ইতালির পথে ব্রিটেনেও কি বোরকা নিষিদ্ধ হবে?

সংগৃহীত ছবি
ইতালির স্কুলে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনার পর যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের বিধিনিষেধ আনা উচিত কি না, তা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। এ বিষয়ে পাঠকদের মতামত জানতে জরিপ চালু করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ডেইলি এক্সপ্রেস। তবে যুক্তরাজ্যে বোরকা বা নিকাব পরার ওপর সাধারণ নিষেধাজ্ঞা আনার কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেই।
স্কুলে বোরকা ও নিকাবের মতো পূর্ণ মুখঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা করছে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার। পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করারও পরিকল্পনা রয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
মেলোনি ২০ সেপ্টেম্বর তার দল ব্রাদার্স অব ইতালির যুব সংগঠনের এক অনুষ্ঠানে এসব পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, স্কুলে পূর্ণ মুখঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা সীমিত করতে একটি আইন করা হবে। তবে প্রতি শ্রেণিতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সংখ্যা কত হবে, তা তিনি জানাননি।
ইতালির প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিদেশি শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের জন্যও নতুন নিয়ম থাকতে পারে। যেসব বিদেশি শিক্ষার্থী ইতালির শিক্ষা ব্যবস্থায় মানিয়ে নিতে গুরুতর সমস্যায় পড়বে, তাদের অভিভাবকদের ইতালীয় ভাষা শেখার প্রয়োজন হতে পারে। এসব পদক্ষেপকে শিক্ষা ও সামাজিক একীভূতকরণের সঙ্গে যুক্ত করেছেন মেলোনি।
ইতালিতে বর্তমানে দেশটির নাগরিক নয় এমন শিক্ষার্থীর সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর ১১ দশমিক ৬ শতাংশ। তবে নতুন প্রস্তাবে শ্রেণিকক্ষে বিদেশি শিক্ষার্থীর সর্বোচ্চ সংখ্যা কত হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সীমা এখনো জানানো হয়নি।
সাধারণত পুরো শরীর ও মুখ ঢেকে রাখে বোরকা। নিকাবে মুখ ঢাকা থাকে, তবে চোখ দেখা যায়। অন্যদিকে হিজাবে মাথা ও চুল ঢাকা হলেও মুখ খোলা থাকে। ইতালির প্রস্তাবিত বিধিনিষেধ বোরকা ও নিকাবের মতো পূর্ণ মুখঢাকা পোশাককে কেন্দ্র করে।
তবে ইতালির এই পরিকল্পনা এখনো আইনে পরিণত হয়নি। সরকারকে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য নিতে হবে এবং এরপর দেশটির সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ইতালির ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যে বোরকা ও নিকাব নিয়ে পুরোনো বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে। ডেইলি এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বর্তমানে জনসমক্ষে বোরকা বা নিকাব পরার ওপর কোনো সাধারণ নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পছন্দের মতো বিষয়কে ঘিরে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পক্ষে থাকা ব্যক্তিরা যুক্তি দেন, পূর্ণ মুখঢাকা পোশাক থাকলে পরিচয় যাচাই ও সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে স্কুল, নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থান এবং পরিচয় নিশ্চিত করার প্রয়োজন হয় এমন পরিস্থিতিতে মুখ দৃশ্যমান থাকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা।
অন্যদিকে নিষেধাজ্ঞার বিরোধীরা মনে করেন, মানুষ কী পোশাক পরবেন, তা ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার বিষয়। ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে কোনো নারী বোরকা বা নিকাব পরলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা তার ব্যক্তিগত পছন্দ ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে বলেও তাদের যুক্তি।
বিষয়টি ব্রিটিশ রাজনীতিতেও আলোচিত হয়েছে। ডেইলি এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর আগে জনসমক্ষে পূর্ণ মুখঢাকা পোশাক নিষিদ্ধ করার পক্ষে কথা বলেছেন রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ। এ ধরনের বিধিনিষেধের দাবি উঠেছে পার্লামেন্টেও।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় পোশাক নিয়ে ভিন্ন ধরনের আইন রয়েছে। কোথাও জনসমক্ষে পূর্ণ মুখঢাকা পোশাকের ওপর বিস্তৃত বিধিনিষেধ রয়েছে, আবার কোথাও স্কুল বা নির্দিষ্ট সরকারি স্থানে এ ধরনের পোশাক নিয়ে আলাদা নিয়ম রয়েছে। অস্ট্রিয়ায় ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১৪ বছরের কম বয়সী মেয়েদের স্কুলে মাথার স্কার্ফ পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। তবে দেশটির সাংবিধানিক আদালত আগামী বছরের প্রথমার্ধে আইনটির বৈধতা নিয়ে রায় দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ফলে ইতালির প্রস্তাবিত আইন শেষ পর্যন্ত কীভাবে কার্যকর হয়, তার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে বোরকা ও নিকাব নিয়ে চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক কোন দিকে যায়, সেদিকেই নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।
সূত্র: রয়টার্স ও ডেইলি এক্সপ্রেস




