কানাডার অভিবাসননীতিতে পরিবর্তন, সুযোগ বাড়লেও চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশিরা

সংগৃহীত ছবি
কানাডার পরিবর্তিত অভিবাসননীতিতে দক্ষ বাংলাদেশি পেশাজীবীদের জন্য স্থায়ী বসবাসের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী কর্মী প্রবেশের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা এবং জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় নতুন অভিবাসীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে এক্সপ্রেস এন্ট্রি ব্যবস্থায় ৩ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া পরিবর্তন বাংলাদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য হয়ে উঠেছে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
কানাডার অভিবাসন বিভাগ (আইআরসিসি) গত ১৬ অক্টোবর ঘোষণা করে, ৩ নভেম্বর ২০২৬ থেকে এক্সপ্রেস এন্ট্রি ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট উচ্চ বেতনের পেশায় যোগ্য চাকরির প্রস্তাব এবং কানাডায় অর্জিত কর্ম-অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে অতিরিক্ত পয়েন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা কার্যকর হবে। স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও দক্ষ কারিগরি পেশাসহ বিভিন্ন খাতের কর্মীরা এ পরিবর্তনের আওতায় আসতে পারেন।
নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে যোগ্য চাকরির প্রস্তাবের ক্ষেত্রে শ্রমবাজারের প্রভাব মূল্যায়ন (এলএমআইএ) সনদের প্রয়োজনীয়তা তুলে নেওয়া হয়েছে। তবে চাকরির প্রস্তাবটি প্রকৃত ও নিয়মসম্মত কি না, তা যাচাই করবে অভিবাসন বিভাগ।
এ পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশি প্রকৌশলী, তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, স্বাস্থ্যকর্মীসহ দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে শিক্ষাগত যোগ্যতা, কানাডায় অর্জিত কর্ম-অভিজ্ঞতা এবং চাকরির প্রস্তাবের শর্তগুলো ভালোভাবে যাচাই করা জরুরি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতা আরও বাড়ছে। কানাডার ২০২৬-২০২৮ সালের অভিবাসন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে শিক্ষার্থী ও কর্মী মিলিয়ে ৩ লাখ ৮৫ হাজার নতুন অস্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে এ সংখ্যা কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজারে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একই সময়ে স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার।
এ পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট, কানাডা এখন অভিবাসনের ক্ষেত্রে সংখ্যার চেয়ে অর্থনীতির প্রয়োজন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে দক্ষতার সামঞ্জস্যকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে।
কানাডায় পড়তে আসা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের এ পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এস এম তৌহিদুল আলম। বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসেবে কানাডায় গিয়ে তিনি কৌশলগত পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘কানাডায় পড়তে আসার সিদ্ধান্তটি শুধু স্থায়ী বসবাসের (পিআর) প্রত্যাশায় নেওয়া উচিত নয়। শিক্ষার্থীদের এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রোগ্রাম নির্বাচন করা জরুরি, যা তাদের পূর্ববর্তী শিক্ষাগত যোগ্যতা, ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার এবং কানাডার শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি টিউশন ফি, জীবনযাত্রার ব্যয়, ইংরেজি ভাষার দক্ষতা এবং নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচিত এজেন্টের স্থায়ী বসবাসসংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর না করে আইআরসিসির নিয়ম এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ের কাজের অনুমতিপত্রের (পিজিডব্লিউপি) যোগ্যতা সম্পর্কে নিজেরাই যাচাই করা। কানাডায় পড়াশোনা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। তাই আবেগের চেয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, দক্ষতা অর্জন এবং আর্থিক প্রস্তুতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’
এদিকে কানাডার শ্রমবাজারেও চাপ বাড়ছে। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর শ্রমবাজার জরিপ অনুযায়ী, দেশটিতে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে। ওই মাসে কর্মসংস্থান কমেছে ৬৮ হাজার। অন্টারিও প্রদেশে বেকারত্বের হার ছিল ৭ শতাংশ।
এ পরিস্থিতিতে নতুন বাংলাদেশি অভিবাসীদের চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে কানাডায় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকা, ভাষাগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা এবং বিদেশি শিক্ষাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণে অনেকেই কর্মজীবন শুরু করতে সমস্যায় পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, চাকরির আবেদনের পাশাপাশি কানাডার কর্মক্ষেত্রের উপযোগী প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সনদ অর্জন, ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় দক্ষতা বাড়ানো এবং পেশাগত যোগাযোগ তৈরি করার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশি অভিবাসী ও শিক্ষার্থীদের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয়। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, টরন্টোতে দুই শয়নকক্ষের বাসার বিজ্ঞাপিত গড় মাসিক ভাড়া ছিল ২ হাজার ৬৬০ কানাডীয় ডলার। একই সময়ে কানাডার প্রধান মহানগর এলাকাগুলোর সম্মিলিত গড় ভাড়া ছিল ২ হাজার ১৫০ ডলার। এর সঙ্গে খাবার, পরিবহন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেটসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হওয়ায় নতুন অভিবাসী ও শিক্ষার্থীদের আর্থিক চাপ বাড়ছে।
বিশেষ করে নতুন শিক্ষার্থী এবং পরিবার নিয়ে আসা অভিবাসীদের বাসা ভাড়া নেওয়ার আগে আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি, বৈধ ভাড়ার চুক্তি এবং বাড়িওয়ালার পরিচয় যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরির উদ্যোগও নিয়েছে কানাডা সরকার। দেশটির ২০২৬-২০২৮ সালের অভিবাসন পরিকল্পনায় ২০২৬ ও ২০২৭ সালে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার অস্থায়ী কর্মীকে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে।
তবে এ সুযোগ সবার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। নির্দিষ্ট যোগ্যতা, কর্ম-অভিজ্ঞতা এবং সরকারি শর্ত পূরণ করতে হবে। এ কারণে বাংলাদেশি অস্থায়ী কর্মীদের নিজেদের কাজের অনুমতিপত্রের মেয়াদ, কর্মসংক্রান্ত কাগজপত্র, কর প্রদানের তথ্য এবং স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা সম্পর্কে আগেভাগে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
সব মিলিয়ে কানাডার পরিবর্তিত অভিবাসননীতি বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। যারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান ও কর্ম-অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে এগোবেন, তাদের জন্য সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে ভুল তথ্য, দালালের প্রতারণা এবং যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া কানাডায় আসার সিদ্ধান্ত আর্থিক ও ব্যক্তিগত সংকটের কারণ হতে পারে।
তাই কানাডায় পড়াশোনা, কাজ কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা করার আগে সরকারি নিয়মকানুন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করাই এখন বাংলাদেশিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





