ইভিএম প্রকল্প
রাষ্ট্রের ক্ষতি কয়েক হাজার কোটি, তদন্তে দুদক

আগামীর গ্রাফিক্স
বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থা আধুনিক করার লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) চালু করা হলেও এই প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কয়েক হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের যন্ত্রের মান, অতিরিক্ত ব্যয় ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, নির্বাচনে কারচুপি ও পরিকল্পিত অপব্যবহারের হাতিয়ার হিসেবে ইভিএম কেনা হয়েছিল।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকায় কেনা দেড় লাখ ইভিএম ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ কেনার অনিয়মের কারণে অডিট আপত্তি আছে। দেড় লাখ মেশিনের মধ্যে এখন ব্যবহারযোগ্য আছে মাত্র কয়েক হাজার।
২০১০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের জন্য ইভিএম ক্রয় করেন ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন। ২০১১ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তৈরি ইভিএমের প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল।
২০১৩ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একটি কেন্দ্রে ফলাফল দেওয়া যায়নি। পরে ইভিএম ব্যবহার থেকে সরে আসে তৎকালীন কমিশন। তবে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোটে বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০১৭ সালে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি ওয়ার্ডের ছয়টি কক্ষে পরীক্ষামূলকভাবে ইভিএমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
ইভিএম চালুর শুরু থেকেই বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ইভিএমকে আধুনিক ও স্বচ্ছ ভোটগ্রহণের উপায় হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী দলগুলো শুরু থেকেই এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলের মধ্যে ইভিএম নিয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাস কাজ করেছে। দেশের সুশীল সমাজ, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করেই ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে দেড় লাখ ইভিএম কিনতে ৩ হাজার ৮২৫ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এই ইভিএমগুলো কোথায় সংরক্ষিত থাকবে, প্রকল্পে তা উল্লেখ ছিল না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তুলনামূলক কম খরচে আরও উন্নতমানের প্রযুক্তি পাওয়া সম্ভব হলেও বাস্তবে তা হয়নি। এতে রাষ্ট্রের তিন হাজার কোটি টাকার বেশি অপচয় হয়েছে বলে ধারণা করছেন তারা।
দাম, মান ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
দরপত্র ছাড়াই ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করে একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ইভিএম কেনা হয়। প্রতিটি মেশিনের দাম নির্ধারণ করা হয় দুই লাখ ৩৪ হাজার ৩৭৩ টাকা, যা বাজার দরের চেয়ে ১০ গুণ বেশি বলে দাবি করছে সরকারের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তর।
এই দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ইভিএম কিনতে ৩৪৩ কোটি টাকার মতো খরচ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অতিরিক্ত তিন হাজার ১৭২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত দামে কেনা এই মেশিনগুলোর ওয়ারেন্টি ছিল মাত্র এক বছর। ওয়ারেন্টি শেষ হওয়ার পর মেশিন সচল রাখার জন্য প্রকল্পে টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
সাম্প্রতিক কিছু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংরক্ষিত ইভিএমগুলোর একটি বড় অংশ ত্রুটিপূর্ণ বা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। মাত্র কয়েক হাজার মেশিন ব্যবহারযোগ্য আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, যন্ত্রগুলোর আয়ু ধরা হয়েছিল প্রায় ১০ বছর। কিন্তু এক বছর না যেতেই নানা ধরনের ত্রুটি ধরা পড়তে থাকে।
প্রযুক্তিবিদদের মতে, নিম্নমানের মেশিন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়া এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ ও তদন্ত
নিম্নমানের মেশিন কিনে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের অভিযোগে তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থাটি যন্ত্রের মান, ক্রয় প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়েও অনিয়ম হয়েছে।
দুদক জানায়, কম্পিউটার বিজ্ঞানের শিক্ষক জাফর ইকবাল ও অন্য বিশেষজ্ঞরা কেন আগে ইভিএমকে ভোটের জন্য যথাযথ মনে করেছিলেন, সেটি এখন খতিয়ে দেখা হবে।
অভিযোগ আছে, মেশিন কেনার ক্ষেত্রে ক্রয় প্রক্রিয়াতেও অস্বচ্ছতা ছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের বৃহৎ প্রযুক্তিগত প্রকল্পে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। কিন্তু দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি পদ্ধতিতে ইভিএম ক্রয় করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততা
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের ক্ষমতাধর ব্যক্তি, নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, জাতীয় পরিচয়পত্র অনুবিভাগের তৎকালীন মহাপরিচালক মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুলতানুজ্জামান মুহাম্মদ সালেহ উদ্দিন, নির্বাচন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এবং নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এই প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
এছাড়া নির্বাচন কমিশনের কয়েকজন আইটি কর্মকর্তা সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এর মধ্যে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর তারিক সিদ্দিক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। আর হেলালুদ্দীন কারাগারে আছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেনাকাটায় প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার অভিযোগ সত্য হলে এটি কোনো সাধারণ দুর্নীতির ঘটনা নয়। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ব্যবহার করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই অর্থনৈতিক দুর্নীতি করা হয়েছে। এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তর ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে এক ধরনের বোঝাপোড়া ছিল।
ইভিএম অপব্যবহারের হাতিয়ার
২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তা বেশি ব্যবহার হয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। মূলত ভোট কারচুপির হাতিয়ার হিসেবে এই মেশিন ব্যবহার করা হয়।
অভিযোগ আছে, ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রার্থী ইশরাক হোসেনকে ইভিএম কারচুপির মাধ্যমে হারিয়ে দেওয়া হয়। চট্টগ্রামসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও ‘কারসাজির’ অভিযোগ আছে।
এছাড়া কোন কোন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে, সেই নীতিমালাও তৈরি করেনি তখনকার সরকার। অভিযোগ আছে, বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে কোন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে, আর কোন নির্বাচনে ব্যালটে ভোটগ্রহণ হবে তা নির্ধারণ করা হতো। এ ধরনের কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ইভিএমের জালিয়াতি আরও স্পষ্ট হয়।
অপরাধীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হওয়ার পর দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে এই প্রকল্পে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি উঠেছে। ক্ষমতার প্রভাব, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রশাসনিক অবস্থান—কোনো কিছুই যেন বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে না পারে, সেই বক্তব্য জোরালো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের ‘মেগা দুর্নীতির’ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে বড় আকারে একই ধরনের অনিয়ম ঘটার ঝুঁকি থেকে যাবে। তাই ইভিএম প্রকল্পে লুটপাটকারীদের মুখোশ উন্মোচন ও সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত বলে মনে করছেন তারা।
ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত
ইভিএম চালুর মাধ্যমে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রযুক্তিনির্ভর করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা এখন নানা প্রশ্নের মুখে। এই পদ্ধতির ওপর আস্থাহীনতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব থেকেই কাগজের ব্যালটে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখনো পর্যন্ত ব্যালট পেপারে নির্বাচনকে সবচেয়ে স্বচ্ছ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।














