প্রশ্নফাঁসে উত্থান প্রশ্নফাঁসেই পতন
- ১৯৯৭ সালে সিএইচএসইয়ের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে নেতৃত্ব
- ২০২৬ সালে মেডিকেল ভর্তির প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ছাড়লেন মন্ত্রিত্ব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় তিন দশক আগের ঘটনা। ভারতের ওড়িশায় ভুবনেশ্বর রাজ্যের সচিবালয়ের সামনে উত্তাল ছাত্রসমাবেশ। অভিযোগ— দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। হাতে ব্যানার, মুখে স্লোগান। প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীর সেই বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলেন এক তরুণ ছাত্রনেতা। পুলিশের লাঠিপেটায় গুরুতর আহত হয়েও তিনি পিছু হটেননি তিনি। সেই তরুণের নাম ধর্মেন্দ্র প্রধান।
সময় ঘুরে প্রায় ৩০ বছর পর ইতিহাস যেন অন্য রূপে ফিরে এলো। এবার তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি ২০২৬ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে টানা আন্দোলনের মুখে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন সেই ধর্মেন্দ্র প্রধান— যিনি একসময় একই ইস্যুতে রাস্তায় নেমেছিলেন।
১৯৯৭ সালে ওড়িশার কাউন্সিল অব হায়ার সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিএইচএসই) পরিচালিত ‘প্লাস টু’ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে রাজ্য জুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল। তৎকালীন কংগ্রেস সরকারে শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন ভগবত প্রসাদ মহান্তি। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকি বল্লভ পাটনায়েক।
সে সময় তিনি আরএসএসের ছাত্রসংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) জাতীয় সম্পাদক হিসেবে ছাত্ররাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটছিল ধর্মেন্দ্র প্রধানের। প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে তিনি ভুবনেশ্বরের ইউনিট-৫ এলাকায় রাজ্য সচিবালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন।
এ ঘটনার পর তৎকালীন রাজ্য সরকার ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে গঠন করা হয় একটি কমিটি এবং সিএইচএসইর চেয়ারম্যান, সচিবসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ওই আন্দোলনই ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই ইতিহাস যেন উল্টো পথে হাঁটল। গত ৫ মে অনুষ্ঠিত নিট-ইউজি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর থেকেই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জোরালো হতে থাকে। সিবিএসইর অন-স্ক্রিন মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
গত ২০ জুন থেকে দিল্লির যন্তর-মন্তরে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর গতকাল শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত হিন্দি ভাষার পদত্যাগপত্রে তিনি বলেছেন, নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার দায় শুরু থেকেই তিনি নিজের কাঁধে নিয়েছেন। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেশের তরুণদের বিভ্রান্তির মধ্যে রাখতে চান না বলেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তিনি লেখেন, দেশের তরুণদের স্বপ্ন, আশা ও ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই তার রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের নৈতিক অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে দেশসেবার সুযোগ পাওয়ার জন্যও তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন।
এর আগে সরকার নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের তদন্তভার সিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করে, মূল পরীক্ষা বাতিল করে আবার পরীক্ষা নেয় এবং ভবিষ্যতে নিট-ইউজি পরীক্ষা সম্পূর্ণ কম্পিউটারভিত্তিক (সিবিটি) পদ্ধতিতে আয়োজনের ঘোষণা দেয়। গত ১৬ জুলাই প্রকাশিত পুনঃপরীক্ষার ফলকে সন্তোষজনক বলে উল্লেখ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের গল্পটা শুরু হয়েছিল ওড়িশার শিল্পাঞ্চল তালচের থেকে। ১৯৬৯ সালের ২৬ জুন সেখানেই তার জন্ম। বাবা দেবেন্দ্র প্রধান ছিলেন বিজেপির প্রভাবশালী নেতা এবং পরে অটল বিহারি বাজপেয়ি সরকারের মন্ত্রী। তাই অনেকেই ধরে নেন, ছেলের রাজনৈতিক উত্থানের পথ বুঝি আগেই তৈরি ছিল। কিন্তু ওড়িশার রাজনৈতিক মহলে দীর্ঘদিন ধরেই আরেকটি ব্যাখ্যা বেশি প্রচলিত— ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সামনে এনে পরে তার বাবাকেও বিজেপিতে টেনে আনে আরএসএসের সাংগঠনিক বলয়।
তালচের কলেজে নৃবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সময় আশির দশকের মাঝামাঝি তিনি এবিভিপিতে যোগ দেন। তখনো তিনি জাতীয় রাজনীতির পরিচিত মুখ নন; বরং চশমা পরা, একটু চুপচাপ স্বভাবের এক ছাত্রনেতা। পরে ভুবনেশ্বরের উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর পড়তে গিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের জীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল আরএসএস। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি শাখায় যাওয়া শুরু করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক রুবেন ব্যানার্জির মতে, আরএসএসের নেতারাই পরে দেবেন্দ্র প্রধানকে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ প্রচলিত ধারণার উল্টো—বাবার প্রভাবে ছেলে নয়; বরং ছেলের আরএসএস-সংযোগই বাবার রাজনৈতিক পথ বদলে দিয়েছিল।
১৯৯৩ সালে এবিভিপির ওড়িশা রাজ্য সম্পাদক হওয়ার মাত্র দুই বছরের মধ্যে সংগঠনটির জাতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পান তিনি। ছাত্ররাজনীতির মঞ্চেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের সাংগঠনিক দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করে।
১৯৯৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০০০ সালে ওড়িশা বিধানসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিজেপি যুবমোর্চার ওড়িশা সভাপতি, ২০০২ সালে বিজেপির জাতীয় সম্পাদক, আর ২০০৪ সালে প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় জনতা যুবমোর্চার জাতীয় সভাপতির দায়িত্ব পান।
এদিকে, সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে তাদের আন্দোলনের প্রথম বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পরই তাৎক্ষণিকভাবে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন তারা। গতকাল সন্ধ্যায় নয়াদিল্লিতে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সিজেপির নেতারা এ ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কার পাশে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। সিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারের আশ্বাসের প্রতি ‘সদিচ্ছার’ ভিত্তিতে তারা আন্দোলন স্থগিত করছেন।




