ফিলিস্তিন প্রশ্নে বদলাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
- ইসরায়েলকে কেন কঠোর অবস্থানে রাখতে চাইছেন ডেমোক্র্যাটরা

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজের সামনে ইসরায়েল-হামাস সংঘাতের মধ্যে ফিলিস্তিনের পক্ষে আয়োজিত বিক্ষোভে অংশ নিচ্ছেন মানুষ। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে বদলে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির আইনপ্রণেতাদের একটি বড় অংশ ইসরায়েলের বিষয়ে আগের তুলনায় কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন।
দখল করা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সহিংসতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরির প্রস্তাব সিনেটে তুলেছিলেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন। গতকাল মঙ্গলবার ভোটে ৪৬ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর প্রস্তাবটির পক্ষে ছিলেন। রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পলও তাদের সঙ্গে ভোট দেন। বিপক্ষে ছিলেন ৫১ জন।
প্রস্তাবটি পাস হয়নি। তবে এত বেশি ডেমোক্র্যাটের সমর্থন দলটির মধ্যে ইসরায়েল-সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রস্তাবটি পাস হলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে হতো। এতে ইসরায়েলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারী বা নিরাপত্তাবাহিনীর হাতে নিহত মার্কিন নাগরিকদের ঘটনা তদন্তের বিষয়টিও পর্যালোচনা করার কথা ছিল।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পশ্চিম তীরে ৯জন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে প্রস্তাবের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
ভ্যান হোলেন বলেছেন, পশ্চিম তীরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরও তথ্য জানা দরকার। মার্কিন করদাতাদের অর্থ যারা গ্রহণ করছে, তারা যেন যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও মূল্যবোধ মেনে চলে, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
সিনেটে প্রস্তাবটি ৪৭-৫১ ভোটে আটকে যায়। পেনসিলভেনিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন ফেটারম্যান দলীয় অবস্থানের বাইরে গিয়ে বিপক্ষে ভোট দেন। অন্যদিকে কেনটাকির রিপাবলিকান সিনেটর র্যান্ড পল প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন।
প্রস্তাবটি ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সামরিক সহায়তা সরাসরি বন্ধ করার কথা বলেনি। তবে পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতিবেদন না দিলে সহায়তার ওপর বিধিনিষেধের সুযোগ তৈরি হতে পারত।
এর পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের কয়েকজন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি, কোম্পানি ও ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের অবস্থান হলো, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
ইসরায়েল ও গাজা নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মতভেদ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক ভোটে দলের বড় অংশের একসঙ্গে অবস্থান নেওয়া আগের তুলনায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে।
২০২৪ সালে গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদন চেয়ে বার্নি স্যান্ডার্স একটি প্রস্তাব তুলেছিলেন। তখন মাত্র ১১ জন সিনেটর সেটি এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।
এবার পশ্চিম তীরের নিয়ে একই ধরনের প্রতিবেদন চাওয়ার প্রস্তাবে ৪৬ জন ডেমোক্র্যাট সিনেটর সমর্থন দিয়েছেন। ফলে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ইসরায়েল নিয়ে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটদের অবস্থানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
এ পরিবর্তন শুধু সিনেটেই সীমাবদ্ধ নয়। ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়েও আগের তুলনায় বেশি প্রশ্ন তুলছেন। একই সঙ্গে বসতি স্থাপন ও পশ্চিম তীর পরিস্থিতি নিয়ে জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে।
এদিকে ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের ভোটে এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনের ফল এখনো নিশ্চিত নয়।
ইসরায়েল ও গাজা প্রশ্নে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যেও মতের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ফলে নির্বাচনের আগে দলের আইনপ্রণেতাদের অবস্থানেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ডেমোক্র্যাটদের কেউ কেউ সামরিক সহায়তা বন্ধের মতো পদক্ষেপের বদলে তদন্ত, প্রতিবেদন ও নিষেধাজ্ঞার মতো ব্যবস্থার মাধ্যমে ইসরায়েল সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
তবে এসব উদ্যোগ এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতিতে সরাসরি পরিবর্তন আনেনি। মঙ্গলবারের ভোটেই দেখা গেছে, প্রস্তাবটি ডেমোক্র্যাটদের বড় সমর্থন পেলেও তা পাস করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
তবে পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন এবং ইসরায়েলকে মার্কিন সহায়তা নিয়ে কংগ্রেসে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা সামনের দিনগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।




