সুনীল নিজেই ‘ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি’

পাঠকের বাড়িতে বই পৌঁছে দেন সুনীল কুমার গাঙ্গুলী- আগামীর সময়
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার কুমরিয়া গ্রামের ‘চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার’। আর ১০টা পাঠাগারের মতো নয় এটি। এখানে নেই কোনো চেয়ার-টেবিল, নেই পাঠকের ভিড় কিংবা নির্দিষ্ট পাঠকক্ষ। এই পাঠাগারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, বই নিতে পাঠকদের এখানে আসতে হয় না; বরং বই-ই পৌঁছে যায় পাঠকের ঘরে ঘরে।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সত্তরোর্ধ্ব সুনীল কুমার গাঙ্গুলী নিজেই বইয়ের তালিকা নিয়ে যান পাঠকের দ্বারে দ্বারে। কেউ যে বইটি পড়তে চান, পরদিন সেই বই পৌঁছে দেন তার হাতে। আবার পড়া শেষ হলে নিজেই পাঠকের বাড়ি থেকে ফেরত আনেন বই। বিনিময়ে কোনো নির্ধারিত টাকা নেন না। কেউ স্বেচ্ছায় পাঁচ-দশ টাকা দিলে তা জমিয়ে নতুন বই কেনেন।
স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ‘জ্ঞানের ফেরিওয়ালা’ নামে। সুনীল জানালেন, ছাত্রজীবন থেকেই বই পড়ার প্রবল আগ্রহ ছিল তার। কিন্তু টাকার অভাবে তখন বই কিনে পড়ার সুযোগ হয়নি। সেই কষ্ট থেকেই একটি পাঠাগার গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন।
উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন সুনীল। উপজেলা সদর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২৫ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ২০১৪ সালে অবসরে যাওয়ার পর নিজের বাড়ির পাশে একক উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘চন্দ্রিকা জ্ঞান পাঠাগার’। পেনশনের টাকায় একের পর এক বই কিনে গড়ে তুলেছেন এই সংগ্রহশালা। বইয়ের ধুলোবালি প্রতিদিন পরিষ্কার করেন তিনি।
বর্তমানে পাঠাগারটিতে রয়েছে ছয় শতাধিক বই। আরও বই সংগ্রহ করে পাঠাগার সমৃদ্ধ করার ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না বলে আক্ষেপ তার। পর্যাপ্ত আসবাবের অভাবে অনেক মূল্যবান বই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে।
সুনীল আগে প্রতিদিন ২৫-৩০ জন পাঠকের বাড়িতে গিয়ে তাদের হাতে বই তুলে দিতে পেরেছেন। এখন শরীর কুলায় না। বর্তমানে কাছাকাছি এলাকার পাঁচ থেকে সাতজন পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারছেন বই।
পাঠাগারের নাম পুত্রবধূর নামে রাখার কারণ জানতে চাইলে সুনীল বললেন, ‘আমার মৃত্যুর পরও পরিবার যেন এই পাঠাগারকে আগলে রাখে, সেই চিন্তা থেকেই তার নামে পাঠাগারের নামকরণ করেছি।’
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যেমন গাড়িতে করে বই পৌঁছে দেয়, তেমনি কোটালীপাড়ায় সুনীল কুমার গাঙ্গুলী নিজেই হয়ে উঠেছেন এক ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি। বয়সের ভার নিয়েও তিনি হাসিমুখে পাঠকের কাছে বই পৌঁছে দেন, আবার পড়া শেষে তা নিয়ে আসেন— জানালেন স্থানীয় সাংবাদিক ও বীণাপাণি গ্রন্থাগারের প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত অধিকারী।
জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে সুনীল গাঙ্গুলীর একটাই স্বপ্ন, বইয়ের আলো ছড়িয়ে যাক নতুন প্রজন্মের মধ্যে। মৃত্যুর পরও পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকতে
চান তিনি।






