অন্তর্বর্তী সরকারের ‘ছাড়’ কি শেষ হলো
- কারাগারে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন

ফাইল ছবি
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দীর্ঘ ২০ মাস লোকচক্ষুর আড়ালেই ছিলেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তবে তার এই দীর্ঘ সময় মুক্ত থাকা এবং রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গ্রেপ্তার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানামুখী বিচার-বিশ্লেষণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করছেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার না করাটা ছিল একটি বিশেষ কৌশলের অংশ। সেই সময় গুঞ্জন উঠে, আওয়ামী লীগের একটি অংশকে ‘রিফাইনড’ বা পরিমার্জিত করে মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছিল। মার্জিত ভাবমূর্তি এবং বিতর্কহীন ভূমিকার কারণে সেই তালিকায় ওপরের দিকেই ছিলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ আলোচনায় আরও ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী, ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সোহেল তাজের নামও।
তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি অংশ মনে করেছিল— ড. শিরীন শারমিনের মতো ব্যক্তিত্বকে বাইরে রেখে আওয়ামী লীগের চরমপন্থী অংশ থেকে সাধারণ নেতাকর্মীদের আলাদা করা সম্ভব হবে। একইসঙ্গে পতিত আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য দেশি-বিদেশি নানামুখী চাপও সহনীয় হবে। মূলত এই ‘রিফাইনড আওয়ামী লীগ’ তত্ত্বের কারণেই তাকে সে সময় কোনো ধরনের হয়রানি বা গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হতে হয়নি।
৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন সংসদ ভবনের কোনো এক কক্ষে আত্মগোপনে ছিলেন স্পিকার শিরীন শারমিন। সেখান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে চলে গেলেও প্রশাসনের নজরদারির মধ্যেই ছিলেন সাবেক এই স্পিকার।
আওয়ামী লীগ সরকার পতনের দিন সকাল থেকে রাত আড়াইটা পর্যন্ত স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকসহ ১২ জন জাতীয় সংসদ ভবনের একটা কক্ষে পালিয়ে ছিলেন—গত বছর ২৩ এপ্রিল ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানি চলাকালে স্বীকার করেন পলক নিজেই। পরে সেনাবাহিনী তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায় বলেও আদালতে তথ্য দিয়েছিলেন পলক।
এদিকে, পরবর্তী সংসদের আনুষ্ঠানিকতায় তার গুরুত্ব বিবেচনায় আড়াল হলেও চোখে চোখে রাখা হয় স্পিকার শিরীন শারমিনকে। এছাড়া আড়ালে-আবডালে তাকে দিয়ে রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ গঠনের কথাও চাউর হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর বেশিদূর এগোয়নি। ফলে হাল ছেড়ে দেয় তৎকালীন অরাজনৈতিক সরকার। এরই মধ্যে সরকারও গঠন হয়ে গেছে। সংসদও চলছে নিয়মিত। এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ফলে তার গ্রেপ্তারের খবরটি সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর স্পিকারের পদ থেকে পদত্যাগ করার পরও তার বিরুদ্ধে রংপুরে হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলা হয়েছিল। তবে তিনি অনেক নেতার মতো দেশত্যাগ করেননি অথবা করতে পারেননি। আড়াল হলেও তার অবস্থান ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নখদর্পণে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এখনকার সরকার হয়তো সেই ‘নরমপন্থা’ অবস্থান থেকে সরে এসেছে। তার অংশ হিসেবেই গ্রেপ্তার করা হয় সাবেক এই স্পিকারকে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের রাজনৈতিক ‘আপস’ বা ‘প্রক্রিয়া’ যে আর কাজ করছে না, শিরীন শারমিনের গ্রেপ্তার তারই ইঙ্গিত দেয়। আর আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের যে প্রক্রিয়ার কথা একসময় শোনা যেত, তা বর্তমান প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব হারিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। ফলে আপাতত এ দলের বিষয়ে সরকার হার্ড লাইনে রয়েছে বলেই অনুমান করা যায়।
ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী নবম সংসদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে তার সংসদীয় কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। এমপি থাকাকালীন তিনি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন। ২০১৩ সালে তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদকে রাষ্ট্রপতি করা হলে স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পান শিরীন শারমিন। পৈতৃক বাড়ি নোয়াখালী। আর শ্বশুর বাড়ি কিশোরগঞ্জ। কিন্তু পরের সংসদে রংপুর থেকে মনোনয়ন দিয়ে সরাসরি এমপি নির্বাচিত করে আনা হয়। এরপর টানা এ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর ২৭ দিনের মাথায় ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করেন সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন। সে পদত্যাগপত্র কোথা থেকে এসেছে সেটি নিয়েও সে সময় উঠেছিল প্রশ্ন।














