রেংমিৎচা: বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে এক মাতৃভাষা

এখন রেংমিৎচা ভাষার জীবন্ত বাহক মাত্র পাঁচজন।
একটি ভাষার মৃত্যুঘণ্টা কখন বেজে ওঠে? যখন সেই ভাষায় কথা বলতে পারেন এমন মানুষের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকজনে এসে ঠেকে। বাংলাদেশের পাহাড়ে এমনই এক নিঃশব্দ বিদায়ের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে রেংমিৎচা ভাষা।
অল্প কিছুদিন আগেও এ ভাষায় কথা বলতে পারতেন মাত্র ছয়জন মানুষ। সেই ছয়জনের একজন, তিন ভাইয়ের সবচেয়ে ছোট মাংওয়াই ম্রো (৬৪), প্রায় দুই মাস আগে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন রেংমিৎচা ভাষার জীবন্ত বাহক মাত্র পাঁচজন। বেঁচে আছেন তাঁর দুই বড় ভাই—মাংপুং ম্রো (৭৪) ও রেংপুং ম্রো (৭০)। দীর্ঘদিন ধরে নানা অসুস্থতায় ভুগছেন দু'জনই।
ম্রো হেডম্যান (মৌজা প্রধান) রেংপুং ম্রোর কণ্ঠে তাই গভীর শঙ্কা। তিনি বলেন, “নতুন প্রজন্মের আর কেউ মাতৃভাষা ধারণ করতে আগ্রহী নয়। তাই এমন করে রেংমিৎচা ভাষা জানা সবাই একে একে হারিয়ে গেলে এই ভাষায় কথা বলার আর কেউ থাকবে না।”
রেংমিৎচা ভাষার অস্তিত্ব প্রথম নথিবদ্ধ করেন ম্রো ও খুমী জনগোষ্ঠী নিয়ে গবেষণা করা জার্মান নৃবিজ্ঞানী লরেন্স জি. লোফলার। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত তাv বইয়ে উঠে আসে এই ভাষা ও এর ভাষাভাষী মানুষের কথা। পরে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে এ ভাষা নিয়ে নিয়মিত গবেষণা শুরু করেন মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড জশুয়া পিটারসন (ডেভিড জে. পিটারসন)। লোফলারের বর্ণনা অনুসরণ করে দুর্গম পাহাড়ে ঘুরে তিনি খুঁজে বের করেন রেংমিৎচা ভাষায় কথা বলতে পারেন—এমন ৩০ জন মানুষকে।
এই ভাষাকে নথিবদ্ধ করার চেষ্টাও হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। ম্রো লেখক ইয়াং ঙান রেংমিৎচা ভাষা নিয়ে বই প্রকাশ করেছেন। বর্তমানে গবেষক আফসানা দেরদৌস এ ভাষা নিয়ে পিএইচডি করছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটও রেংমিৎচা ভাষা নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছে। হয়তো একদিন ভাষাটি হারিয়ে যাবে, কিন্তু তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া এসব দলিল-দস্তাবেজ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার অস্তিত্বের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।
১৯৮৯ সালের পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইনে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০টি ভাষাভাষী ১১টি জনজাতির—চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খেয়াং, খুমি, চাক, পাংখোয়া ও লুসাই—বসবাসের কথা উল্লেখ রয়েছে।
বান্দরবান সদর উপজেলার সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান সুচিত্রা তঞ্চঙ্গ্যা জানান, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে তঞ্চঙ্গ্যা নেতা প্রসন্ন কান্তি তঞ্চঙ্গ্যার উদ্যোগে গড়ে ওঠা তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় যে তঞ্চঙ্গ্যাদের মাতৃভাষা স্বতন্ত্র একটি ভাষা।
তিনি বলেন, পরে বান্দরবান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (কেএসআই) সেই ভাষার বর্ণমালাও প্রকাশ করে।
কেএসআইয়ের সাবেক পরিচালক মং নু চিং বলেন, তঞ্চঙ্গ্যা বর্ণমালা প্রকাশের সময়ও অনেকেরই জানা ছিল না যে বান্দরবানে রেংমিৎচা ভাষাভাষী আরেকটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের কোনো লিখিত ভাষারূপ নেই। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখেই তারা বাঁচিয়ে রেখেছে নিজেদের ভাষা।
তিনি বলেন, জীবনযাপন ও সংস্কৃতিতে ম্রোদের সঙ্গে মিল থাকায় সবাই তাদের ম্রো হিসেবেই চিনত। গত শতকের শেষ দিকে মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী ডেভিড জে. পিটারসন আলীকদমের তৈন খাল অববাহিকায় ম্রো জনগোষ্ঠীর মধ্যেই ঘুরে ঘুরে খুঁজে পান রেংমিৎচা ভাষাভাষী মানুষদের।
মং নু চিংয়ের ভাষায়, “২০০৭ সালে বান্দরবান প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বিষয়টি জানালে প্রথমবারের মতো অনেকেই জানতে পারেন, রেংমিৎচা নামে আরেকটি ভাষা রয়েছে এবং সেই ভাষায় কথা বলা একটি ছোট্ট জনগোষ্ঠীও বাস করে বান্দরবানে।”
ওই সংবাদ সম্মেলনে ডেভিড জে. পিটারসন জানান, তাঁর গবেষণাকালে তিনি রেংমিৎচা ভাষায় কথা বলতে পারেন—এমন ৩০ জন মানুষের সন্ধান পেয়েছেন।
সম্প্রতি আলীকদম উপজেলা সদরে কথা হয় রেংপুং ম্রো হেডম্যানের সঙ্গে। তিনি জানান, বছরের পর বছর ধরে একে একে মানুষ হারাতে হারাতে রেংমিৎচা ভাষাভাষীর সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ছয়জনে।
তখনই তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়েছিল এক গভীর আশঙ্কা—“রেংমিৎচা জানা সবাই বয়োবৃদ্ধ হয়ে গেছে। তারা আর কদিনই বা বাঁচবে!”
সেই আশঙ্কাই যেন সত্যি হলো। গত ১৯ জুলাই আলীকদমের সাংবাদিক ও লেখক মমতাজ উদ্দিন আহমদ জানান, চলতি বছরের ৫ মে মাংওয়াই ম্রোর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর রেংমিৎচা ভাষা জানা মানুষের সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র পাঁচজনে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য, ম্রো ভাষার কবি ও কথাসাহিত্যিক সিং ইয়ং ম্রো জানান, শুধু বাংলাদেশেই নয়, চীন, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশে বিপুল সংখ্যক ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ভেতরে তাদের একমাত্র আবাসস্থল বান্দরবান।
সিং ইয়ং ম্রো বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী পাহাড়ি নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা (ম্রো) চতুর্থ বৃহত্তম। কিন্তু প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এখনো উন্নয়নের দৌড়ে অনেকটাই পিছিয়ে আছি।”
বান্দরবানের চিম্বুক অঞ্চল ছাড়াও আলীকদমের তৈন খাল অববাহিকায় বসবাস করেন বহু ম্রো পরিবার। কেউ কেউ স্থায়ী আবাস গড়েছেন নাইক্ষ্যংছড়িতেও। আর এই তৈন খালের দুর্গম জনপদেই গবেষণার সময় ডেভিড জে. পিটারসন খুঁজে পান রেংমিৎচা ভাষার শেষ আশ্রয়টুকু।
ক্রাংসি পাড়া ও আশপাশের এলাকায় তিনি সন্ধান পান রেংমিৎচা ভাষায় কথা বলা কয়েকজন মানুষের। তাঁদের মধ্যে ছিলেন একই পরিবারের তিন ভাই—মাংপুং ম্রো (৭৪), রেংপুং ম্রো (৭০) ও মাংওয়াই ম্রো (৬৪)। ছিলেন নয়াপাড়া ইউনিয়নের মেনসিং পাড়ার থোয়াই লক ম্রো (৬০) এবং ক্রাংসি পাড়ার দুই নারী কুনরাও ম্রো (৭৪) ও কুনরাও ম্রো (৬১)। যেন এই অল্প কয়েকজন মানুষই পরম মমতায় বয়ে নিয়ে চলেছেন একটি বিলুপ্তপ্রায় ভাষার শেষ আলো। কিন্তু সেই আলোও কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে, তাঁদেরই একজন মাংওয়াই ম্রো ইতোমধ্যে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন।
জীবিকার প্রয়োজনে তিন ভাই তিন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন। বড় ভাই মাংপুং ম্রো বসতি গড়েছেন আলীকদম সদর ইউনিয়নের ক্রাংসি এলাকায়। রেংপুং ম্রো থাকেন নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের ওয়াইবট এলাকায়। আর সদ্যপ্রয়াত মাংওয়াই ম্রোর বাড়ি ছিল নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সাং প্লইং এলাকায়।
তরুণ ম্রো লেখক ইয়াং ঙানের বিশ্বাস, রেংমিৎচা ভাষা জানা মানুষগুলো যদি একই গ্রামে একসঙ্গে বসবাস করতেন, তাহলে অন্তত মাতৃভাষার চর্চা কিছুটা হলেও টিকে থাকত। তাঁর কণ্ঠে তাই এক গভীর আবেদন ধ্বনিত হয়, “আমাদের রাষ্ট্র কি একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য উদ্যোগ নিতে পারে না?”







