শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও বর্তমান বাস্তবতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করে সংগঠিত ছাত্র আন্দোলন সমাপ্ত হয়েছে। তবে আন্দোলনের রেশ ও এর ফলে সৃষ্ট বহুমুখী অভিঘাত এখনো পুরোপুরি কেটে যায়নি। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ও শিখন ঘাটতি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য উদ্বেগ যেমন দৃশ্যমান ছিল; অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক অস্থিরতা ও বহিরাগত শক্তির প্রভাব নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানান বিতর্ক। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ সবসময়ই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা বাংলা রক্ষার লড়াই ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রথম ধাপ। ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ও ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে ছাত্রসমাজ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে ছাত্রদের রক্ত ও আত্মত্যাগ আইয়ুব খানের সামরিক স্বৈরাচারের পতন ঘটায় এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনসাধারণের সঙ্গে শিক্ষার্থীরা সরাসরি অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৯০ সালের এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
অতীত ইতিহাসের মতো ছাত্র আন্দোলন হতে হবে সুসংবদ্ধ, অনভিপ্রেত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী
পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, অন্যায্য নীতি বা সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর কতটা শক্তিশালী হতে পারে।
ইতিহাসের আলোকে বিবেচনা করলে যেকোনো ন্যায্য দাবির পক্ষে শিক্ষার্থীদের সোচ্চার হওয়া একটি মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে
দেশের দূরদূরান্তের শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তির কথা চিন্তা করে এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়া কিংবা নতুন শিক্ষাক্রমের শিখন ঘাটতি পূরণের দাবি তোলা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও শিক্ষার্থীবান্ধব চিন্তারই প্রতিফলন ছিল। নীতিনির্ধারকরা যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনভিত্তিক সমস্যাগুলো এড়িয়ে যান, তখন রাজপথই দাবি আদায়ের একমাত্র বিকল্প মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
তবে সদ্য সমাপ্ত এই আন্দোলনের কিছু উদ্বেগজনক দিকও সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। আন্দোলনের প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে যখন কোনো নির্দিষ্ট স্বার্থান্বেষী মহল বা রাজনৈতিক পক্ষ নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করে, তখন আন্দোলনের মূল চরিত্র ক্ষুণ্ন হয়। টানা রাজপথ অবরোধ, পরীক্ষা স্থগিত বা প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থার কারণে চূড়ান্ত বিচারে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনই সেশনজট ও দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের আবেগকে পুঁজি করে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করা কখনোই শিক্ষার সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের সংগ্রাম তখনই চূড়ান্ত সার্থকতা পায়, যখন তা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে একধরনের ইতিবাচক সংস্কারের তাগিদ তৈরি করে। কিন্তু রাজপথের চরম অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের স্বস্তি বিঘ্নিত হয়, যা জনমনে এক প্রকার নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আন্দোলন যেন কখনোই জনভোগান্তির সমার্থক হয়ে না ওঠে, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা নেতৃত্বের অন্যতম বড় দায়িত্ব। এ ছাড়া শিক্ষাঙ্গনের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখতে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির কাঠামোগত সংস্কার সাধন এখন সময়ের দাবি। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যৌক্তিক আলোচনা ও পরমত-সহিষ্ণুতাই হলো সংকটের স্থায়ী সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের প্রয়োজন যেমন রয়েছে, তেমনি আন্দোলন পরিচালনার গঠনমূলক কৌশলও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীত ইতিহাসের মতো ছাত্র আন্দোলন হতে হবে সুসংবদ্ধ, অনভিপ্রেত রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষাকারী।
রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়াকে শুধু আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে না দেখে শিক্ষাগত সংকট হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া এবং দ্রুত ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সমাধানে আসা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদেরও আন্দোলনের ক্ষেত্রে রাজপথ স্তব্ধ করার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক পথ ও কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানে জোর দিতে হবে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী, চট্টগ্রাম




