সমাজ বদলের লড়াইয়ে চা বিক্রেতা

বিভিন্ন দাবিতে ফেস্টুন নিয়ে রাস্তায় দাঁড়ান দেলোয়ার হোসেন দীপটি
হাতে চায়ের ফ্লাক্স নিয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করেন দেলোয়ার হোসেন দীপটি। পথে চোখে পড়ে সমাজের নানা অনিয়ম-অসংগতি, মানুষের অগণিত সমস্যা। মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে কীভাবে পরিবর্তন সম্ভব। ভেবে কূলকিনারা পান না। এই পরিবর্তন তো একার পক্ষে সম্ভব নয়। তা ছাড়া সবার মধ্যে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ততা। কিন্তু তার মনে বদলের ইচ্ছা— কীভাবে এসব অসংগতি দূর করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা যায়। অবশেষে একাই নেমে পড়লেন বদলের লড়াইয়ে।
মুন্সীগঞ্জ শহরের হাটলক্ষ্মীগঞ্জ এলাকার দেলোয়ার (৪০) চা বিক্রির সামান্য আয় থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে তা দিয়ে ব্যানার-ফেস্টুন করেন। এরপর ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে একাই দাঁড়িয়ে যান রাজপথে। তবে পাশে থাকে না কোনো সংগঠন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব কিংবা বড় কোনো পৃষ্ঠপোষক। তবু তার দৃঢ় বিশ্বাস, একজন মানুষের প্রতিবাদ বা সচেতনতার আহ্বানও করতে পারে পরিবর্তনের সূচনা। কখনো মাদকবিরোধী প্রচারণা, কখনো শহর পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান, কখনো সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে অ্যাম্বুলেন্স সেবার দাবি, কখনো রাস্তার ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণ কিংবা পাবলিক টয়লেট নির্মাণের দাবি— প্রায় এক যুগ ধরে একাই জনস্বার্থে এমন নানা দাবি তুলে আসছেন দেলোয়ার।
অবিবাহিত দেলোয়ারের বাবা আবু তালেব পেশায় রিকশাচালক, মা গৃহিণী। সংসারে টানাপড়েন থাকলেও পরিবারের সদস্যরা কখনো দেলোয়ারের এ কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। দেলোয়ারের বাবা-মা মনে করেন, দেলোয়ারের কারণে যদি মানুষের মঙ্গল হয়, হোক।
দেলোয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্পটি একটি বিদ্যালয় ঘিরে। দেলোয়ার বললেন, ‘আমাদের এলাকায় শিক্ষার সুযোগ খুবই কম ছিল। অনেক কিশোর জুয়া আর মাদকে জড়িয়ে পড়ছিল। ছোট ছোট শিশুরা স্কুলে না গিয়ে কাজে যুক্ত হচ্ছিল। তখন মনে হলো, শিক্ষার অভাবই এসব সমস্যার মূল কারণ— এই উপলব্ধি থেকেই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করি।’
প্রথমে এ ব্যাপারে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন। পরে নিজের টাকায় তৈরি করা ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে দিনের পর দিন শহরের বিভিন্ন স্থানে দাঁড়িয়ে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এম ইদ্রিস আলী শহরের কৃষি অফিসে একটি অনুষ্ঠানে এলে তার পথরোধ করে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান দেলোয়ার। তার সেই দৃঢ় অবস্থান এবং ধারাবাহিক আন্দোলনের পর স্থানীয় অনেকেই এগিয়ে আসেন। অবশেষে ২০১০ সালে হাটলক্ষ্মীগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দেলোয়ারের ভাষ্য, ‘স্কুল করার দাবি তুলে অনেক কটূক্তি শুনেছি, হুমকিও পেয়েছি। অনেকে বলেছে, এসব করে কোনো লাভ হবে না। কিন্তু আজ যখন দেখি সেই স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে ভালো করছে, তখন মনে হয় আমার কষ্ট সার্থক হয়েছে।’
‘সব দাবি বাস্তবায়ন হয় না। অনেক সময় কেউ গুরুত্বও দেয় না। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, মানুষের ভালোর জন্য কথা বলা কখনো বন্ধ করা উচিত নয়। কারণ, একজন না বললে আরেকজনও বলবে না’— যোগ করেন তিনি।
হাটলক্ষ্মীগঞ্জ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্বরত পঞ্চায়েত কমিটির প্রতিনিধি তাউজুল ইসলাম বাদশা বলছিলেন, দেলোয়ার খুব সাধারণ মানুষ হলেও, ভালো কাজে সবসময় ওর প্রচেষ্টা থাকে। শুধু আমাদের এলাকার স্কুলটি করার ক্ষেত্রেই নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তনে ওকে কাজ করতে দেখি, যা সচরাচর একজন চা বিক্রেতাকে দেখা যায় না।




