এপ্রিলে মিয়ানমারের ৫৫ আসনে উপ-নির্বাচনের পরিকল্পনা জান্তার

রেঙ্গুনের বিভিন্ন ভোট কেন্দ্রে পরিদর্শনের সময় মিন অং হ্লাইং। ছবি: দ্য ইরাবতী
মিয়ানমারের ৩৭ উপজেলার ৫৫ আসনে নির্বাচন দেওয়ার পরিকল্পনা করছে জান্তা সরকার। আগামী বছরের ৪ এপ্রিলের মধ্যে সবগুলো আসনে নির্বাচন দিতে চায় জান্তা।
এর মধ্যে অন্তত ১২টি উপজেলার আংশিক নিয়ন্ত্রণ হলেও সম্প্রতি প্রতিরোধ বাহিনীর থেকে পুনরুদ্ধার করেছে সেনাবাহিনী। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত পাতানো নির্বাচনে এই ১২টি উপজেলায় কোনো ভোট হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জান্তা জানায়, তারা ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতিতে নিম্নকক্ষের ৩৪টি আসনে, উচ্চকক্ষের ৫টি আসনে এবং দেশ জুড়ে বিভিন্ন রাজ্য ও আঞ্চলিক পরিষদের ১৬টি আসনে ভোটগ্রহণ করবে।
এ উপজেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে উত্তর চিন রাজ্যের টনজাং ও ফালাম; সাগাইং অঞ্চলের তিগিয়াইং, বানমাউক ও ইন্দও (যেগুলো এ বছর জান্তা পুনরুদ্ধার করেছে); এবং মান্দালয় অঞ্চলের সিংগু ও মোগোক (যেগুলো তারা ২০২৫ সালে পুনরায় দখল করে)।
এ ছাড়া এপ্রিলে ভোটগ্রহণের তালিকায় থাকা অন্য উপজেলার মধ্যে রয়েছে সাগাইংয়ের কাওলিন— যা মিয়ানমার সেনাবাহিনী ২০২৪ সালে পুনরায় দখল করেছিল এবং সাগাইংয়ের প্রতিরোধ বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পালে, ইনমারবিন, শ্বেবো ও তাজে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পালে, ইনমারবিন, শ্বেবো, তাজে, তিগিয়াইং, বানমাউক এবং বিশেষ করে ইন্দওতে জান্তা শুধু শহর অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছে।
অভ্যুত্থানের পর সেনাবাহিনী ছেড়ে আসা এবং মিয়ানমারের যুদ্ধ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জিন ইয়াও বলেছেন, ‘জান্তা সরকার প্রমাণ করতে চায় যে তারা পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম এবং তাদের প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে।’
তিনি জানান, ২০২৬ সালের মে মাস থেকে জান্তা সরকার দক্ষিণ চিন রাজ্যের যেসব শহর পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা শহরগুলো এই নির্বাচনের তালিকা থেকে বাদ পড়ার মাধ্যমে বুঝা যায় তারা ওইসব এলাকায় তাদের কর্তৃত্ব ফিরে পেতে ব্যর্থ।
জান্তা নিম্নকক্ষের যেসব আসনে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে তানিনথারি অঞ্চলের মিয়েইক; বাগো অঞ্চলের নাউংলেবিন, পাউক খাউং ও পাদাং; মাগওয়ে অঞ্চলের চাউক ও মিনবু; মান্দালয় অঞ্চলের পিন ওও লুইন, মেইকতিলা, নাযোগী, সিংগু ও মোগোক; মন রাজ্যের কাইকমায়াও; ইয়াঙ্গুন অঞ্চলের মায়ানগোন, শ্বেপিথার, হ্লেগু, তামওয়ে, কোকোকিউন ও হ্লাইং থারিয়ার; শান রাজ্যের কিউকমে, মোংহপিয়াক ও মোং পান; আরিয়াওয়ারি অঞ্চলের মাউবিন; এবং নেপিদোর জাবুরি, দেকখিনাথিরি ও ওত্তারাথিরি।
তালিকায় থাকা উচ্চকক্ষের আসনগুলো হলো কচীন রাজ্য, চিন রাজ্য, মাগওয়ে অঞ্চল, বাগো অঞ্চল এবং মান্দালয় অঞ্চলে।
এ ছাড়া রাজ্য ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন হবে চিন রাজ্যের টনজাং ও ফালাম; সাগাইং অঞ্চলের তিগিয়াইং, বানমাউক, ইন্দও, কাওলিন, পালে, ইনমারবিন, তাজে ও শ্বেবো; বাগো অঞ্চলের জিগন ও থেগন; মান্দালয় অঞ্চলের নাযোগী, সিংগু ও মোগোক; এবং আরিয়াওয়ারি অঞ্চলের ইয়েগি টাউনশিপের আসনগুলোয়।
বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র সংঘাত থাকা সত্ত্বেও জান্তার সহযোগী রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সাধারণ নির্বাচনে ৩৭টি আসন পাওয়া শান অ্যান্ড এথনিক ডেমোক্রেটিক পার্টির (এসএনডিপি) যুগ্ম সম্পাদক সাও থান মাইন্ট জানান, তার দল আসন্ন এই উপ-নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছে, তবে বিস্তারিত বিষয়ে আলোচনা চলছে।
মিয়ানমারের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনে ৩৩০টি উপজেলার মধ্যে ২৬৩টিতে ভোট হয়েছিল। অং সান সু চি’সহ বেসামরিক নেতাদের কারাগারে রেখেই ভোট হয়। প্রধান বিরোধী দলগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
জাতীয় স্তরে মাত্র ৯টি দল অংশ নেওয়ায় ওই নির্বাচন সামরিক সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) এবং তাদের মিত্রদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। যার ফলে ইউএসডিপি সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায়।
গত এপ্রিলে নিজেকে দেশটির প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পর থেকে মিন অং হ্লাইং তার সরকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছেন। এরই অংশ হিসেবে তিনি চীন, রাশিয়া, বেলারুশ, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভারত সফর করেছেন।
অন্যদিকে তার সামরিক বাহিনী বেসামরিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন অব্যাহত রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ৫৫টি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া জান্তা সরকারের বৈধতার অভাবকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।





