্ভিদ।
ছায়াযুক্ত স্থান, ঘন ঝোপঝাড় কিংবা স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ কেঁউয়ের বেড়ে ওঠার উপযুক্ত জায়গা। এটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। মাটির নিচের শিকড় থেকে একাধিক ডালপালা বেরিয়ে ক্রমে ঘন ঝোপ তৈরি করে। পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা পাঁচ থেকে ছয় ফুট পর্যন্ত হতে পারে। এর কাণ্ড সবুজ, বেশ শক্ত এবং দেড় ইঞ্চি পর্যন্ত মোটা হয়। কাণ্ডের শীর্ষপ্রান্ত থেকে সাধারণত এক-দুটি শাখা বের হয়।
কেঁউ গাছের পাতাও বেশ আকর্ষণীয়। পাতার রঙ সবুজ, আকৃতি উপবৃত্তাকার এবং পৃষ্ঠ মসৃণ। একটি পাতা পাঁচ থেকে দশ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। মাঝ বরাবর এর প্রস্থ থাকে তিন থেকে চার ইঞ্চি। পাতাগুলো কিছুটা পুরু হলেও নরম। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো পাতার বোঁটা। অন্য অনেক উদ্ভিদের মতো এর বোঁটা সরু নয়; বরং ফিতার মতো চওড়া। সেই ফিতাকৃতির বোঁটা কাণ্ডের গায়ে শাড়ির আঁচলের মতো পেঁচিয়ে থাকে। প্রকৃতির নিজস্ব নকশায় গড়া এই বৈশিষ্ট্য কেঁউকে অন্য গাছ থেকে সহজেই আলাদা করে চেনায়।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক



