এবার ছেলে লিখেছেন অড্রে হেপবার্নের জীবনী

সংগৃহীত ছবি
গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের হলিউড নায়িকা অড্রে হেপবার্নকে কেই-বা না চেনে। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের সিনেমাপ্রেমীর কাছেই পরিচিত এক সিনে-নক্ষত্রের নাম অড্রে হেপবার্ন।
‘রোমান হলি-ডে’, 'ব্রেকফাস্ট অ্যাাট টিফনি'স’, ‘ফানি ফেইস', 'মাই ফেইরি লেডি’-এর মতো দর্শক প্রিয় সিনেমার জন্য খ্যাতি পেয়েছেন এই তারকা।
কেবল সাধারণ দর্শকের ভালোবাসাই নয়, তিনি সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন প্রচুর।
ডকুমেন্ট, অনলাইন কন্টেন্টের সঙ্গে সঙ্গে তার জীবনকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে অনেক বায়োগ্রাফিও। ৯ এপ্রিল প্রকাশ হবে অড্রে হেপবার্নকে নিয়ে লেখা আরেকটি বায়োগ্রাফি। তবে এবারের দৃশ্যপট অনেকটাই আলাদা। এই বেলা মায়ের জীবন কাহিনী লিখতে কলম হাতে তুলে নিয়েছেন হেপবার্নের বড় সন্তান শন হেপবার্ন। তার সাথে যুক্ত হয়েছেন জনপ্রিয় লেখিকা ওয়েন্ডি হোল্ডেন।
ছেলে শন হেপবার্নের মতে, আমার মায়ের জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেশ কাছে থেকে অনুধাবন করেছেন, তেমনি যুদ্ধ থেকে কোনো অর্থেই কম নয় আমার মায়ের ব্যক্তিগত জীবনের কাহিনীও।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ চলাকালে হেপবার্ন ১৪ বছরের কিশোরী। অড্রের স্বপ্ন ছিল একজন বিশ্ববিখ্যাত ব্যালেরিনা হবেন। কিন্তু অড্রে এও জানতেন যে, তিনি একজন প্রিমা ব্যালেরিনা হওয়ার স্বপ্ন কখনোই পূরণ করতে পারবেন না। শুরুতে লন্ডনে নৃত্যশিল্পী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। সেই সাথে ব্রিটিশ চলচ্চিত্রে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতে শুরু করেন এই তারকা।
যখন ইন্সটাগ্রামের অস্তিত্বও ছিল না, আমার মা সেই যুগেই ছিলেন একজন ইন্সটা-কুইন। একেকটা ভালো ছবি তুলতে তখন যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হতো, তা দিয়ে বর্তমানে একটি মডারেট মানের ফোন কিনে ফেলা যাবে।
খুব অল্প বয়সেই তারকাখ্যাতি তাকে হাতছানি দেয়। মন্টে কার্লোতে একটি চলচ্চিত্রের শুটিং চলাকালে একদিন সমুদ্র সৈকতে তাকে দেখতে পান বিখ্যাত লেখিকা-কোলেট । বিশেষ উপন্যাস থেকে অনুদ্রিত একটি মঞ্চ নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তাকে চুক্তিবদ্ধ করেন লেখিকা। সেই থেকেই অড্রের জীবনে জগতের লাইম লাইট নিজের দিকে ধরে রাখার শুরু। অড্রের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই আলো একটুও ফিকে হয়নি ।
তারপর রূপকথার মুহূর্তের মতো কেটেছে সিনেমা জগতে তার আধিপত্য। প্রথম সবচেয়ে বড় মোড়টি আসে যখন হেপবার্ন ‘রোমান হলিডে' চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। এটিই ছিল তার প্রথম হলিউড চলচ্চিত্র। এই সিনেমায় প্রধান নারী চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি সেরা অভিনেত্রীর অস্কার জেতেন। এর কিছুদিন পরেই, ‘ওনডিন’ নাটকের জন্য তিনি সেরা প্রধান অভিনেত্রী হিসেবে 'টনি' পুরস্কার লাভ করেন।
মাত্র ২৪ বছর বয়সেই জন্ম হয় নতুন এক তারকার।
অড্রে খুব অল্প কয়েকজন মানুষের মধ্যে একজন, যিনি বহু আকাঙ্ক্ষিত ‘ইগট’ মর্যাদা অর্জন করেছেন। এই পুরষ্কার পাওয়ার অর্থ হলো, একজন অভিনেতা তার জীবনে একটি অ্যামি, একটি গ্র্যামি, একটি অস্কার এবং একটি টনি পুরস্কার, এই চারটি পুরষ্কারই জয় করেছেন। এরকম উদাহরণ হলিউড তথা গোটা সিনেমা জগতে মোটামোটি বিরল এক ঘটনা।
ব্যক্তি অড্রে হেপবার্ন মানুষের কাছে একজন তারকা, একজন দুর্দান্ত অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিত হলেও জীবনের নানা সময়ে করেছেন চ্যারিটির কাজও। সেজন্য পেয়েছেন প্রেসিডেন্ট মেডেল। গত শতকের আশির দশকে তিনি কাজ করেছেন ইউনিসেফের শুভেচ্ছা-দূত হয়ে। ইউনিসেফের সাথে গেছেন ইথিওপিয়া, ভিয়েতনামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। কাজ করেছেন সুবিধাবঞ্চিত বাচ্চাদের জন্য। কেবল কোনো প্রতিষ্ঠানের হয়ে নয়, ব্যক্তি অড্রে হেপবার্নের নামে এখনও চালু আছে চ্যারিটি। সেই চ্যারিটির সব কাজ আর অর্থ-বণ্টন তার ছেলে শন হেপবার্ন দেখাশোনা করেন।
শন, দ্যা গার্ডিয়ানকে তার মায়ের ব্যাপারে তার অনুভুতি ব্যক্ত করেন। তার ভাষ্য, আমার মায়ের জীবন-দর্শন ছিল অনেক আলাদা।
সম্পূর্ণ নতুন কেনা ফেরারি গাড়ির নতুন কোনো এডিশনের সাথে শন তুলনা করেন তার মাকে।
একটি ফেরারি কেনার আগে আপনাকে যেমন একজন দক্ষ চালক হতে হবে, তেমনি ঐ নতুন এডিশনটির ব্যাপারে থাকতে হবে আপনার পূর্ণ ধারণাও। নইলে নিঃসন্দেহে চালানোর সময় আপনি অ্যাকসিডেন্ট করবেন। আমার মাও মানুষ হিসেবে ছিলেন ঠিক এই ধরনের। অনন্য।
আপনি তার বিষয়ে আগে থেকে না জানলে প্রস্তুতি ছাড়া তাকে বুঝতে পারা আপনার জন্য কঠিন হবে, বলে জানান শন হেপবার্ন।
আমার মায়ের শেষকৃত্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৩০ হাজারে দাঁড়ায়। রাস্তার চারপাশে গাড়ির লাইন। সবাই বিভিন্ন জায়গা থেকে খোঁজ নিয়ে মায়ের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করতে এসেছেন। সেদিনের দৃশ্য এখনো আমার মনে আছে
গত শতাব্দীর আশি নব্বইয়ের দশকে অড্রের জনপ্রিয়তার সব সীমা পার হয়। বিশাল বিল-বোর্ড আর দেয়াল-পোস্টার থেকে শুরু করে চাবির রিং,বইয়ের কভার, রান্নার কুকার, টি-শার্ট সবকিছুতেই ছিল অড্রে হেপবার্নের ছবি।
তার ছেলে শনের মতে, যখন ইন্সটাগ্রামের অস্তিত্বও ছিল না, আমার মা সেই যুগেই ছিলেন একজন ইন্সটা-কুইন। একেকটা ভালো ছবি তুলতে তখন যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হতো, তা দিয়ে বর্তমানে একটি মডারেট মানের ফোন কিনে ফেলা যাবে।
নিজের মায়ের জনপ্রিয়তার প্রাচুর্য ছোট থেকেই দেখে আসছেন শন । এখনও তা ফিকে হয়নি। যদিও তাদের ব্যক্তি-জীবন ছিল আর পাঁচ শিশুর মতই সাদামাটা, স্বাভাবিক। হেপবার্ন নিজে ব্যক্তিজীবন আর সন্তানদেরকে সিনেমা জগতের জমকালো আলো থেকে দূরে রাখতেন।
মায়ের শেষকৃত্যের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে গিয়ে শন হেপবার্ন জানান, আমরা সুইজারল্যান্ডের জেনেভার একটি ছোট সাবআর্বে থাকতাম। সাকুল্যে ৪০০ মানুষের বাস ছিল সেখানে। আমার মায়ের শেষকৃত্যে এই সংখ্যা বেড়ে ৩০ হাজারে দাঁড়ায়। রাস্তার চারপাশে গাড়ির লাইন। সবাই বিভিন্ন জায়গা থেকে খোঁজ নিয়ে আমার মায়ের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করতে এসেছেন। সেদিনের দৃশ্য এখনো আমার মনে আছে। যেন একটি জনপ্রিয় মিউজিক কনসার্ট চলছে। ছোট্ট এই গ্রামে চারদিকে গিজগিজ করছে হাজার হাজার মানুষ। মানুষ আমার মাকে এতোটাই ভালোবাসতো।
তিনি আরও জানান, আমার বাচ্চারা যখন ছোট ছিল, মায়ের জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে আমরা একটা খেলা খেলতাম। রাস্তায় বের হলে, কিংবা রেলগাড়ির জংশনে আমরা উপভোগ করতাম এই খেলাটি। আমরা একজন অন্যজনের হাতে সময় বেধে দিতাম। 'তোমার হাতে তিন মিনিট সময় আছে, তার ভেতরই তোমাদের দাদির ছবি খুঁজে বেড় করতে হবে।' এবং স্বাভাবিকভাবেই বেধে দেয়া সময়ের আগেই আমার সন্তানরা তাদের দাদির ছবি খুঁজে বের করতে পারত।
শনের ভাষ্য, আমি আর আমার বর্তমান স্ত্রী এখনও এই গেইম মাঝেমধ্যে খেলি। দূরে থাকলে যাত্রা পথ থেকে মায়ের ছবি তুলে একজন অন্যজনকে পাঠাই।
দ্যা গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত















