রাশিয়া থেকে ডিজেল কেনার পরিকল্পনা করে চাপের মুখে ট্রাম্প

ছবি: রয়টার্স
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করে চাপের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই চুক্তিকে আইনবিরোধী বলছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা। পাশাপাশি এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ইরান যুদ্ধ ঘিরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির পরিকল্পনার কথা জানান ট্রাম্প। শুক্রবার তিনি ঘোষণা দেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অবিলম্বে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাজারে’ ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমেরিকানদের, বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’
ট্রাম্প জানান, প্রাথমিকভাবে ৩ লাখ টন সরবরাহের পর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং এরপর আরও ১০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করবে রাশিয়া। এরপর আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ‘স্বল্প সময়ের মধ্যে’ এসব ডিজেল সরবরাহ করা হবে।
রাশিয়ার ডিজেল আমদানির তথ্য ট্রাম্প এমন এক সময়ে জানালেন, যার কয়েক সপ্তাহ আগেই রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানি করে এমন দেশগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক আরোপ করেছিলেন তিনি।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাকও জ্বালানি রপ্তানির এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে প্রতি মাসে ডিজেল রপ্তানির পরিমাণ ৩০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে।
রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছে মার্কিন মিত্র ইউক্রেন। চার বছরের বেশি সময় ধরে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করছে দেশটি। ট্রাম্পের এই চুক্তিকে পুতিনের জন্য উপহার বলে অভিহিত করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় আগামী ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকে থাকা রাশিয়ার সম্পদের মতো অন্যান্য সম্পদ এখনো জব্দ রয়েছে।
এদিকে রবিবার চারজন রিপাবলিকান ও তিনজন ডেমোক্র্যাটসহ সাতজন সিনেটর বলেছেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের আইন লঙ্ঘন করেছে। তারা ট্রাম্পকে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এক বিবৃতিতে ওই আইনপ্রণেতারা বলেছেন, ‘রাশিয়া যখন ইউক্রেনের বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা অব্যাহত রেখেছে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত নয় পুতিনকে আর্থিকভাবে টিকে থাকার সুযোগ করে দেওয়া।’
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স, লিসা মারকাউস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেন।
শুধু দেশের ভেতরই নয়, রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বিরোধিতার মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এবং যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংসহ কয়েকজন আন্তর্জাতিক নেতা এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। স্ট্রিটিং বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের অন্য মিত্রদের উচিত যুদ্ধ বন্ধে রাশিয়ার ওপর চাপ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া।
তবে চাপের মুখে পড়লেও অনেককে পাশে পাচ্ছেন ট্রাম্প। রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা থমাস ম্যাসির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সব ধরনের জ্বালানি পণ্যের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া।
ট্রাম্পের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, জ্বালানির দাম কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই চুক্তি কার্যকর করা হবে। কংগ্রেসের যেসব সদস্য বলছেন এতে দাম কমবে না, তারা ভুল করছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। পাল্টা হামলা চালায় ইরান। বন্ধ হয়ে যায় বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ তেল পরিবহনের নৌপথ হরমুজ প্রণালি। এতে বিশ্ববাজারে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। যুদ্ধের কারণে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে মার্কিন রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে জ্বালানি তেলের দাম। কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে চায় ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি।
যদিও জনমত জরিপে দেখা গেছে, অর্থনীতি ও ইরানের যুদ্ধ মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক অসন্তুষ্ট। ফলে রাজনৈতিক চাপ কমানোর উপায় খুঁজছেন তিনি। এ কারণেই তিনি পুতিনের শরণাপন্ন হয়েছেন।
তবে রাশিয়া প্রতিশ্রুত পরিমাণ ডিজেল সরবরাহ করতে পারবে কি না এবং এতে মার্কিন ভোক্তাদের জ্বালানির দাম কতটা কমবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে রাশিয়া চলতি মাসে প্রতিশ্রুত ৩ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের এক দিনের মোট চাহিদার প্রায় অর্ধেকের সমান হবে।
সূত্র: বিবিসি



