দরকার ধারা ধরে রাখা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। এই পরিবর্তন শুধু সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের জন্ম দেবে।
সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, দেশের রাজনৈতিক সংকটের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনীয় নিরপেক্ষতা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করতে পারেননি। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে জনগণের আস্থার প্রতীক হওয়ার পরিবর্তে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের প্রতি অতিমাত্রায় অনুকূল অবস্থান নিয়েছেন—এমন ধারণা সমাজের একটি বড় অংশে তৈরি হয়েছিল। এসব বিতর্ক শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি কখনোই কাম্য নয়।
কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল সেই সময় সেনাপ্রধানের দৃঢ়তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংকট মোকাবিলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য দেশবাসীর সাধুবাদ পায়। দলটির দূরদর্শী পদক্ষেপ ও প্রজ্ঞায় পুরো পরিবেশ স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অস্থিরতা যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি কিংবা সংঘাতের দিকে না যায়, সে বিষয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার রাষ্ট্রপতির যে আহ্বান ও দায়িত্বশীল অবস্থান দেখা গেছে, তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর বিএনপি রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করেনি, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা যাতে রক্ষা পায় সেই অনুকূল পরিবেশ বজায় রাখতে কোনো আলটপকা সিদ্ধান্ত নেয়নি। রাষ্ট্রপতির মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখিয়ে গণতান্ত্রিক রীতিনীতিতেও একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখেছে। সাম্প্রতিক সংকট নিরসনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিপক্বতারও কিছু স্বাক্ষর দেখা গেছে। বিশেষ করে বিএনপি প্রতিশোধপরায়ণ রাজনীতির পথ পরিহার করে আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখতে যে সহযোগিতামূলক মনোভাব দেখিয়েছে, তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক। এই সংযম ও দায়িত্বশীলতা প্রশংসার দাবিদার। যদিও হঠাৎ করে পদত্যাগে এবং এর মধ্যে তাড়াহুড়ো দেখতে পেয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ কোনো ব্যক্তির পরাজয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থাকে পুনর্গঠনের একটি সুযোগ। এখন প্রয়োজন এমন একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধানের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তার প্রতিটি সিদ্ধান্তে নিরপেক্ষতা, প্রজ্ঞা ও নৈতিক সাহসের প্রতিফলন থাকতে হবে। মনে রাখা দরকার, রাষ্ট্রপতির পদ দলীয় প্রতিযোগিতার নয়; এটি রাষ্ট্রের ঐক্য, সংবিধানের মর্যাদা এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রতীক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হলে গণতন্ত্রও দুর্বল হয়। তাই ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক বিদায় সেই শিক্ষা আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল। অতীতের বিতর্ক থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি রাজনৈতিক দলগুলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংলাপ ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে দেশে ইতিবাচক গণতান্ত্রিক যাত্রা অব্যাহত থাকবে।




