যুদ্ধের আড়ালে ইরানের সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে আঘাত

উত্তর তেহরানের এভিন এলাকায় অবস্থিত শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেজার ও প্লাজমা গবেষণা ইনস্টিটিউট
চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাতের মাধ্যমে ইরান সম্মুখীন হয়েছে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কারণে দেশটির দীর্ঘদিনের অর্জিত জ্ঞানের অবকাঠামো এবং হাজার বছরের পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আজ ধ্বংসের মুখে।
যেখানে আক্রমণকারী পক্ষ দাবি করছে যে তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানছে, সেখানে ইরানের সরকারি তথ্য ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সত্য চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা।
এই যুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ দিক ইরানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত হামলা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরে 'শাজারেহ তাইয়েবেহ' প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে সূচনা হয় এই ধ্বংসযজ্ঞের। সেই হামলায় নিহত হয় ১৭০ জন, যাদের অধিকাংশই ছিল ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২৮ মার্চ হামলাটি ছিল সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভেদী একটি হামলা।
তারপর হামলা করা হয় শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়েও। উত্তর তেহরানে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেজার অ্যান্ড প্লাজমা রিসার্চ ইনস্টিটিউটটি বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয় গত ৪ এপ্রিল।
ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হোসেন সিমাই সারাফের মতে, ‘এসব হামলা সাধারণ কোনো আক্রমণ নয়। এটি একটি জাতির বিবেকের ওপর আক্রমণ।’
এ ছাড়া ইরানের শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রিফ ইউনিভার্সিটিতেও আঘাত হেনেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে ইরানের প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ রেজা আরিফ অভিযোগ করেছেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলা করতে বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরকম একটি প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানোর মানে হলো, একটি দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।
শুধু যে ইরানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে হামলা করা হচ্ছে, এমন নয়। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি করার লক্ষ্যে আক্রমণ করা হয়েছে ইরানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং পুরানো সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতেও।
ইরান বিশ্বের অন্যতম একটি প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি। কিন্তু চলমান যুদ্ধে দেশটির অন্তত ৫৬টি ঐতিহ্যবাহী স্থান, যেমন, জাদুঘর এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের সংস্কৃতিমন্ত্রী রেজা সালেহি আমিরির মতে, এই ধ্বংসযজ্ঞ হলো ইরানি পরিচয় এবং এ শতবর্ষ পুরনো ঐতিহ্যের ওপর পরিকল্পিত হামলা।
ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য কিছু স্থানের মধ্যের রয়েছে ঐতিহ্যবাহী কিছু দর্শনীয় স্থান, প্রাচীন প্রাসাদ এবং নগরী। ধ্বংস করা হয়েছে মসজিদ-ই-জামে নামের একটি মসজিদ। ইস্পাহানে অবস্থিত ১২ শতাব্দীর পুরনো এই মসজিদটি ইরানের প্রাচীনতম জুমা মসজিদ হিসেবেও পরিচিত।
এর স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্য বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ।
এ ছাড়াও আঘাত হানা হয়েছে ইরানের চেহেল সোতুন প্রাসাদে। ১৭০০ শতাব্দীর এই ঐতিহাসিক প্রাসাদটি ইস্পাহানের স্থাপত্যের অনন্য এক নিদর্শন। যুদ্ধের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই প্রাসাদটি।
হামলা করা হয়েছে গোলেস্তান প্রাসাদ ও গ্র্যান্ড বাজার নামক এলাকাতেও। তেহরানের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই স্থানগুলো কাজার আমলের ইতিহাসের সাক্ষী।
শুধুমাত্র তেহরানেই ১৯টি ঐতিহাসিক স্থান আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত ঐতিহ্যবাহী স্থানের কথা উল্লেখ করতে গেলে পার্সিয়ান ফালাক-ওল-আফলাক দুর্গের প্রসঙ্গও আসে। লরেস্তান প্রদেশের এই প্রাচীন দুর্গটিও হামলার হাত থেকে রেহাই পায়নি।
ইরানের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী রেজা সালেহির মতে, ‘এই ক্ষতিগুলো অপূরণীয়।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘একটি প্রাচীন প্রাসাদের মূল পাথর বা মসজিদের প্রাচীন টাইলস একবার যদি ধ্বংস হয়, পরে তা আধুনিক উপায়ে মেরামত করলেও তার ঐতিহাসিক মূল্য ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি ফাটল ইতিহাসের গায়ে এক একটি স্থায়ী ক্ষত হয়ে থেকে যাবে।’
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের মতে, ইরানের গবেষণার ওপরও করা হয়েছে আঘাত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ইরানের লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগারগুলোও হামলার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না।
দেশটির পাবলিক লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৫৫টি লাইব্রেরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার মধ্যে দুটি লাইব্রেরি সম্পূর্ণ আঘাত করে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে মাটির সঙ্গে।
এটি কেবল একটি ভবনের ধ্বংস নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে সংরক্ষিত জ্ঞান ও পাণ্ডুলিপির চিরস্থায়ী বিনাশ বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।
ইরান সরকার এই ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতাকে দায়ী করছেন।
বিশেষ করে ইরান সরকারের তরফ থেকে ইউনেস্কোর প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিটি ঐতিহ্যবাহী স্থানের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক ইউনেস্কোর কাছে থাকা সত্ত্বেও তারা এই অমূল্য সম্পদগুলো রক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি।
আল জাজিরা থেকে অনূদিত















