ট্রাম্প কি ইরানে অন্তহীন যুদ্ধের পথে হাঁটছেন?

প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে যুদ্ধ বিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত করেছিলেন।
ইরানের সাথে দীর্ঘস্থায়ী নির্বাচনের পথেই হাঁটছেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এতে বিশ্বের শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্রটি ‘অন্তহীন যুদ্ধ বা ফরেভার ওয়ার’ এর ঝুঁকিতে রয়েছে। এখান থেকে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধের অর্থনৈতিক বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও শাসকদল রিপাবলিক্যান পার্টির ধরাশায়ী হবার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তাও আবার এই ইরান যুদ্ধের কারনেই। নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে ও জনগনের আস্থা ফিরিয়ে আনতে অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং জ্বালানির দাম কমবে। তাও আবার সাংবাদিকদেও বলেছেন, ডালাসে অনুষ্ঠিত রিপাবলিক্যান মিডটার্ম কনভেনশনে যাবার আগে ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ এ উঠার আগে। ডালাসে এই প্রশ্নের উত্তর জানতেই রিপাবলিক্যান প্রতিনিধিরা সেখানে অপেক্ষা করছিলেন।
প্রথম মেয়াদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে যুদ্ধ বিরোধী নেতা হিসেবে পরিচিত করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নির্বাচনী প্রচারণাকালে বলেছিলেন, তিনি হবেন ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’। তিনি নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করবেন না। বরং বিদেশের মাটিতে চলমান যুদ্ধগুলো বন্ধ করবেন। বিধিবাম, তিনিই এক অনপ্রিয় সংঘাতের জালে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। প্রশ্ন উঠেছে, যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও আফগান কিংবা ইরাকের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিতে বা কোনো স্পষ্ট ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ (যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল) তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে?
ওয়াশিংটন—ভিত্তিক থিংক—ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসি’ সিনা তুসি বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় ও অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে থাকা যুদ্ধ শুরু না করতে ওয়াশিংটনে অলিখিত বিধিনিষেধ বা সতর্কতা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তা ট্রম্প ভেঙ্গে ফেলেছেন। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত বিদ্যমান।” অবশ্য ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরান যুদ্ধের অবসান হবে।
ইরাক ও আফগানিস্থানে সরকারগুলোকে আমেরিকা ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। হাজার হাজার স্থলসেনা মোতায়েন করে ভূখণ্ড দখল ও নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। ব্যাপক ট্রাণহানি ঘটেছিল। ইরানযুদ্ধের চিত্রটি ভিন্ন। এখনও ভূখন্ড দখল কিংবা স্থল বাহিনী ইরানের মাটি স্পর্শ করতে পারেনি। মূলত বিমান ও নৌ—শক্তি নির্ভর যুদ্ধ চলছে। । আফগান ও ইরাক স্টাইলে সরকারেরও পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি। ৬ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে এখনও বিজয় অর্ঝন করেনি তা পরিষ্কার। বরং ক্লান্তিকর এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পটভূুমতে মাত্র। এক হরমুজ প্রণালী দখল নিতেই হিমশিম খাচ্ছে। গত ৩ দিন ইরান সমান্তরালে মার্কিন হামলার চ্যালেঞ্জ করেছে। যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। অথচ যুদ্ধের অর্থনৈতিক বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে তেল পরিবহনে তেহরানের বাধার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়ে গেছে। এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থনের হার কমিয়ে দিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ওয়াশিংটনের অবস্থানকে দুর্বল করেছে।
ইরান যুদ্ধের অবসান মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর: ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটবে এবং জ্বালানির দাম কমবে। বুধবার ৯ সেপ্টেম্বর মেরিল্যান্ডের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুসে 'এয়ার ফোর্স ওয়ান'—এ ওঠার আগে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
তিনি আশা করছেন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরান তাদের যুদ্ধ প্রচেষ্টা থেকে সরে আসবে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, এর আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমার সম্ভাবনা কম।
ডালাসে রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, তাকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে ইরান নভেম্বর পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাবে।
জ্বালানির দাম কমার বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, "আমার মনে হয় মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ের চেয়ে এতে কিছুটা বেশি সময় লাগবে। তারা মরিয়া হয়ে নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছে, যাতে আমরা সেখানে একদল দুর্বল মানুষকে ক্ষমতায় বসাই। যারা তাদের কোনো বাধা দেবে না এবং তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের সুযোগ করে দেবে।"
তিনি আরও বলেন, তার বিশ্বাস ইরান পতনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে এবং তারা "নির্বাচনের পরপরই" সংঘাতের অবসান চাইবে। যার ফলে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে।
তিনি বলেন, "তারা আর বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারবে না।"
ভোটে জিতলে প্রত্যেককে ৫ হাজার ডলার
রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে প্রাপ্তবয়স্ক আমেরিকানদের পাঁচ হাজার ডলার করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই ঘোষণা ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। নির্বাচনের আগে এমন প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন এ রিপাবলিকান। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি ও নির্বাচনী লড়াই নিয়েও চাপে আছেন তিনি। ডেমোক্র্যাটরা বলছেন, এ ধরনের ঘোষণা নির্বাচনী আচরণ বিরোধী। ভোটারদেও ঘুষ দেবার সামিল। তবে এতেও তাদেও রক্ষা হবে না। ট্রাম্পের দলকে আমেরিকানরা প্রত্যাখান করবে। উল্লেখ্য সিনেটে নিজেদের আসনগুলো রক্ষা করে আরও ৪টি ও হাউজে ৬টি আসনে জিতলেই ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে মেজোরিটি পাবে। লাগামহীন ক্ষমতার রশি টেনে ধরতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা।
ডালাসে স্থানীয় সময় বুধবার রিপাবলিকান পার্টির মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনের প্রথম দিনের সমাপনী বক্তব্যে এ ঘোষণা দেন ট্রাম্প। একই সঙ্গে সমর্থকদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, তারা যেন ধরে নেন, তিনিও এবারের নির্বাচনে ব্যালটে রয়েছেন।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘রিপাবলিকানরা জয়ী হলে আপনারাও আমাদের সঙ্গে জয়ী হবেন এবং ৫ হাজার ডলার পাবেন। এটিকে ট্রাম্পের বিশেষ ভাতা বলা হবে।’
তবে ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। ফলে আর্থিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এটি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অর্থ কোথা থেকে আসবে, সে বিষয়েও বিস্তারিত কিছু বলেননি ট্রাম্প। শুধু বলেছেন, ‘আমাদের দেশ প্রচুর অর্থ উপার্জন করছে।’
জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী ট্রাম্প
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনমত জরিপকে ভুল প্রমাণ করে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে বলে আশা করছেন ট্রাম্প।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘আমি আপনাদের বলছি, ধরে নিন আমিও ব্যালটে আছি।’
তবে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ৩০ শতাংশের কিছু ওপরে। অর্থাৎ ৭০ ভাগ মানুষ ট্রামে্ও কর্মকান্ডে সন্তুষ্ট নয়। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং ইরানের সঙ্গে তার শুরু করা যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষও বাড়ছে।
নির্বাচনী বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ডিসিশন ডেস্ক এইচকিউয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ২৩০টি আসন পেতে পারে। রিপাবলিকানরা পেতে পারে ২০৫টি। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের ৫১—৪৯ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
‘সাংবাদিকরা বাথরুমে যাবেন না’ বললেন ট্রাম্প
ডালাসে রিপাবলিক্যানদের মধ্যবর্তী সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বক্তৃতাকালে হঠাৎ করেই বলে ফেললেন কেউ বাথ রুমে যাবেন না। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি নিয়েও রসিকতা করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘কোনো সংবাদমাধ্যমের একজন সাংবাদিক বাথরুমে গেলে তাঁর খালি চেয়ারটি ক্যামেরায় দেখানো হবে। এরপর বলা হবে, প্রেসিডেন্ট সম্মেলনকক্ষটি কানায় কানায় পূর্ণ করতে পারেননি। তাই দয়া করে, কেউ বাথরুমে যাবেন না।’ তার এ কথায় সেখানে হাস্যরসের সৃষ্টি হয়।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএন



