ট্রাম্পের আয়ারল্যান্ড সফরের শেষ দিনে ঐক্যের বার্তা, বাণিজ্যে স্বস্তি

ডুনবেগে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল গলফ লিংকসে আয়োজিত অ্যামজেন আইরিশ ওপেন গলফ টুর্নামেন্টে অংশ নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
আয়ারল্যান্ড সফরের দ্বিতীয় ও শেষ দিনে দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংকট নিয়ে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রবিবার কাউন্টি ক্লেয়ারের ডুনবেগে অবস্থানকালে আয়ারল্যান্ডের ঐক্যের পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার পাশাপাশি আইরিশ হুইস্কির ওপর আরোপিত ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন তিনি। ফলে সফরের শেষ দিনটি রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইরিশ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সফরের প্রথম দিন ডাবলিনে আইরিশ প্রেসিডেন্ট ক্যাথরিন কনোলি ও প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ট্রাম্প। ওই দিন উত্তর আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে মূল আয়ারল্যান্ডের পুনরায় একত্রীকরণের পক্ষে নিজের আগ্রহের কথা জানান তিনি। দ্বিতীয় দিন ডুনবেগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও ওই অবস্থান থেকে সরে আসেননি ট্রাম্প। বরং আগের মন্তব্যের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ওই বক্তব্যকে সমর্থন করেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আরটিই তার এই অবস্থানকে আগের বক্তব্যের ওপর আরও জোর দেওয়ার পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
ট্রাম্পের মন্তব্য আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের বিষয়টি সেখানকার জনগণের গণতান্ত্রিক মতামতের ওপর নির্ভরশীল। গুড ফ্রাইডে চুক্তির কাঠামো অনুযায়ী, সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সম্মতি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য অবস্থান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়।
আইরিশ প্রধানমন্ত্রী মিশেল মার্টিন অবশ্য ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখানোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ব্রেকিং নিউজ ডট আইইকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, ট্রাম্পের মন্তব্য নিয়ে কিছুটা অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা দেখানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টিও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ওষুধ, প্রযুক্তি, খাদ্য ও পানীয় খাতে মার্কিন বাজারের ওপর আইরিশ অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য নির্ভরতা রয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ডাবলিনের উদ্বেগও বেড়েছে। দ্য আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আয়ারল্যান্ডের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে আসে। আগের বছর একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ইউরো।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ডুনবেগে আইরিশ ওপেন গলফের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আইরিশ হুইস্কির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১০ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ২০২৫ সালের বাণিজ্য আলোচনার সময় আইরিশ হুইস্কি অ্যাসোসিয়েশনও জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার এবং ১০ শতাংশ শুল্ক শিল্পটির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
আইরিশ অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের গুরুত্ব শুধু হুইস্কিতে সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালে আয়ারল্যান্ড প্রায় ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের খাদ্য ও পানীয় পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করে। এর মধ্যে পানীয়ের রপ্তানি ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ইউরো। ফলে হুইস্কির ওপর শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত আইরিশ পানীয় শিল্পের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। পাশাপাশি এটি বৃহত্তর মার্কিন-আইরিশ বাণিজ্য সম্পর্কেও ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, আয়ারল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানির মূল্য ছিল প্রায় ৭২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ইউরো। দেশটির মোট পণ্য রপ্তানির প্রায় ৩২ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে ওষুধ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত পণ্যের অংশ সবচেয়ে বড়। তাই হুইস্কির শুল্ক প্রত্যাহারে স্বস্তি এলেও মার্কিন শুল্কনীতিকে ঘিরে আইরিশ ব্যবসায়ীদের বৃহত্তর অনিশ্চয়তা পুরোপুরি দূর হয়নি।
সফরের দ্বিতীয় দিনে গাজার পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন ট্রাম্প ও মার্টিন। আইরিশ প্রধানমন্ত্রী জানান, বৈঠকে গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা হয়েছে। তবে তিনি গাজার পরিস্থিতিকে গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেননি। ফিলিস্তিন ইস্যুতে আয়ারল্যান্ডের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি সমালোচনামুখর হওয়ায় বিষয়টি দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের একটি ক্ষেত্র।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বক্তব্য দেন ট্রাম্প। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে এ ধরনের হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। ইরান নিয়েও যুদ্ধ, তেল সরবরাহ ও ভবিষ্যৎ মার্কিন ভূমিকা নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ট্রাম্প।
সফর ঘিরে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রতিবাদও ছিল আলোচনায়। গার্ডা জানিয়েছে, ট্রাম্পের সফর ছিল দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বড় নিরাপত্তা অভিযান। ডাবলিন ও ক্লেয়ার এলাকায় যান চলাচলেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সফরের প্রথম দিন ডাবলিনে গাজা, মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। দ্বিতীয় দিন ডুনবেগেও প্রতিবাদ করেন বিক্ষোভকারীরা।
দিনের শেষে শ্যানন বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে করে আয়ারল্যান্ড ছাড়েন ট্রাম্প। দুই দিনের সফরে আয়ারল্যান্ডের ঐক্য নিয়ে তার মন্তব্য যেমন নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে, তেমনি হুইস্কির শুল্ক প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে আইরিশ ব্যবসায়ীদের তাৎক্ষণিক স্বস্তি। তবে ওষুধ, প্রযুক্তি, খাদ্যসহ বিভিন্ন খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আয়ারল্যান্ডের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে বৃহত্তর শুল্কনীতির ভবিষ্যৎই এখন ডাবলিনের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।




