সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের ঘুম কেড়েছে এআইয়ের উত্থান

ছবি : রয়টার্স
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থানে রাতারাতি বদলে গেছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দুনিয়া। এআই এখন নিজেই নিখুঁত কোড লিখে দিচ্ছে। আর তাতেই আক্ষরিক অর্থেই ঘুম কেড়েছে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের।
প্রযুক্তি খাতের এই উত্থান ও কর্মী ছাঁটাইয়ের বাজারে একদিকে তরুণ চাকরিপ্রার্থীরা পড়েছেন চরম অনিশ্চয়তায়, অন্যদিকে ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন সত্যিকারের দক্ষ প্রকৌশলী চেনার উপায় না পেয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন নিয়োগকর্তারাও।
এখন নিয়োগকর্তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা, যেহেতু এআই নিজেই নিখুঁত কোড লিখে দিতে পারে, তাহলে ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন সত্যিকারের দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে চেনার উপায় কী? আর একজন মানুষের মধ্যে ঠিক কোন যোগ্যতা থাকলে তাকে এই যুগে পারফেক্ট বলা যাবে?
ক্যারিয়ার বিশেষজ্ঞ এবং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়াররা বলছেন, এআই যেভাবে একজন প্রোগ্রামারের দৈনন্দিন কাজের ধরন রাতারাতি বদলে দিয়েছে, প্রচলিত ইন্টারভিউ পদ্ধতি সেই পরিবর্তনের সঙ্গে কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছে না। আর এই তাল মেলাতে না পারার কারণেই চাকরিপ্রার্থী এবং নিয়োগকর্তা, উভয় পক্ষই এখন এক গোলকধাঁধায় পড়েছেন।
মেটা ও অ্যামাজনের সাবেক প্রকৌশলী এবং টেক ইন্টারভিউ কোচিং প্ল্যাটফর্ম হ্যালো ইন্টারভিউয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিফান মাই পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি বলব, এআই প্রযুক্তির আবির্ভাব ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্টারভিউয়ের ওপর ঠিক যেন একটা পারমাণবিক বোমার মতো আঘাত হেনেছে।’
পুরো প্রযুক্তি খাতের মধ্যে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপরই প্রথম এআইয়ের এই প্রভাব টের পাওয়া যাচ্ছে। গুগলের গবেষণা বিভাগের গত বছরের একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ টেক কর্মী কোড লেখা বা সংশোধনের মতো কাজে এআই ব্যবহার করছেন, যা তার আগের বছরের চেয়ে ১৪ শতাংশ বেশি।
বর্তমানে এআই কেবল কোড লেখাই নয়, ডেটা বিশ্লেষণ, কোডিংয়ের জটিল ধারণা শেখা এবং যেকোনো ত্রুটি মুহূর্তে দূর করতে পারে। ফলে কাজের গতি বেড়েছে অবিশ্বাস্যভাবে।
‘‘কোনো ইন্টারভিউতেই জানতে চাওয়া হয়নি তিনি কাজের ক্ষেত্রে কারসরের মতো আধুনিক এআই টুল কীভাবে ব্যবহার করেন। উল্টো পরীক্ষা শুরুর প্রথমেই কড়াভাবে বলে দেওয়া হয়, কোনো ধরনের এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যাবে না। এমনকি কিছু জায়গায় তো স্ক্রিন শেয়ার করতে বাধ্য করা হয়, যাতে প্রার্থী কোনো টুলের সাহায্য নিতে না পারেন।
ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান জানান, তার দলের একজন প্রকৌশলী এআই ব্যবহার করে এমন একটি সিস্টেম পরিবর্তন করেছেন, যা ম্যানুয়ালি করতে গেলে পুরো টিমের এক সপ্তাহ সময় লেগে যেত।
গুগলের ডিপমাইন্ডের একজন পরিচালক বরুণ মোহন জানিয়েছেন, গুগলের ভেতরের অনেক অভ্যন্তরীণ অ্যাপ এখন মূলত কোম্পানির নিজস্ব অ্যান্টিগ্রাভিটি এআই কোডিং টুল দিয়েই লেখা হচ্ছে।
এমনকি শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের ক্লড কোডের প্রধান বরিস চের্নিও জানান, গত এক মাসে ওই পণ্যে তার নিজের করা অবদানের শতভাগই ক্লড কোড দিয়ে তৈরি করা।
চের্নিও মনে করেন, ‘এআইয়ের কারণে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের ভূমিকা এখন আর শুধু ম্যানুয়ালি কোড লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং হাই-লেভেলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দিকে চলে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে হয়তো এই পদের নাম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার না রেখে ‘বিল্ডার’ বা নির্মাতা রাখা হতে পারে।’
তবে গুগলের বরুণ মোহন স্পষ্ট করে বলেছেন, এআই কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারদের বিকল্প নয়। তার ভাষায়, ‘ডেভেলপারদের বেশির ভাগ সময় এটি ভাবার পেছনে ব্যয় করা উচিত, তারা আসলে কী তৈরি করতে চায়। আসল প্রশ্ন সেটাই।’
বছরের পর বছর ধরে কোম্পানিগুলো চাকরিপ্রার্থীদের মেধা যাচাইয়ের জন্য সনাতন ধাঁচের কিছু কোডিং পরীক্ষা নিয়ে আসছে। যা দেখতে অনেকটা অ্যাকাডেমিক পরীক্ষার মতো। কিন্তু এই পরীক্ষাগুলো দিয়ে কোনোভাবেই পরিমাপ করা সম্ভব নয়। বাস্তব কর্মক্ষেত্রে একজন কর্মী কীভাবে এআইকে কাজে খাটাচ্ছেন।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে বিশাল দূরত্ব। চাকরিপ্রার্থীরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, ইন্টারভিউয়ের এই পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে তাদের বাস্তব কর্মক্ষেত্রের কাজের কোনো মিলই নেই।
ইন্টারভিউ বোর্ডে একজন সত্যিকারের দক্ষ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারকে চেনার উপায় কী? আর একজন মানুষের মধ্যে ঠিক কোন যোগ্যতা থাকলে তাকে এই যুগে পারফেক্ট বলা যাবে?
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ইন্টারভিউ দেওয়া সফটওয়্যার ডেভেলপার ডেভিড বারাহাস নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, কোনো ইন্টারভিউতেই জানতে চাওয়া হয়নি তিনি কাজের ক্ষেত্রে কারসরের মতো আধুনিক এআই টুল কীভাবে ব্যবহার করেন। উল্টো পরীক্ষা শুরুর প্রথমেই কড়াভাবে বলে দেওয়া হয়, কোনো ধরনের এআইয়ের সহায়তা নেওয়া যাবে না। এমনকি কিছু জায়গায় তো স্ক্রিন শেয়ার করতে বাধ্য করা হয়, যাতে প্রার্থী কোনো টুলের সাহায্য নিতে না পারেন।
এআইয়ের এই অতিউত্থানের যুগে যোগ্যতার মাপকাঠিও প্রতি সপ্তাহে বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি নিয়োগ নেটওয়ার্ক লেপার্ড ডট এফওয়াইআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা জর্ডান লিওনার্ড বলেছেন, একটি কোম্পানি তাদের একটি পদের জন্য রুবি অন রেইলস প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ জানা বাধ্যতামূলক করেছিল। কিন্তু ঠিক তিন সপ্তাহ পর তারা সিদ্ধান্ত বদলায়। কারণ তারা বুঝতে পারে, এআই এখন খুব সহজেই যেকোনো ভাষাকে রুবি অন রেইলসে অনুবাদ করে দিতে পারে।
লিওনার্ডের ভাষায়, ‘এটি আক্ষরিক অর্থেই প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে একটি পরিবর্তনশীল লক্ষ্যবস্তুর মতো মনে হচ্ছে।’
এই দমবন্ধ পরিস্থিতি কাটাতে নিয়োগকর্তারা এখন প্রার্থীর কেবল কাঁচা কোডিং ক্ষমতার চেয়ে সে কীভাবে একটি সমস্যা নিয়ে ভাবছে, তার যৌক্তিকতা এবং বিভিন্ন ভালো-মন্দ দিক কীভাবে বিবেচনা করছে, সেই চিন্তাভাবনার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন।
আগে এই গভীর বিষয়গুলো শুধু সিনিয়র পদের ইন্টারভিউতে দেখা হতো, এখন তা একেবারে জুনিয়র পদের জন্যও দেখা হচ্ছে।
কিছু স্টার্টআপ কোম্পানি তো এখন চিরাচরিত পরীক্ষা বাদ দিয়ে প্রার্থীদের সরাসরি অফিসে এনে আধাবেলার জন্য বাস্তব কাজ করিয়ে দেখছে। আবার অনেক ম্যানেজার যুগের হাওয়া বুঝে পরীক্ষার সময় এআই ব্যবহারের অনুমতিও দিচ্ছেন। তবে এই পরিবর্তনগুলোও বর্তমান কাজের আসল রূপটি পুরোপুরি ধরতে পারছে না।
সূত্র : সিএনএন







