নেতানিয়াহুর নিয়তি বিরোধীদের হাতে
- আবারও নতুন নির্বাচনের দিকে যেতে হতে পারে ইসরায়েলকে
- নেতানিয়াহু ব্লকে ৫৪ থেকে ৫৬টি আসন

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
সুদিন বেশি দিন নয়! আম-আদমির মুখে মুড়ি-মুড়কি হয়ে ফোটা সে লোককথার তেজেও ঝিমুনি এসে গিয়েছিল ইসরায়েলে। বছরের পর বছর দেশের মসনদে বসে থাকা ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুই ছিলেন তার জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। রাজনীতির ‘মহাজাদুকর’। ডালপালাসমেত সেই ভাবনাও শিকড় ছেড়েছিল পুরো ইসরায়েলে। দ্য গ্রেট সারভাইভার, ক্রাইম মিনিস্টার, মি. লেভেলহেডেড, মি. সিকিউরিটি, বিবি, কিং বিবি, বিগ ইয়াহু— কালের হাত ধরে কত তকমা বসেছে তার গায়ে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! রাজনৈতিক জীবনের সেই সোনালি আকাশেই এবার বিদায় মেঘের ছায়া! পুরো ভূখণ্ডটাকেই যিনি নিজের সাম্রাজ্য বানিয়ে রেখেছিলেন এতদিন; আজ তার নিয়তি ঝুলছে তারই বিরোধীদের হাতে। শত্রুপক্ষের শিবিরে।
ইসরায়েলের ২৬তম সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেল দুদিন আগেই—মঙ্গলবার। বুথফেরত জরিপ বলছে, ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জাদুকরী ফিগার ‘৬১’ এখনো অধরাই নেতানিয়াহু ব্লকে। তার ওপর, ভোটের আগেই জোরগলায় ঘোষণা দিয়েছেন ফিলিস্তিনপন্থী আরব জোটের সঙ্গে কোনো জোট নয়। অথচ সর্বশেষ প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, লিকুদ নেতৃত্বাধীন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও কট্টরপন্থী জোটের ঝুলিতে যাচ্ছে ৫৪-৫৬টি আসন। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন ‘পরিবর্তন জোট’-এর ঘরে ৪৭টি আসন। আর ১৯ আসনের জলসায় হাসছে ইসরায়েলের সরকার গঠন জ্যামিতিতে এবার ‘কিং মেকার’ হয়ে ওঠা আরব জোটের উঠোন। সবমিলে, ভোটের পরবর্তী এ বুথফেরত সমীকরণেই রীতিমতো গলা শুকিয়ে গেছে নেতানিয়াহুর। দৈবস্বপ্ন ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ নামে ইসরায়েলের ‘কালপুরুষ’ হয়ে উঠেছিলেন নেতানিয়াহু। ঐশ্বরিক সে বাসনার তেলেসমাতিতে ভূখণ্ড দখলের বারুদে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে পুড়িয়ে খাঁটি সোনার মতো পাকা করেছিলেন নিজের পড়ন্তবেলার ক্ষমতা। ইসরায়েলের সেই ‘চাণক্য’ই আজ নিজে দেশে কুপোকাত!
একসময় ক্ষমতার দাপটে ছিটকে পড়ত প্রতিপক্ষ। ইসরায়েলের দীর্ঘতম সময়ের প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন। ২০০৯ সালে ফিরে টানা ১২ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর লাপিদ বিকল্প জোট গড়ে তাকে সরান। সেই সরকার এক বছরের কিছু বেশি সময় টিকেছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আবার ষষ্ঠবার ক্ষমতায় ফেরেন নেতানিয়াহু। আজ তিনিই শত্রুশিবিরের গোলকধাঁধায় বন্দি। ভোটকেন্দ্র থেকে আসা ক্ষমতায় বসার এ পাটিগণিত অবশ্য স্বতঃসিদ্ধ কিছু নয়; শুধুই অনুমান। চূড়ান্ত ফলাফল আগামী ৪ নভেম্বর। তার আগে ৩০ অক্টোবর শেষ হবে সামরিক বাহিনী ও ডাকযোগে আসা ভোটের গণনা। শেষ পর্যন্ত কি তিনি পারবেন আবার এই খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসতে? নাকি বিরোধীদের জোটবদ্ধ আঘাতই হবে তার দীর্ঘ রাজনীতির যবনিকাপাত? ইসরায়েলের ক্ষমতার অলিন্দে এখন সেই ঝড়েরই পূর্বাভাস।
এক চরম অনিশ্চিত দোলাচলে দুলছে নেতানিয়াহুর ভাগ্য। জিতলে রাজা, হারলে সাজা। রীতিমতো হাতকড়া ছুটছে তার পেছনে। গদি থেকে নামতে যতটুকু বাকি! ঘুষ গ্রহণ, জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে মোট তিনটি পৃথক দুর্নীতির মামলা চলছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৯ সালে আনা হয় এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। ২০২০ সাল থেকে চলছে বিচারপ্রক্রিয়া। অর্থাৎ জীবনের সব অর্জন পেছনে ফেলে বুক চাপড়াতে হবে কারাগারের অন্ধগলিতে। অন্তত সেই আভাসই দিচ্ছে দেশটির বুথফেরত সমীক্ষার ফল।
ক্ষমতার চাবিকাঠি বিরোধীদের হাতে
রাজনৈতিক এই দাবার বোর্ডে প্রবল প্রতাপে উত্থান ঘটেছে বিরোধীশিবিরের। যার নেতৃত্বে রয়েছেন সাবেক জেনারেল গাদি আইজেনকোট। আইজেনকোট ও বেনেটদের মতো কট্টর বিরোধীরা এই নির্বাচনী ফলাফলকে নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য অনাস্থা হিসেবে দেখছেন। অথচ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তার ব্লকও। ফলত সরকার গঠনের ভাগ্য এখন ঝুলে আছে কিংমেকার আরব দলগুলোর হাতে।
গাজায় চলমান যুদ্ধ, লেবাননে সংঘাত এবং ইরানের সঙ্গে চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই দেশটিতে অনুষ্ঠিত হলো এই নির্বাচন। হয়তো এটিই দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে নেতানিয়াহুর বিজয় রথের সামনে। জনমনের যুদ্ধক্লান্তি ও নেতানিয়াহুর যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের নীতি নিয়ে চরম মেরূকরণ তৈরি হয় খোদ ইসরায়েলেই। সেই ফসলই উঠেছে আইজেনকোটের গোলায়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি কার্যকর কোয়ালিশন সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর মেয়াদ দীর্ঘায়িত হতে পারে মাত্র। অর্থাৎ আবারও নতুন নির্বাচনের দিকে যেতে হতে পারে ইসরায়েলকে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলে এখন যে রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন। নেতানিয়াহু হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো বিশ্বনেতাদের সমর্থন নিয়ে নিজের পাল্লা ভারী করার চেষ্টা করছেন; মন্ত্র ছড়াচ্ছেন জাতীয় ঐক্যের সরকারের। কিন্তু দেশের ভেতরের নেসেটের গণিত তার অনুকূলে নেই। বিজয়ের খুব কাছে গিয়েও অনিশ্চয়তার এই চোরাবালি, বিদায়ের ঘনঘটা আর বিরোধীদের কৌশলী অবস্থানের মুখে দাঁড়িয়ে ‘বিবি’ খ্যাত এই নেতার রাজনৈতিক নিয়তি এখন সুতোয় ঝুলছে। ইসরায়েল কি এক নতুন নেতৃত্বের দিকে যাবে, নাকি নেতানিয়াহু কোনো জাদুকরী কৌশলে আবারও পার পেয়ে যাবেন— তা দেখতে আগামী কয়েক দিনের কোয়ালিশন রাজনীতির জটিল দরকষাকষির দিকেই তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব।



