গুজব, মব-জব, আর বট-জব
- গুজব কখনো নিরীহ না। মব-জব কখনো নিরপেক্ষ না। বট-জব কখনো কেবল প্রযুক্তির খেলা না। এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলে প্রথম আঘাত পড়ে সত্যের উপর, পরের আঘাত পড়ে বিচারের উপর, আর শেষ আঘাত পড়ে গণতন্ত্রের উপর।

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় বিপদ শুধু গুজব না। বিপদ হলো—গুজব, জনতার চাপ, আর কৃত্রিম ডিজিটাল প্রচার একসাথে কাজ করছে। একদিকে কেউ মিথ্যা ছড়ায়, অন্যদিকে জনতা তেড়ে আসে, তারপর দেখা যায় অনলাইনে হাজার হাজার একই রকম মন্তব্য, ভুয়া ফটোকার্ড, বা সাজানো প্রতিক্রিয়া দিয়ে একটা কৃত্রিম ‘জনমত’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। এই জায়গাতেই গুজব, মব-জব, আর বট-জব কেবল তথ্যের সমস্যা থাকে না; তারা রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা, বিবেক, ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে, তবে ‘যৌক্তিক সীমাবদ্ধতা’ও রাখে। সমস্যা হলো, সেই সীমারেখা যখন অস্পষ্ট থাকে, তখন গুজব ঠেকানোর নামে সমালোচনাও সহজে দমন করা যায়।
এখানে ‘গুজব’ বলতে আমি যাচাইহীন বা বিভ্রান্তিকর তথ্য বোঝাচ্ছি। ‘মব-জব’ বলতে বোঝাচ্ছি জনতার চাপ, দলীয় উত্তেজনা, বা অনলাইন উসকানিতে কাউকে দ্রুত শাস্তিযোগ্য বানিয়ে ফেলা। আর ‘বট-জব’ বলতে বোঝাচ্ছি ভুয়া অ্যাকাউন্ট, সমন্বিত মন্তব্য, কেনা প্রতিক্রিয়া, বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর কনটেন্ট দিয়ে কৃত্রিম জনমত বানানো। এগুলো আইনি শব্দ না; বিশ্লেষণের সুবিধার জন্য ব্যবহার করছি। কিন্তু বাস্তব ঘটনাগুলো একেবারে বাস্তব।
কেন বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ
গুজব, মব-জব, আর বট-জবের রাজনৈতিক ব্যবহার বহু জায়গায় হয়েছে, এবং সাধারণত পাঁচটি বড় কাজে লাগে।
এক, সংখ্যালঘু বা বিরোধীকে টার্গেট করা।
দুই, রাস্তায় ক্ষোভ নামানো।
তিন, নির্বাচনি বয়ান নিয়ন্ত্রণ করা।
চার, সমালোচনাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বানানো।
পাঁচ, কৃত্রিম জনমত তৈরি করা।
এই পাঁচটি আলাদা আলাদা কাজ মনে হলেও বাস্তবে তারা একে অন্যকে পুষ্ট করে, বৃদ্ধি করে। আগে গুজব ছড়ানো হয়, তারপর সেটিকে আহত অনুভূতির ভাষা দেওয়া হয়, তারপর জনতা নামানো হয়, তারপর সেই জনতার রাগকে রাজনৈতিক মূলধনে বদলে ফেলা হয়। তার সঙ্গে যদি যোগ হয় বট-নেটওয়ার্ক আর ভুয়া বিশেষজ্ঞ অভিমত, তাহলে সত্য, মিথ্যা, সমালোচনা, অপপ্রচার—সব একসাথে জট পাকিয়ে যায়। তখন জনপরিসর আর যুক্তির জায়গা থাকে না; তা হয়ে যায় নিয়ন্ত্রিত আবেগের মাঠ। এটা আমার বিশ্লেষণ, তবে বাংলাদেশি ও আন্তর্জাতিক উদাহরণগুলো এই পাঠকে শক্তভাবে সমর্থন করে।
নৃবিজ্ঞানীরা এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন
নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত গুজবকে শুধু ‘মিথ্যা খবর’ বলে দেখেন না। তাদের কাছে বড় প্রশ্ন হলো: মানুষ কেন একটি কথা বিশ্বাস করল? কোন ভয়, কোন অপমান, কোন রাজনৈতিক ক্ষত, কোন সামাজিক অবিশ্বাস, বা কোন অভিজ্ঞতা সেই কথাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলল? নৃবিজ্ঞানী ম্যাক্সিম পোলেরি বলেছেন, অপতথ্যকে শুধু সত্য-মিথ্যার পরীক্ষা দিয়ে বোঝা যায় না; এটিকে দেখতে হবে তার উৎপাদনের প্রেক্ষাপট, সামাজিক সম্পর্ক, এবং অবিশ্বাসের ভেতর থেকে। তাঁর মতে, গুজব বা অপতথ্য অনেক সময় সমাজের গভীর সংকটের সংকেতও দেয়।
এই জায়গায় নৃবৈজ্ঞানিক শিক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ: গুজব ভুল হতে পারে, কিন্তু তা সামাজিকভাবে অর্থহীন হয় না। মানুষ অনেক সময় গুজবকে বিশ্বাস করে কারণ তারা মনে করে ‘আনুষ্ঠানিক সত্য’ তাদের জীবনের সত্যকে ধারণ করছে না। অর্থাৎ, গুজব প্রায়ই অবিশ্বাসের ভাষা হয়ে ওঠে। এ কারণে নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, গুজব ঠেকাতে শুধু খণ্ডন করলেই হবে না; বুঝতে হবে কোন সামাজিক জমিতে সেটি জন্ম নিচ্ছে।
রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানে গুজবকে প্রায়ই ভয়, সহিংসতা, এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সঙ্গে একসাথে পড়া হয়। নৃবিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট কির্শ পশ্চিম পাপুয়া নিয়ে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র-পৃষ্ঠপোষক সহিংসতা নিয়ে গুজব শুধু সন্ত্রাসের গল্প বলে না; তা সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতাকেও পুনরুৎপাদন করে। তাঁর ভাষায়, গুজব ‘terror’-এর অভিজ্ঞতা ও প্রকাশ—দুটোতেই ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ গুজব শুধু তথ্য না; কখনো তা শাসনের এক ধরনের ছায়া-প্রযুক্তি।
গুজবের রাজনৈতিক ব্যবহার হয় খুব নির্দিষ্টভাবে। প্রথমে ‘ধর্ম অবমাননা’, ‘অপমান’, ‘রাষ্ট্রবিরোধিতা’, ‘ষড়যন্ত্র’—এই ধরনের শব্দ ছড়ানো হয়। তারপর সেটি আবেগী সত্যে বদলে যায়। তারপর মব নামে
নৃবিজ্ঞানী নিলস বুবান্ট ইন্দোনেশিয়ার সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নিয়ে লিখতে গিয়ে দেখান, গুজব অনেক সময় মবিলাইজিং এজেন্ট (সমাবেশ-ঘটানো চালিকা শক্তি) হিসেবে কাজ করে। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, গুজবের শক্তি শুধু তার অজ্ঞাত উৎসে না; কখনো তা লিফলেট, লেখা, বা ‘দলিল’ আকারে ঘুরে বেড়ায় এবং লিখিত হওয়ার কারণে আরও বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। এই পাঠ বাংলাদেশে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে ফেসবুক পোস্ট, স্ক্রিনশট, ফটোকার্ড, বা কথিত বার্তা—এসব প্রায়ই ‘প্রমাণ’ হিসেবে circulating truth-এ বদলে যায়।
ভীণা দাসের কাজ আমাদের আরেকটি জরুরি জিনিস শেখায়। তিনি দেখান, সহিংসতা কখনো শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা না; তা পরে নেমে আসে দৈনন্দিন জীবনে (the ordinary)—ভাষায়, নীরবতায়, সন্দেহে, সম্পর্কের ভেতরে। তাঁর কাজের আলোকে বলা যায়, গুজবও তেমনই। একটি সাম্প্রদায়িক গুজব, একটি রাজনৈতিক অপবাদ, বা একটি ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ তকমা—এসব শুধু একদিনের উত্তেজনা তৈরি করে না; এগুলো পরে সমাজের ভেতরে দীর্ঘস্থায়ী ভয়, দূরত্ব, এবং অবিশ্বাস রেখে যায়।
অর্জুন অ্যাপাদুরাই এই আলোচনাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যান। তিনি দেখান, আধুনিক বিশ্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠী অনেক সময় সংখ্যায় ছোট গোষ্ঠীকেও ভয় পায়, কারণ তাদেরকে ‘অসম্পূর্ণ জাতি’, ‘অন্তর্ঘাত’, বা ‘ভেতরের শত্রু’ হিসেবে কল্পনা করা হয়। তাঁর এই পাঠ বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে গুজব প্রায়ই ‘ধর্ম অপমান’, ‘জাতির শত্রু’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, বা ‘ষড়যন্ত্রকারী’—এই ভাষায় ছড়ায়। অর্থাৎ গুজব অনেক সময় তথ্যের চেয়ে বেশি কাজ করে পরিচয়-আতঙ্ক (identity anxiety) তৈরি করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ নৃবৈজ্ঞানিক শিক্ষা আসে জো গুডম্যানের কাজ থেকে। তিনি দেখিয়েছেন, স্বাস্থ্য বা টিকা নিয়ে গুজবকে কেবল ‘ভুল বিশ্বাস’ বললে পুরো সত্য ধরা পড়ে না; অনেক সময় এগুলো মানুষের সেই ক্ষোভও বহন করে, যা বৈষম্যমূলক পুলিশি শাসন বা অসম রাষ্ট্রীয় আচরণের বিরুদ্ধে জমে থাকে। এই পাঠকে বাংলাদেশের দিকে টানলে বলা যায়: সব গুজব একই রকম না, কিন্তু অনেক গুজব এমন সামাজিক অবিশ্বাসের ভেতর জন্ম নেয়, যা রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করেছে বা বাড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে নৃবিজ্ঞানীরা আমাদের একটি খুব জরুরি শিক্ষা দেন: গুজবকে শুধু ভুল তথ্য, মবকে শুধু উন্মাদ জনতা, আর বটকে শুধু প্রযুক্তিগত প্রতারণা হিসেবে দেখলে বোঝা অসম্পূর্ণ থাকে। গুজব হলো অবিশ্বাসের ভাষা, মব-জব হলো নৈতিক শাস্তির জনসমাবেশ, আর বট-জব হলো কৃত্রিম জনমতের যন্ত্র। এই তিনটি একসাথে কাজ করলে জনপরিসর শুধু বিভ্রান্ত হয় না; রাষ্ট্র, সমাজ, এবং নাগরিকতার সম্পর্কও বদলে যায়। এটা আমার সংশ্লেষ, কিন্তু পোলেরি, কির্শ, বুবান্ট, দাস, অ্যাপাদুরাই, এবং গুডম্যানের কাজ একসাথে পড়লে এই দিকটাই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে গুজব কীভাবে রাজনৈতিক অস্ত্র হলো
বাংলাদেশে গুজব নতুন কিছু না। কিন্তু ডিজিটাল যুগে এর গতি, পরিসর, আর ক্ষতি—সবকিছু বদলে গেছে। রামু (২০১২), নাসিরনগর (২০১৬), রংপুরের ঠাকুরপাড়া (২০১৭), এবং কুমিল্লা-পরবর্তী সহিংসতা (২০২১)—এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, সামাজিকমাধ্যম-ঘিরে গুজব বা কথিত পোস্ট কীভাবে সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক মবিলাইজেশনের ট্রিগার হতে পারে। নাসিরনগরের ঘটনায় পরে সংবাদে আসে, ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায় অভিযুক্তের ফোন থেকেই পোস্টটি আপলোড হয়নি। অর্থাৎ ‘পোস্ট’ ছিল, কিন্তু সেটি কীভাবে, কারা, কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করল—সেটাই ছিল বড় প্রশ্ন। ২০২১ সালের কুমিল্লা-ঘটনার পর দেশজুড়ে বহু হামলা ও প্রাণহানির খবর আসে।
এখানে গুজবের রাজনৈতিক ব্যবহার হয় খুব নির্দিষ্টভাবে। প্রথমে ‘ধর্ম অবমাননা’, ‘অপমান’, ‘রাষ্ট্রবিরোধিতা’, ‘ষড়যন্ত্র’—এই ধরনের শব্দ ছড়ানো হয়। তারপর সেটি আবেগী সত্যে বদলে যায়। তারপর মব নামে। তারপর সেই মবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়—কখনো সংখ্যালঘুদের ভয় দেখাতে, কখনো প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে, কখনো ‘জনতার রাগ’ দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপকে বৈধতা দিতে। এটি শুধু তথ্যের যুদ্ধ না; এটি ক্ষমতা-দখলের শর্টকাট।
আওয়ামী লীগ আমল: আইন দিয়ে সমালোচনা দমন, গুজবের ক্ষেত্রে দুর্বল জবাব
আওয়ামী লীগ আমলে ডিজিটাল আইনকে কেন্দ্র করে মতপ্রকাশ দমনের দীর্ঘ ইতিহাস তৈরি হয়। Human Rights Watch ২০১৮ সালে দেখায়, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সামাজিকমাধ্যমের সমালোচকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার হয়েছে; পরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনও একই ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে। Amnesty International ২০২৪ সালে বলে, সাইবার সিকিউরিটি আইনও আগের দমনমূলক কাঠামোর বড় অংশ বহন করছিল। Freedom House-এর মূল্যায়নও বলছে, গত দশকে বাংলাদেশে অনলাইন পরিসরে ভয়, হয়রানি, গ্রেপ্তার, এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণ ছিল বড় বাস্তবতা।
কিন্তু একই সময়ে সাম্প্রদায়িক গুজব-চালিত সহিংসতার বহু ঘটনায় রাষ্ট্রের জবাব ছিল দেরিতে, দুর্বল, বা অসম্পূর্ণ। ফলে একটি ভয়ংকর বৈপরীত্য তৈরি হয়: সমালোচকের জন্য আইন খুব দ্রুত কাজ করে, কিন্তু গুজব-উসকানিদাতা বা সংগঠিত সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচার অনেক সময় ধীর বা দুর্বল থাকে। এর ফলে সমাজে এক ধরনের শিক্ষা ছড়িয়ে পড়ে—রাষ্ট্রের কাছে সত্যের চেয়ে ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতা গুজবকে আরও বেশি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করে।
ইন্টেরিম আমল: উন্মুক্তির সুযোগ, কিন্তু পুরোনো অন্ধকারের ছায়া
২০২৪-পরবর্তী ইন্টেরিম আমলে কিছু উন্নতির কথা Freedom House বলেছে। তাদের মতে, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশে ইন্টারনেট-স্বাধীনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, কিছু দমনমূলক চর্চা কমেছে, এবং কিছু ইতিবাচক সংস্কারও এসেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা সতর্ক করেছে যে প্রতিশোধমূলক প্রবণতার ঝুঁকি থেকেছে, বিশেষ করে আগের শাসকদল ও তার সমর্থক বলে বিবেচিতদের বিরুদ্ধে। Amnesty-ও বলেছে, নতুন সরকারকে সাইবার সিকিউরিটি আইন বাতিল বা বড় ধরনের সংশোধন করে মানবাধিকার-সম্মত কাঠামো বানাতে হবে।
অর্থাৎ, সরকার বদলালেই বক্তৃতা-নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি শেষ হয় না। প্রায়ই কেবল টার্গেট বদলায়। একসময় সমালোচক, আরেকসময় আগের শাসকদল, কখনো ধর্মীয়ভাবে অস্বস্তিকর কণ্ঠ—সব ক্ষেত্রেই একই রাষ্ট্রীয় যুক্তি ফিরে আসে: ‘শৃঙ্খলা’, ‘নিরাপত্তা’, ‘আঘাত’, ‘স্থিতি’।
এখনকার নতুন বাস্তবতা: বিএনপি সরকার এবং পুরোনো ফাঁদ
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি বলেছিলেন, ক্ষমতায় গেলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া হবে এবং অনলাইনে মত দেওয়ার জন্য কাউকে হয়রানি করা হবে না। এই প্রতিশ্রুতি এখন কথার জায়গায় নেই; এটি পরীক্ষার জায়গায় এসেছে।
কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মুক্তাগাছা, শ্রীনগর, ও ভোলার ঘটনায় ফেসবুক পোস্ট, শেয়ার, বা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পুলিশি ব্যবস্থা ও ৫৪ ধারার ব্যবহারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর বিচারিক সত্য আদালত বলবে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে একটি জিনিস পরিষ্কার: পোস্টের জবাব দ্রুত দমনে চলে গেলে সরকার খুব দ্রুত সেই পুরোনো ফাঁদে পা দেয়, যেখান থেকে বেরোনোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই সে ক্ষমতায় এসেছে।
মব-জব: জনতার রাগ যখন রাষ্ট্রের শর্টকাট হয়ে যায়
মব-জব শুধু সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় না, দলীয় রাজনীতিতেও দেখা যায়। যখন দলীয় কর্মী, অনলাইন উস্কানি, আর জনতার ক্ষোভ একসাথে কাজ করে, তখন বিচার প্রক্রিয়া ছোট হয়ে আসে। কেউ ‘অপমান করেছে’, ‘দেশদ্রোহী’, ‘ধর্মবিদ্বেষী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’—এই তকমাগুলো খুব দ্রুত শাস্তির দাবি তৈরি করে। সেখানে তথ্যযাচাই, ব্যাখ্যা, সংশোধন, বা আইনি স্বচ্ছতা পেছনে পড়ে যায়। Daniel Trottier যেটিকে ‘ডিজিটাল জনতা-নির্ভর শাস্তিদান’ বলেছেন, বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সেটিকে খুব কাছ থেকে দেখাচ্ছে।
এই জায়গায় সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—রাষ্ট্র যদি জনতার রাগকে নিজের কাজের বৈধতা বানায়, তবে আইনের শাসন ধীরে ধীরে মবের আবেগের অনুবাদে পরিণত হয়।
বট-জব: কৃত্রিম জনমতের কারখানা
বাংলাদেশে বট-জব এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালে Dismislab একটি সমন্বিত বট-নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে, যেখানে ১,৩৬৯টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ২১,০০০-এর বেশি সমন্বিত মন্তব্য করেছে, মূলত তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে এবং বিএনপির বিরুদ্ধে। The Daily Starও এই নেটওয়ার্ক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর মানে হলো, ‘জনমত’ বলে যা দেখা যায়, তার সবটাই স্বতঃস্ফূর্ত না-ও হতে পারে। কিছু অংশ তৈরি করা, সাজানো, বা কেনা হতে পারে।
সবচেয়ে আগে বুঝতে হবে, গুজব, মব-জব, আর বট-জব শুধু ‘ভুল তথ্যের’ সমস্যা না; এগুলো সমাজের ভেতরের আস্থা নষ্ট করে। যখন মানুষ বারবার ভুয়া পোস্ট, সাজানো ফটোকার্ড, কৃত্রিম ভিডিও, আর সমন্বিত আক্রমণ দেখে, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়। এর ফলে মানুষ শুধু বিভ্রান্ত হয় না; তারা একে অন্যকে সন্দেহ করতে শুরু করে
২০২৩ সালে AFP-এর তদন্তে আরও দেখা যায়, শত শত মতামতধর্মী লেখা ভুয়া বিশেষজ্ঞ পরিচয়ে ছড়ানো হয়েছিল, যেগুলো সরকারপন্থী বয়ানকে শক্তিশালী করছিল। এটি বট-জবের আরও সূক্ষ্ম রূপ—এখানে শুধু প্রতিক্রিয়া কেনা হয় না; বিশ্বাসযোগ্যতার আবরণও বানানো হয়।
এখানে বট-জবের রাজনৈতিক ব্যবহার তিনভাবে হয়।
প্রথমত, জনমতের ভান তৈরি করা—যাতে মনে হয় ‘সবাই’ একটি কথাই বলছে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিপক্ষকে অজনপ্রিয় দেখানো—বিদ্রূপাত্মক প্রতিক্রিয়া, গালির ঢল, বা এক ভাষার কপি-পেস্ট আক্রমণ দিয়ে।
তৃতীয়ত, সাধারণ পাঠক ও সংবাদমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করা—কী স্বতঃস্ফূর্ত, আর কী কৃত্রিমভাবে বাড়ানো, তা বোঝা কঠিন করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর অপতথ্য: নতুন বিপদ
এখন বট-জব শুধু কমেন্টে নেই। Dismislab জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম ভাগে তারা ৮০০-এর বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত রাজনৈতিক ভিডিও শনাক্ত করে।
অনেকগুলোতেই প্রয়োজনীয় লেবেল ছিল না। অর্থাৎ এখন শুধু ভুয়া টেক্সট না; ভুয়া ছবি, ভুয়া কণ্ঠ, ভুয়া ভিডিও—সবকিছু দিয়ে রাজনৈতিক অর্থ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় আরেকটি বিপদও বাড়ে: সত্যিকারের কনটেন্টকেও ‘ফেক’ বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে
আন্তর্জাতিকভাবে দেখলেও একই ধারা দেখা যায়। মিয়ানমারে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা বলেছিলেন, Facebook রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণ ছড়াতে ভূমিকা রেখেছিল; Amnesty পরে বলে, Meta-র ব্যবস্থাই সহিংসতাকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতে WhatsApp গুজব বহু জায়গায় গণপিটুনির ট্রিগার হয়; Reuters দেখায়, ভুয়া বার্তা ছড়িয়ে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়, পরে WhatsApp-কে ফরোয়ার্ড সীমা কমাতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ সালের নির্বাচনে Russian Internet Research Agency সামাজিকমাধ্যম ব্যবহার করে বিভাজন ও মিথ্যা বয়ান ছড়ানোর চেষ্টা করেছিল—এ কথা মার্কিন সিনেটের দ্বিদলীয় রিপোর্টে বলা হয়েছে। ব্রাজিলে নির্বাচনি অপতথ্য এত বড় সমস্যা হয় যে দেশটির উচ্চ নির্বাচন আদালত বিশেষ অপতথ্য-প্রতিরোধ কর্মসূচি চালায়।
এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা একটি জিনিস খুব স্পষ্ট করে: গুজব ও বট-জবকে শুধু পুলিশি দমন দিয়ে সামলানো যায় না। আলাদা তথ্য-সুরক্ষা ব্যবস্থা লাগে।
কেন এগুলি সমাজ, বাকস্বাধীনতা, রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য ক্ষতিকর
সবচেয়ে আগে বুঝতে হবে, গুজব, মব-জব, আর বট-জব শুধু ‘ভুল তথ্যের’ সমস্যা না; এগুলো সমাজের ভেতরের আস্থা নষ্ট করে। যখন মানুষ বারবার ভুয়া পোস্ট, সাজানো ফটোকার্ড, কৃত্রিম ভিডিও, আর সমন্বিত আক্রমণ দেখে, তখন সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ঝাপসা হয়ে যায়। এর ফলে মানুষ শুধু বিভ্রান্ত হয় না; তারা একে অন্যকে সন্দেহ করতে শুরু করে। সংখ্যালঘু, নারী, ভিন্নমতাবলম্বী, সাংবাদিক, শিক্ষক, বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ—সবাই সম্ভাব্য টার্গেটে পরিণত হয়। বাংলাদেশে ২০২৪–২০২৬ সময়ে fact-checking সংস্থাগুলোর শনাক্ত করা বিপুল পরিমাণ রাজনৈতিক অপতথ্য, নারীকে লক্ষ্য করে ছড়ানো অপতথ্য, এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা-ঘিরে বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দেখায়—এটি কেবল অনলাইন সমস্যা না; এটি সামাজিক সম্পর্কের ভাঙনেরও সমস্যা।
দ্বিতীয়ত, এগুলো বাকস্বাধীনতার জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ গুজব, অপতথ্য, কটূক্তি, ব্যঙ্গ, সমালোচনা, এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা—সব একসাথে মিশে গেলে রাষ্ট্র খুব সহজে সমালোচনাকেও ‘আপত্তিকর’ বা ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বলে দমন করতে পারে। বাংলাদেশে সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকার করে, কিন্তু HRW, Amnesty, Freedom House, এবং ARTICLE 19—সবাই দেখিয়েছে যে অস্পষ্ট ডিজিটাল আইন, অনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, এবং বিস্তৃত পুলিশি ক্ষমতা থাকলে ‘গুজব দমন’ খুব দ্রুত ‘সমালোচনা দমন’-এ পরিণত হয়। এর ফলে মানুষ কেবল গ্রেপ্তারের ভয়েই চুপ থাকে না; অনেকে আগে থেকেই নিজেকে সেন্সর করতে শুরু করে। অর্থাৎ, গুজবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে যদি সমালোচনার জায়গা ছোট করা হয়, তাহলে শেষ পর্যন্ত মিথ্যাও থাকে, স্বাধীনতাও কমে।
তৃতীয়ত, এগুলো রাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর। বাইরে থেকে মনে হতে পারে, গুজব ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নিলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়। বাস্তবে প্রায়ই উল্টোটা ঘটে। যখন রাষ্ট্র সমালোচনা আর অপতথ্যের পার্থক্য করতে পারে না, যখন জনতার রাগকে আইনের শর্টকাট বানায়, যখন পুলিশি প্রতিক্রিয়া fact-check, counter-speech, বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার জায়গা দখল করে নেয়, তখন রাষ্ট্রের বৈধতা দুর্বল হয়। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়—একদিকে সমালোচকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন, অন্যদিকে গুজব-চালিত সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচারহীনতা—এই দ্বৈততা রাষ্ট্রকে আস্থাহীন করে তোলে। রাষ্ট্র তখন সত্যের রক্ষক নয়; বরং ভয়, প্রতিক্রিয়া, এবং রাজনৈতিক সুবিধার খেলায় জড়িয়ে পড়ে।
সমালোচনার সব দুয়ার খোলা রাখতে হবে, কিন্তু গুজব, মব-চাপ, আর বট-চালিত অপতথ্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট, সীমিত, ন্যায্য, এবং অধিকার-সম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সমাজ বিভক্ত হবে, বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হবে, রাষ্ট্র আস্থাহীন হবে, আর জনগণ আরও বেশি ভয়, বিভ্রান্তি, ও অনিরাপত্তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে
চতুর্থত, এগুলো জনগণের জন্য সরাসরি বিপজ্জনক। গুজব অনেক সময় কারও সুনাম ধ্বংস করে, চাকরি নষ্ট করে, সামাজিক লাঞ্ছনা ডেকে আনে, বা শারীরিক হামলার ঝুঁকি তৈরি করে। মব-জব বিচারকে আদালত থেকে টেনে এনে জনতার আবেগে ফেলে দেয়। বট-জব কৃত্রিম জনমত তৈরি করে এমন এক চাপ তৈরি করে, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারে না কোনটা স্বতঃস্ফূর্ত, আর কোনটা সাজানো। আন্তর্জাতিক উদাহরণও একই শিক্ষা দেয়: মিয়ানমারে Facebook-ঘিরে hate speech রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে বাড়িয়েছে; ভারতে WhatsApp গুজব গণপিটুনির ট্রিগার হয়েছে; যুক্তরাষ্ট্রে Russian Internet Research Agency সামাজিক বিভাজন বাড়াতে social media ব্যবহার করেছে; আর ব্রাজিলকে নির্বাচনি অপতথ্যের বিরুদ্ধে আলাদা counter-disinformation program গড়তে হয়েছে। অর্থাৎ, এই সমস্যা কল্পিত না; বাস্তব, এবং প্রাণঘাতীও হতে পারে।
পঞ্চমত, এগুলো গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে। গুজবের কাজ সত্য নষ্ট করা। মব-জবের কাজ বিচারকে শর্টকাটে নামানো। বট-জবের কাজ জনমতকে কৃত্রিম বানানো। এই তিনটি একসাথে সক্রিয় হলে গণতন্ত্রের ভেতরেই গণতন্ত্রবিরোধী অবকাঠামো তৈরি হয়। তখন নির্বাচন হয়, কিন্তু নির্বাচনি বয়ান হয় দূষিত; মতপ্রকাশ থাকে, কিন্তু তার ওপর থাকে ভয়; জনমত থাকে, কিন্তু তার ভেতর ঢুকে পড়ে কেনা প্রতিক্রিয়া, কপি-পেস্ট আক্রমণ, আর অ্যালগরিদম-চালিত কৃত্রিম দৃশ্যমানতা। নৃবিজ্ঞানী ম্যাক্সিম পোলেরি misinformation-কে সামাজিক অবিশ্বাসের সংকেত হিসেবে পড়তে বলেন; স্টুয়ার্ট কির্শ দেখান গুজব রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভিজ্ঞতাকে পুনরুৎপাদন করতে পারে; নিলস বুবান্ট দেখান গুজব communal violence-এ mobilizing agent হতে পারে; ভীণা দাস দেখান সহিংসতা ও গুজব ordinary life-এর ভেতর নেমে আসে; ড্যানিয়েল ট্রটিয়ার দেখান digital vigilantism জনতা-নির্ভর শাস্তির সমান্তরাল ব্যবস্থা হয়ে উঠতে পারে; আর Woolley-Howard-এর computational propaganda ধারণা দেখায় বট, অ্যালগরিদম, আর platform manipulation মিলে জনমতকে কীভাবে প্রকৌশলীকৃত করা হয়। তাই এই সংকট কেবল তথ্যের সংকট না; এটি গণতান্ত্রিক সমাজের সংকট।
এই কারণে শেষ কথা খুব পরিষ্কার: সমালোচনার সব দুয়ার খোলা রাখতে হবে, কিন্তু গুজব, মব-চাপ, আর বট-চালিত অপতথ্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট, সীমিত, ন্যায্য, এবং অধিকার-সম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে সমাজ বিভক্ত হবে, বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হবে, রাষ্ট্র আস্থাহীন হবে, আর জনগণ আরও বেশি ভয়, বিভ্রান্তি, ও অনিরাপত্তার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: রাজনৈতিক দলগুলো কী করবে?
সরকারি দল হিসেবে বিএনপির করণীয়: বিএনপিকে প্রথমেই স্পষ্ট করতে হবে—সরকারের সমালোচনা, নীতির সমালোচনা, ব্যঙ্গ, কঠিন ভাষার আপত্তি—এসব ‘রাষ্ট্রবিরোধিতা’ না। সরকার যদি সমালোচনাকে গুজবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে, তাহলে সে খুব দ্রুত আগের শাসনের একই পথে যাবে। তাদের কাজ হবে পোস্টের জবাব পোস্টে দেওয়া, গুজবের জবাব তথ্যযাচাই দিয়ে দেওয়া, আর গ্রেপ্তারকে শেষ পন্থা বানানো। এ ছাড়া ডিজিটাল আইনকে স্পষ্ট, সীমিত, এবং অধিকার-সম্মত করতে হবে।
বিরোধী দলগুলোর করণীয়: যে দলই বিরোধীতে থাকুক, তাদের উচিত গুজবকে শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার না করা। আহত অনুভূতি, ধর্মীয় উত্তেজনা, বা রাষ্ট্রবিরোধিতার তকমা দিয়ে জনতা নামানো খুব সহজ; কিন্তু এর শেষ ভালো না। বিরোধী দল যদি মিথ্যা, ভয়, বা সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিত দিয়ে রাজনীতি করে, তাহলে তারা কেবল সরকারকে চাপে ফেলে না; পুরো জনপরিসরকেই বিষাক্ত করে।
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর করণীয়: ধর্মকে আহতবোধ, প্রতিশোধ, বা মবিলাইজেশনের তাৎক্ষণিক হাতিয়ার বানানো বন্ধ করতে হবে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন বাস্তব, কিন্তু সেটিকে যাচাইহীন স্ক্রিনশট বা গুজবের ভিত্তিতে রাজনৈতিক মঞ্চে তুলে দিলে তা খুব দ্রুত সহিংসতায় গড়ায়।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও ছাত্রভিত্তিক দলগুলোর করণীয়: যেসব নতুন দল নিজেদের পরিবর্তনের শক্তি বলে তুলে ধরে, তাদেরও খুব সতর্ক থাকতে হবে। অনলাইন নামধাম ফাঁস করা, দলবেঁধে টার্গেট করা, কাউকে জনতার আদালতে ঠেলে দেওয়া—এগুলো পুরোনো রাজনীতিরই নতুন ডিজিটাল রূপ। নতুন রাজনীতি চাইলে নতুন শাস্তি-সংস্কৃতি নয়, নতুন সহনশীলতা-সংস্কৃতি দরকার।
সব দলের জন্য একসাথে যা দরকার
সব রাজনৈতিক দলের একটি ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার থাকা উচিত:
গুজব ব্যবহার করা যাবে না।
বট-নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যাবে না।
ভুয়া ফটোকার্ড বা কৃত্রিম ভিডিও ব্যবহার করা যাবে না।
সাম্প্রদায়িক গুজবের ওপর রাজনীতি করা যাবে না।
সমালোচনার জবাব পুলিশ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে দিতে হবে।
এখন কী করা জরুরি
প্রথমত, সমালোচনা, ভুল তথ্য, ইচ্ছাকৃত অপতথ্য, ঘৃণা-উসকানি, ব্যঙ্গ, এবং রাজনৈতিক কটূক্তি—এসবকে আলাদা আলাদা করে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। আইন যদি অস্পষ্ট থাকে, তাহলে গুজববিরোধী আইন খুব দ্রুত সমালোচনাবিরোধী আইনে পরিণত হয়। ARTICLE 19, Human Rights Watch, Amnesty—সবাই এই জায়গাতেই জোর দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সব কিছুর জবাব গ্রেপ্তার না। আগে আসবে পাল্টা-বক্তব্য, দ্রুত তথ্যযাচাই, সরকারি ব্যাখ্যা, জবাব দেওয়ার অধিকার, প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট, এবং দেওয়ানি প্রতিকার। ফৌজদারি ব্যবস্থা হবে শেষ উপায়।
তৃতীয়ত, প্ল্যাটফর্ম-জবাবদিহিতা দরকার। ভুয়া ফটোকার্ড, বট-নেটওয়ার্ক, লেবেলবিহীন এআই ভিডিও, আর সাম্প্রদায়িক কনটেন্টের বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা, স্থানীয় ভাষার তদারকি, আর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দরকার। Amnesty-র মিয়ানমার নিয়ে সতর্কতা দেখায়, প্ল্যাটফর্ম দেরি করলে বাস্তব মানুষ মরতে পারে।
চতুর্থত, স্বাধীন তথ্যযাচাই-ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্রকে ‘সত্যের একমাত্র মালিক’ বানালে সমাধান হবে না; বরং নতুন দমন তৈরি হবে। দরকার স্বাধীন গবেষণা, তথ্যযাচাই, সংবাদমাধ্যমের সহযোগিতা, এবং নাগরিক মিডিয়া-সচেতনতা।
শেষ কথা
গুজব কখনো নিরীহ না।
মব-জব কখনো নিরপেক্ষ না।
বট-জব কখনো কেবল প্রযুক্তির খেলা না।
এই তিনটি একসঙ্গে কাজ করলে প্রথম আঘাত পড়ে সত্যের উপর, পরের আঘাত পড়ে বিচারের উপর, আর শেষ আঘাত পড়ে গণতন্ত্রের উপর। তখন সমাজে অবিশ্বাস বাড়ে, মানুষ একে অন্যকে সন্দেহ করতে শেখে, সমালোচনাকে সহজেই ষড়যন্ত্র বলা যায়, আর রাষ্ট্রও ধীরে ধীরে যুক্তির বদলে প্রতিক্রিয়ার যন্ত্রে পরিণত হয়।
সবচেয়ে বড় বিপদ এখানেই: গুজব সত্যকে ম্লান করে, মব-জব ন্যায্য বিচারকে জনতার আবেগের হাতে ছেড়ে দেয়, আর বট-জব এমন এক কৃত্রিম জনমত তৈরি করে, যা দেখে ক্ষমতাও বিভ্রান্ত হয়, জনগণও বিভ্রান্ত হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সবাই। সমাজ হারায় পারস্পরিক আস্থা। বাকস্বাধীনতা হারায় নিরাপদ পরিসর। রাষ্ট্র হারায় নৈতিক বৈধতা। জনগণ হারায় সত্য আলাদা করে বোঝার ক্ষমতা।
এই কারণে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো—সমালোচনার সব পথ খোলা রাখা, কিন্তু গুজব, সংগঠিত উসকানি, আর কৃত্রিম জনমত তৈরির সব কৌশলকে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা। রাষ্ট্র যদি সমালোচনাকে ভয় পায়, তবে তা দুর্বল রাষ্ট্রের লক্ষণ। আবার রাষ্ট্র যদি গুজবকে অবহেলা করে, তবে সেটাও দায়িত্বহীনতার লক্ষণ। কাজেই দরকার একসঙ্গে দুইটি জিনিস: স্বাধীনতা রক্ষা এবং প্রতারণা প্রতিরোধ।কিন্তু এই কাজ করতে হবে আইন দিয়ে, তবে অস্পষ্ট আইন দিয়ে নয়; প্রক্রিয়া দিয়ে, তবে প্রতিশোধমূলক প্রক্রিয়া দিয়ে নয়; তথ্যযাচাই দিয়ে, তবে দলীয় সত্য চাপিয়ে দিয়ে নয়; রাজনৈতিক সংযম দিয়ে, তবে পুলিশি শর্টকাট দিয়ে নয়।কারণ পুলিশি শর্টকাট দ্রুত ফলের ভান দেয়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা শুধু ভয় বাড়ায়, গুজবকে শহীদ বানায়, এবং গণতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র সমালোচনাকে সহ্য করে। একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গুজবকে চিহ্নিত করে।আর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এই দুইয়ের পার্থক্য স্পষ্টভাবে জানে। লেখক: নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়তথ্যসূত্র ১. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ ৩৯: চিন্তা, বিবেক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ২. Human Rights Watch। No Place for Criticism: Bangladesh Crackdown on Social Media Commentary (2018)। ৩. Human Rights Watch। Bangladesh: Protect Freedom of Expression (2018)। ৪. Amnesty International। Bangladesh: Interim Government must restore freedom of expression in Bangladesh and repeal Cyber Security Act (8 August 2024)। ৫. Amnesty International। Bangladesh: Repackaging Repression — The Cyber Security Act and the Continuing Lawfare Against Dissent in Bangladesh (2024)। ৬. Amnesty International। Recommendations to restore freedom of expression in Bangladesh (23 October 2024)। ৭. Freedom House। Bangladesh: Freedom on the Net 2025। ৮. ARTICLE 19। Bangladesh: Digital laws must be transparent and protect free expression (26 February 2025)। ৯. ARTICLE 19। Bangladesh: Defending free expression and electoral integrity in the digital age (18 June 2025)। ১০. Dismislab। A coordinated political bot network on Facebook exposed (29 August 2024)। ১১. Dismislab। Misinformation trends and narratives in Bangladesh’s tumultuous 2024 (21 January 2025)। ১২. Dismislab। Unlabeled AI-generated media floods election campaigns as platforms fail to enforce rules (31 January 2026)। ১৩. Rumor Scanner। Rumor Scanner in 2025: A Year in Review with a Record 4,195 Misinformation Cases (21 January 2026)। ১৪. Rumor Scanner। Framing Women: The Gendered Lens of Disinformation (9 October 2025)। ১৫. The Daily Star / AFP। Fake experts drive disinformation before Bangladesh polls (7 September 2023)। ১৬. The Daily Star। BNP will restore freedom of expression if people give mandate: Tarique (14 November 2024)। ১৭. The Daily Star। Fake ‘haha’ reactions attack political opponents ahead of elections (3 February 2026)। ১৮. Reuters। Tarique Rahman sworn in as Bangladesh’s PM after landslide election victory (17 February 2026)। ১৯. Reuters। U.N. investigators cite Facebook role in Myanmar crisis (12 March 2018)। ২০. Reuters। Why Facebook is losing the war on hate speech in Myanmar (15 August 2018)। ২১. Reuters। When a text can trigger a lynching: WhatsApp struggles with incendiary messages in India (25 June 2018)। ২২. Reuters। WhatsApp curbs message forwarding in bid to deter India lynch mobs (20 July 2018)। ২৩. U.S. Senate Select Committee on Intelligence। Russia’s Use of Social Media (8 October 2019)। ২৪. Superior Electoral Court, Brazil। Brazil’s Electoral Justice Permanent Program on Countering Disinformation: Strategic Plan – 2022 Elections। ২৫. Polleri, Maxime। Towards an anthropology of misinformation (Anthropology Today, 2022)।২৬. Kirsch, Stuart। Rumour and Other Narratives of Political Violence in West Papua (Critique of Anthropology, 2002)।২৭. Bubandt, Nils। Rumors, Pamphlets, and the Politics of Paranoia in Indonesia (Journal of Asian Studies, 2008)।২৮. Das, Veena। Life and Words: Violence and the Descent into the Ordinary (University of California Press, 2007)।২৯. Appadurai, Arjun। Fear of Small Numbers: An Essay on the Geography of Anger (Duke University Press, 2006)।৩০. Trottier, Daniel। Digital Vigilantism as Weaponisation of Visibility (2017)।৩১. Woolley, Samuel C., & Howard, Philip N.। Computational Propaganda: Political Parties, Politicians, and Political Manipulation on Social Media (2018)।৩২. Wardle, Claire, & Derakhshan, Hossein। Information Disorder: Toward an Interdisciplinary Framework for Research and Policy Making (Council of Europe, 2017)।














