গাজার ক্ষত শুকায়নি, ইসরায়েলের জন্য ফের হাজার হাজার ভারী বোমার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
- ২.৮ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন, ভারী বোমার ব্যবহার নিয়ে মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের বিতর্ক তীব্র

ধ্বংসস্তূপেরও কি কোনও ভাষা থাকে? গাজার ভাঙা দেয়াল, নিঃস্ব পরিবার আর ধুলোর নিচে চাপা পড়ে থাকা স্মৃতিগুলো যেন সেই প্রশ্নই ছুড়ে দিচ্ছে বিশ্ববাসীর দিকে। যুদ্ধের আগুনে পুড়ে যাওয়া এক ভূখণ্ডের ক্ষত এখনও শুকোয়নি, অথচ ওয়াশিংটনের নতুন অস্ত্র সিদ্ধান্ত ফের জন্ম দিয়েছে বিতর্ক। ‘মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের রক্ষক’ হিসেবে নিজেদের তুলে ধরা পশ্চিমা শক্তির অন্যতম কেন্দ্র আমেরিকা এবার ইসরায়েলের জন্য পাঠাতে চলেছে ৪০ হাজার ২,০০০ পাউন্ডের ভারী বোমা, আর এমন অভিযোগ ঘিরেই তীব্র হয়েছে প্রশ্ন। যে অস্ত্র এক আঘাতে ভবন গুঁড়িয়ে দিতে পারে, সেই অস্ত্রের নতুন চালান কি শান্তির পথ খুলবে নাকি আরও ধ্বংসের আশঙ্কা বাড়াবে, সেই প্রশ্নই এখন বিশ্বের সামনে৷
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের জন্য প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলারের একটি বোমা সরবরাহ প্যাকেজ প্রস্তুত করছে, যাতে থাকতে পারে প্রায় ৪০ হাজার ভারী ২,০০০ পাউন্ডের বোমা।
প্রস্তাবিত চালানের মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার এমকে-৮৪ এবং ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ বোমা। পাশাপাশি রয়েছে আই-২০০০ পেনেট্রেটর ওয়্যারহেড, যা শক্ত স্থাপনা ভেদ করার জন্য ব্যবহৃত হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, বিষয়টি কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে অবহিত করা হয়েছে।
এই অস্ত্র নিয়েই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে গাজায় এর সম্ভাব্য ব্যবহারের প্রশ্নে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় ২,০০০ পাউন্ডের বোমা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের দাবি, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই ধরনের ভারী অস্ত্র ব্যবহারে বেসামরিক মানুষের ঝুঁকি ভয়াবহভাবে বেড়ে যায়।
ইসরায়েল অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। দেশটির বক্তব্য, তাদের সামরিক অভিযান মূলত হামাসের অবকাঠামো ও যোদ্ধাদের লক্ষ্য করে পরিচালিত হয় এবং বেসামরিক হতাহত কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় সতর্কতা নেওয়া হয়।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ জানিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বক্তব্য, এমন অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে “গুরুতর প্রশ্ন” তৈরি হবে। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র সরবরাহের নীতি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছে।
এর আগে জো বাইডেন প্রশাসন গাজায় বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কায় ২,০০০ পাউন্ডের কিছু বোমার চালান আটকে রেখেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর সেই স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয় বলে আরব নিউজ জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের দীর্ঘদিনের নীতির অংশ। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটের মধ্যে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখাকে ওয়াশিংটন গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন গাজার বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, হাজারো পরিবার বাস্তুচ্যুত, তখন আরও ভারী অস্ত্র পাঠানো কি সংঘাতকে আরও দীর্ঘ করবে না?
অস্ত্র প্যাকেজটি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে সম্ভাব্য এই চালান আবারও সেই পুরনো বিতর্ক সামনে এনেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তিশালী অস্ত্রের সীমা কোথায়, আর বেসামরিক মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?
গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা সেই প্রশ্নই এখন ওয়াশিংটন ও বিশ্বের সামনে, শক্তির প্রদর্শন, নাকি শান্তির পথ?



